কৃষি

  • জলবায়ুর ঝুঁকি বদলাচ্ছে পূর্বাঞ্চলের কৃষি

    জলবায়ুর ঝুঁকি বদলাচ্ছে পূর্বাঞ্চলের কৃষি

    জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগ, আকস্মিক বন্যা ও কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকি মোকাবিলায় পূর্বাঞ্চলের কৃষিকে আরও সক্ষম ও সহনশীল করে গড়ে তুলতে বাস্তবায়িত হচ্ছে বাংলাদেশ সাস্টেইনেবল রিকভারি, ইমার্জেন্সি প্রিপেয়ার্ডনেস অ্যান্ড রেসপন্স (বি-স্ট্রং) প্রকল্প। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ও বাংলাদেশ সরকারের ম্যাচিং গ্রান্টে পরিচালিত এ প্রকল্পের আওতায় বন্যাদুর্গত এলাকার কৃষি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জলবায়ু সহনশীল প্রযুক্তি, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, উন্নত বীজ উৎপাদন ও পানি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।

    কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, লক্ষ্মীপুর ও নোয়াখালীর ৪০টি উপজেলায় প্রকল্পটির কার্যক্রম চলছে। প্রায় ৬৫ হাজার কৃষককে প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। গত অর্থবছরে ৬ হাজার ৭৪০টি প্রদর্শনী বাস্তবায়ন করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও ১০ হাজার প্রদর্শনী বাস্তবায়নের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে।

    একই সঙ্গে কৃষকের বাড়ির আঙিনা, অনাবাদি জমি, পুকুরপাড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অব্যবহৃত জায়গা ও রাস্তার পাশের পরিত্যক্ত জমি উৎপাদনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের আশা, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে দুর্যোগের পর কৃষি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি ভবিষ্যতে কৃষকের ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং উৎপাদনব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল করা সম্ভব হবে।

    মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষে সুফল
    কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মন্তলী গ্রামের কৃষক হাসান এবার প্রথমবারের মতো মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করেছেন। আগে বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও জমিতে পানি জমে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি মরিচ চাষের কথা ভাবতেন না। বি-স্ট্রং প্রকল্পের সহায়তায় এবার সেই ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন।
    হাসান জানান, কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে জমিতে বেড তৈরি করে মালচিং শিট বিছিয়ে চারা রোপণ করেন। এতে জমির অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন সহজ হয়েছে, মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা গেছে এবং আগাছার সমস্যাও কমেছে।
    পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে তিনি ফেরোমন ফাঁদ ও হলুদ আঠালো ফাঁদ ব্যবহার করেছেন। কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত জমি পরিদর্শন করে সার প্রয়োগ, সেচ, রোগবালাই ও পোকামাকড় দমনে পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁর দাবি, বর্ষার মধ্যেও গাছ ভালো রয়েছে এবং কয়েক দফায় মরিচ সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

    হাসানের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ জমি থেকে প্রথম দফায় ২০০ কেজি এবং দ্বিতীয় দফায় ২৯০ কেজি—মোট ৪৯০ কেজি মরিচ বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১৪০ টাকা দরে বিক্রির কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত তাঁর আয় হয়েছে প্রায় ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। মোট খরচ হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার টাকা। গাছে এখনো মরিচ রয়েছে। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করতে পারবেন বলে আশা করছেন তিনি।

    হাসানের অভিজ্ঞতা বলছে, উপযুক্ত প্রযুক্তি ও পরিচর্যার মাধ্যমে প্রতিকূল মৌসুমেও সবজি চাষের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ পদ্ধতির প্রকৃত লাভ নির্ধারণে উৎপাদন খরচ, ফলন ও বিক্রির হিসাব যাচাই করা জরুরি।
    দুর্যোগ-পরবর্তী পুনরুদ্ধারই একমাত্র লক্ষ্য নয়

    বি-স্ট্রং প্রকল্পের পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, দুর্যোগের পর কৃষি ব্যবস্থা দ্রুত পুনরুদ্ধার করাই শুধু প্রকল্পের লক্ষ্য নয়; ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্যোগে কৃষকের ক্ষতি কমানোর সক্ষমতা তৈরি করাও অন্যতম উদ্দেশ্য।
    তিনি বলেন, ২০২৪ সালে দেশের পূর্বাঞ্চলে, বিশেষ করে ফেনী ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় আকস্মিক বন্যায় কৃষিতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই ক্ষতি কাটিয়ে কৃষি পুনরুদ্ধার এবং ভবিষ্যৎ দুর্যোগ মোকাবিলায় কৃষকদের প্রস্তুত করার প্রয়োজন থেকেই প্রকল্পটির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

    প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত। মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম শুরু হয় ২০২৫ সালের জুলাইয়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর প্রকল্পের প্রধান বাস্তবায়নকারী সংস্থা এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সহ-প্রধান সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, পানি উন্নয়নসংশ্লিষ্ট সংস্থা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনসহ একাধিক সরকারি সংস্থা যুক্ত রয়েছে।

    উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তি ও যান্ত্রিকীকরণ
    প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ও কৃষি যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমানো। একই সঙ্গে কৃষিতে নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে ৩০ শতাংশ নারী এবং ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী ২০ শতাংশ তরুণকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
    ‘বি-স্ট্রং’ প্রকল্পের পরিচালকসাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রচলিত চাষাবাদ পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কম পানি, কম সময় ও কম খরচে বেশি উৎপাদনের জন্য কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে।
    দুর্যোগের পর কৃষকের অন্যতম বড় সংকট হয়ে দাঁড়ায় মানসম্মত বীজের প্রাপ্যতা। এ সমস্যা মোকাবিলায় ধান, গম, ডাল, তেলবীজ ও মসলাজাতীয় ফসলের উন্নত প্রযুক্তি এবং কৃষক পর্যায়ে বীজ উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ সক্ষমতা বাড়ানো, বিএডিসির গুদামজাতকরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বীজ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে দুর্যোগের পর দূরবর্তী এলাকা থেকে বীজ সংগ্রহে সময়ক্ষেপণ ও সরবরাহসংকট কমবে বলে আশা করছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

    ডাল-তেলবীজ থেকে পেঁয়াজ-মরিচ
    এলাকার মাটি ও পরিবেশ উপযোগী করে খেসারি, মাষকলাই, মসুর, সরিষা, সূর্যমুখী ও সয়াবিনের মতো ফসলের চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি গমের উন্নত জাতের প্রদর্শনী চলছে। নোয়াখালীতে পরীক্ষামূলকভাবে পেঁয়াজ চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মরিচসহ বিভিন্ন উচ্চমূল্যের ফসল উৎপাদনেও কৃষকদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
    বর্ষাকালে উদ্যান ফসল চাষের ঝুঁকি কমাতে মালচিং প্রযুক্তি এবং উঁচু বেডে চাষের প্রদর্শনী করা হচ্ছে। টমেটো, মরিচ ও করলার মতো ফসলের ক্ষেত্রে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং গাছের গোড়া উঁচু রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
    বসতবাড়ির আশপাশের খালি জায়গা কাজে লাগাতে কৃষকদের মধ্যে ৫০ হাজার জিও ব্যাগ বিতরণ করা হয়েছে। এসব ব্যাগে আদা ও মরিচ চাষের মাধ্যমে স্বল্প জায়গায় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
    প্রকল্প পরিচালক সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘কৃষকের বাড়ির আশপাশে পড়ে থাকা জায়গাটুকুও যদি উৎপাদনে আনা যায়, তাহলে পরিবারের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয়ও সম্ভব।’

    আমন কাটার আগেই সরিষা চাষ
    জমি চাষের খরচ, সময় ও পানি সাশ্রয়ে প্রকল্পের আওতায় জিরো টিলেজ বা চাষ ছাড়াই সরিষা উৎপাদন প্রযুক্তি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে আমন ধান কাটার প্রায় ১০ দিন আগে জমিতে সরিষার বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ধান কাটার পর সরিষা চাষের জন্য নতুন করে জমি প্রস্তুতের প্রয়োজন কমে যায়।
    একই জমিতে বারবার একই ফসল চাষ না করে স্বল্পমেয়াদি সরিষা বা খেসারির মতো ফসল অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা ধরে রাখার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

    পানি সাশ্রয়ে বিকল্প সেচব্যবস্থা
    ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমাতে ধান চাষে অলটারনেট ওয়েটিং অ্যান্ড ড্রাইং (এডব্লিউডি) পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ পদ্ধতিতে জমিতে সব সময় পানি জমিয়ে না রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দেওয়া হয়। পাশাপাশি কৃষকদের বিনামূল্যে লো লিফট পাম্প সরবরাহ এবং সেচ চ্যানেল নির্মাণ ও সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
    ফলবাগানে সৌরশক্তিচালিত ড্রিপ ইরিগেশন বা ফোঁটা সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এতে কম পানি ব্যবহার করে গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী পানি সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

    অনাবাদি জমিতে কমিউনিটি গার্ডেন
    পতিত জমি ও অব্যবহৃত জায়গাকে উৎপাদনের আওতায় আনতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পুকুরপাড় ও পতিত জমিতে মাচা তৈরি করে ফসল উৎপাদন, রাস্তার পাশে পরিত্যক্ত জমিতে তিনজন কৃষকের যৌথ উদ্যোগে কমিউনিটি গার্ডেন এবং স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার অব্যবহৃত জায়গায় চাষাবাদ করা হচ্ছে।

    মাটির গুণাগুণ রক্ষায় ভার্মি কম্পোস্ট ও ট্রাইকো কম্পোস্ট উৎপাদনেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। ট্রাইকো কম্পোস্ট মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার পাশাপাশি ছত্রাকজনিত রোগ ব্যবস্থাপনায় কাজে লাগানোর উদ্যোগ রয়েছে।
    উৎপাদন খরচ কমাতে শেড ছাড়াই গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষের প্রদর্শনী করা হয়েছে। ভবিষ্যতে কৃষক নির্বাচন ও কারিগরি প্রস্তুতি নিশ্চিত করে পলিশেড প্রযুক্তি সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

    সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, প্রকল্পের পুরো দল গত কয়েক মাস ধরে মাঠপর্যায়ে নিয়মিত কাজ করছে। শুরু থেকেই মাঠ পরিদর্শনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষায়, শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনা করলে প্রকল্পের বাস্তব চিত্র বোঝা যায় না; কৃষকের জমিতে কার্যক্রম কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়াকে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রকল্প তৈরির শুরু থেকেই তিনি এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাই উদ্দেশ্য, পরিকল্পনা ও মাঠপর্যায়ের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁর ধারণা রয়েছে। এখন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে কৃষকের কাছে সুফল পৌঁছে দেওয়াই প্রধান লক্ষ্য।

  • মরিচগাছ অজ্ঞাত রোগে মরছে

    মরিচগাছ অজ্ঞাত রোগে মরছে

    জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় অজ্ঞাত রোগে মরিচগাছ মরে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকেরা। উপজেলার কড়ইচড়া ইউনিয়নের বিনোদটঙ্গী এলাকায় প্রায় পাঁচ একর জমির মরিচখেতে এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। গাছে মরিচ ধরতে শুরু করলেও একের পর এক গাছের ডালপালা শুকিয়ে মরে যাচ্ছে গাছ। বিভিন্ন ধরনের সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করেও গাছ রক্ষা করতে পারছেন না কৃষকেরা।

    তাদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত খেত দেখতে এখন পর্যন্ত কৃষি বিভাগের কোনো কর্মকর্তা আসেননি।

    সরেজমিনে দেখা যায়, বিনোদটঙ্গী এলাকার মাঠজুড়ে মরিচের আবাদ। গাছে গাছে মরিচ ধরতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে কিছু গাছের ডালপালা শুকিয়ে যাচ্ছে, আবার কিছু গাছ পুরোপুরি মরে গেছে। গাছ বাঁচাতে কৃষকেরা নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন ধরনের সার ও কীটনাশক প্রয়োগ করছেন। কিন্তু তাতেও কোনো সুফল মিলছে না। ফলে ফসল ঘরে তোলার আগেই বড় ধরনের লোকসানের আশঙ্কা করছেন তারা।

    স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকার সাতজন কৃষক প্রায় পাঁচ একর জমিতে বগি, পিউর ও প্রিমিয়াম জাতের মরিচ চাষ করেছেন। গাছে মরিচ আসতে শুরু করার পর এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারাউপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে মাদারগঞ্জ উপজেলায় ৭৫০ হেক্টর জমিতে মরিচ চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ইতিমধ্যে ১ হাজার ৫০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ হয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩০০ হেক্টর বেশি জমিতে মরিচ চাষ করা হয়েছে।

    স্থানীয় কৃষক আব্দুস সামাদ ৪৬ শতাংশ জমিতে মরিচ চাষ করেছেন। এতে তার খরচ হয়েছে প্রায় ৭০-৮০ হাজার টাকা। গাছে মরিচ ধরতে শুরু করায় ভালো ফলনের আশা করেছিলেন তিনি। মরিচ বিক্রির অর্থ দিয়ে সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্নও দেখছিলেন। কিন্তু গাছ মরে যাওয়ায় এখন সেই স্বপ্ন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

    আব্দুস সামাদ বলেন, ‘গত সপ্তাহ থেকে মরিচগাছে রোগের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করেছে। বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করেও গাছ রক্ষা করতে পারছি না। কৃষি অফিস থেকে এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের খোঁজখবর নেননি।’

    আরেক কৃষক এনছ মণ্ডল বলেন, ‘এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তিনি সরেজমিনে এসে খোঁজখবর নেননি।’

    ফোনে গাছ মরে যাওয়ার বিষয়টি জানালে সমস্যার কারণ অনুসন্ধানের পরিবর্তে উল্টো নানা প্রশ্ন করা হয় এবং কৃষকদেরই দোষারোপ করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।এ ছাড়া কৃষক শহীদুল ইসলাম ও নুর ইসলামের মরিচখেতেও ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, মরিচগাছে কী ধরনের রোগ হয়েছে, তা তারা বুঝতে পারছেন না। নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন ওষুধ প্রয়োগ করেও গাছ রক্ষা করা যাচ্ছে না। দ্রুত রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন তারা।

    এ বিষয়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রাজিব মিয়া জানান, তিনি বর্তমানে সিধুলী ইউনিয়নে কৃষি কার্ডের কাজ করছেন। তার মূল দায়িত্ব গুনারীতলা ইউনিয়নের খুদ্দ জোনাইল এলাকায়। পাশাপাশি বিনোদটঙ্গী এলাকাতেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। একাধিক এলাকায় দায়িত্ব পালন এবং কৃষি কার্ডের কাজে ব্যস্ত থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত মরিচখেত পরিদর্শনে যেতে পারেননি বলে জানান তিনি।

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাবিবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কৃষকদের উপজেলা কৃষি অফিসে আসতে বলেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত খেত সরেজমিনে পরিদর্শন, রোগ শনাক্তকরণ এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়ার বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

    ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দাবি, দ্রুত মরিচগাছের রোগ শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরামর্শ দিতে হবে। তা না হলে মৌসুমের শুরুতেই তাদের কষ্টার্জিত বিনিয়োগ হারানোর পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।

  • ১ টাকায় মিলছে ৪ লাউ

    ১ টাকায় মিলছে ৪ লাউ

    লোকসানের বোঝা সইতে না পেরে অনেক কৃষক লাউবাগানের পরিচর্যা বন্ধ করে দিয়েছেন। কেউ কেউ বাগান কেটে ফেলছেন, আবার কেউ ক্ষেতের লাউ গবাদিপশুকে খাওয়াচ্ছেন। সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে লাউচাষিদের এমন দুরবস্থার চিত্র দেখা গেছে।

    কৃষকদের অভিযোগ, এক কেজি মোটা চাল কিনতে বিক্রি করতে হচ্ছে প্রায় ২০০টি লাউ। আর কেজিপ্রতি ৭৫০ টাকা দরে এক কেজি গরুর মাংস কিনতে বিক্রি করতে হচ্ছে প্রায় তিন হাজারটি লাউ। পরিশ্রম করে ফসল ফলিয়েও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তাঁরা।

    উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের তেলিপাড়া এলাকার কৃষক দুলাল ইসলাম জানান, ৪০ শতক জমিতে লাউ চাষ করতে তাঁর খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। অথচ উৎপাদিত লাউ বিক্রি করে এখন পর্যন্ত পেয়েছেন মাত্র তিন হাজার টাকা। এই সামান্য আয় দিয়ে শ্রমিকের মজুরিও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না।

    একই নামের আরেক কৃষক বলেন, লাউ চাষ করে কী পরিমাণ লোকসানে পড়েছেন, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। দুই থেকে তিন হাজার লাউ বিক্রি করেও এক কেজি গরুর মাংস কেনা যায় না। ন্যায্য দাম না পেয়ে বাধ্য হয়ে তিনি বাগান কেটে ফেলেছেন। কিছু লাউ গবাদিপশুকেও খাওয়াচ্ছেন। অথচ বাজারে সেই লাউই প্রতি পিস ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

    উপজেলার ঝলঝলি উলারচাপ এলাকার কৃষক আনসারুল ইসলাম বলেন, লাউয়ের দাম না থাকায় গত ১০ দিন ধরে বাগানের পরিচর্যা বন্ধ রেখেছেন তিনি। একদিকে সার ও কীটনাশকের দাম বাড়ছে, অন্যদিকে শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। অথচ ক্ষেতের লাউ বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ পাঁচ টাকা পিস।

    তিনি বলেন, উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে ফসল বিক্রি করতে হলে কৃষকের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। কষ্ট করে ফসল ফলিয়েও ন্যায্য দাম না পেলে একসময় মানুষ কৃষিকাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হবে।

    স্থানীয় ব্যবসায়ী সলেমান আলী বলেন, এবার আটোয়ারীতে লাউয়ের আবাদ ও ফলন দুটোই ভালো হয়েছে। কিন্তু চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। বাইরের বাজারেও আশানুরূপ দাম না থাকায় কৃষকদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

    কৃষকদের ভাষ্য, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার কার্যকর উদ্যোগের অভাবে ভালো ফলনও তাঁদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারেনি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কৃষিপণ্যের দাম নিশ্চিত করা এবং কৃষকের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে পণ্য কেনার ব্যবস্থা না হলে ভবিষ্যতে কৃষিকাজে আগ্রহ হারাতে পারেন অনেকে।

    এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আটোয়ারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

    জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড় জেলায় প্রতিবছর প্রায় ৫৫০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউ চাষ হয়।

  • আগাম জাতের আমন ধানের অধিক ফলন

    আগাম জাতের আমন ধানের অধিক ফলন

    রংপুর জেলার ৮ উপজেলায় এবার আগাম জাতের আমন ধানের অধিক ফলনে উচ্ছ্বসিত কৃষকরা। এর মধ্যে জেলার বিভিন্ন এলাকার কৃষকরা পাকা ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জেলা কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রংপুরে এবার ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আগাম আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে রংপুর সদর উপজেলায় ২০৫ হেক্টর, কাউনিয়া উপজেলায় ২২৫ হেক্টর, মিঠাপুকুর উপজেলায় ২ হেক্টর এবং মেট্রোপলিটন এলাকার ৩ হেক্টর জমিসহ মোট ৪৩৫ হেক্টর জমির জাতের আমন ধান কাটা হয়েছে।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলা কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে আম ধানের চাষ হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল। আগাম জাতের আমন ধান চাষ হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে।

    রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সাইফুল ইসলাম বাসসকে বলেন, ‘উঁচু জমিতে লাগানো আগাম জাতের আমন ধান ইতোমধ্যে কাটা শুরু হয়েছে। অক্টোবরের মাঝামাঝি পযর্ন্ত আগাম জাতের আমন কাটা চলে। তবে নভেম্বরের শুরুতেই শুরু হবে মৌসুমের আমন ধান কাটা। এ বছর বন্যার প্রভাব কম থাকায় আগাম জাতের আমনের উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে।’

    তিনি বলেন, ‘কৃষকরা আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর তারা ভুট্টা, আগাম জাতের আলু ও শাকসবজিসহ নানা ধরনের শীতকালীন ফসল চাষ করেন।

    কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের অতিরিক্ত উপ পরিচালক মাহমুদা খাতুন বাসসকে বলেন, রংপুর জেলায় এ বছর এক লাখ ৬৬ হাজার ৯৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। এর মধ্যে ৪শ’ ৩৫ হেক্টর জমির আগাম জাতের আমন ধান কাটা হয়েছে। হেক্টর প্রতি আগাম জাতের আমন ধানের ফলন হয়েছে ৩.১৫ টন।

    তিনি বলেন, জেলার কৃষকরা আগাম জাতের আমন ধান কাটার পরই রবিশস্য আবাদ করবেন। ধান ও রবিশস্য মিলিয়েই ভালো দাম পাবেন বলে আশাবাদী কৃষকরা। গত বছরের মতো এবারও ফলন হয়েছে।

  • সবজি কৃষকদের ন্যায্য দাম পাওয়ার স্বক্ষমতা বাড়িয়েছে 

    সবজি কৃষকদের ন্যায্য দাম পাওয়ার স্বক্ষমতা বাড়িয়েছে 

    মোবাইল ফোনের সুবাদে গ্রামীণ সবজি চাষিরা শহরের বাজারে তাদের উৎপাদিত পন্যের তাৎক্ষণিক দাম জানতে পারেন। দেশের উত্তরাঞ্চেলের সবজি বিকিকিনির অন্যতম বৃহৎ বাজার বগুড়ার মহাস্থানের কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীরা এমন তথ্য জানিয়ে বলেছেন, এখন তারা তাদের উৎপাদিত সবজির দামের একটি বাস্তবসম্মত ধারণা নিয়েই বাজারে আসেন।

    তাদের মতে, মোবাইল ফোনের কল্যাণে পণ্যের দাম সম্পর্কে তথ্য সহজে পাওয়া এটি তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। যদিও শেষ পর্যন্ত দাম সরবরাহ এবং চাহিদার ওপর নির্ভর করে।

    উন্নয়ন বিষয়ক সাহিত্যে উদ্ধৃত গবেষণাগুলো ইঙ্গিত করে যে, মোবাইল সংযোগ তথ্য অনুসন্ধানের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয়। সবজি চাষিরা এখন প্রায়ই ফসল কাটার আগে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করার জন্য ভয়েস কল এবং এসএমএস সেবা ব্যবহার করেন।
    বগুড়া সদর উপজেলার রহমতবালা গ্রামের কৃষক মো. আমিনুল ইসলাম (৩৬) এক একর জমিতে মূলা, লাউ, কুমড়া এবং বরবটি চাষ করেছেন। ২ অক্টোবর, তিনি মহাস্থান সবজি বাজারে মূলা নিয়ে আসেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তিন দিন আগে আমি জানতাম প্রতি মণের (৪০ কিলোগ্রাম) দাম প্রায় ১,০০০ টাকা ছিল, কিন্তু আজ তা প্রতি মণ ৫০০-৬০০ টাকায় নেমে গেছে। এটি বেশি সরবরাহের কারণে এবং কারণ গরম আবহাওয়ায় চাষ করলে এই সবজির মান কখনও কখনও ভালো হয় না।”

    “কৃষকরা দাম ঠিক করার জন্য একত্রিত হতে পারেন না। কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন আছে, তাই উভয়েই সরবরাহ এবং চাহিদা সম্পর্কে তথ্য পেতে পারেন।”শিবগঞ্জের উথলী থেকে আসা রাব্বি মোল্লা (২৫), এবার প্রায় ৫০ শতক জমিতে আগাম জাতের ফুলকপি চাষ করেছেন। ক্ষেত থেকে সবজি সংগ্রহের আগে অন্যান্য কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে সম্ভাব্য দাম সম্পর্কে একটি ধারণা নিয়ে নেন।

    তিনি বলেন, “আমি ক্ষেত থেকে কিছু ফুলকপি বিক্রি করেছি। আমি এখানে (মহাস্থানে) আসি বেশি দামের আশায়। কখনও দাম বাড়ে, কখনও কমে। যখন ঢাকা বা অন্যান্য শহরে সবজির চাহিদা বৃদ্ধি পায়, তখনই পাইকার এবং ব্যবসায়ীরা আমাদের ভালো দাম দেন।”

    দামের পরিস্থিতি বুঝে, অনেক পাইকার কৃষকদের কাছ থেকে মৌসুমি সবজি কিনে মহাস্থানভিত্তিক আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন, যারা ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে তাদের সমকক্ষদের কাছে পণ্য পাইকারি পরিমাণে বিক্রি করেন।

    এমনই একজন ব্যবসায়ী শিবগঞ্জের বিচোকের মাসুম ইসলাম (২৭)। তিনি বলেন, “আমি আজ কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি মণ ১,৬০০ টাকায় করলা কিনেছি, ১,৮০০ টাকায় বিক্রি করার আশা করছি। আমরা এটি পেতে সংগ্রাম করছি কারণ আমরা আগে থেকে সঠিক দাম জানি না,” তিনি বলেন, মহাস্থানের পাইকাররা শহরের পাইকারদের কাছ থেকে পাওয়া অর্ডারের ওপর এবং সরবরাহের ওপর নির্ভর করে সবজি কেনেন। বর্তমানে শসা, বেগুন, ঝিঙে, কুমড়া, বরবটি এবং জলপাই প্রচুর পরিমাণে রয়েছে।

    “সরবরাহ যত বেশি, আমাদের লাভজনকতাও তত বেশি। কিন্তু যখন ঢাকায় চাহিদা বেশি থাকে, কৃষকরাও বেশি দাম চান। সবাই ফোন বা ফেসবুকের মাধ্যমে চাহিদা এবং সরবরাহের ওপর নজর রাখে। কৃষকরা এখন যেকোনো দাম বৃদ্ধির একটি অংশ পান,”-বলেন বগুড়ার লাহিড়ীপাড়ার আবদুল হামিদ প্রামাণিক (৪৮)। যিনি প্রায় এক দশক ধরে সবজির পাইকারি ব্যবসা করছেন।

    মহাস্থান বাণিজ্যকেন্দ্র বিভিন্ন শহরে সবজি সরবরাহ করে। এখানে প্রায় ২০০ জন পাইকার এবং ৭০ জন পাইকারি ব্যবসায়ী (বাণিজ্যিক আড়তের মালিক) রয়েছেন। তাদের মধ্যে আল-মামুন (৪০) এমনই একটি আড়তের মালিক। প্রতিষ্ঠানের সাম মাইশা ট্রেডার্স। তিনি তার পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে জানান, কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীদের মোবাইল ফোন ব্যবহার কৃষিতে বিপ্লব ঘটিয়েছে, যা কৃষকদের একটি ন্যায্য দাম নিশ্চিত করছে।

    তিনি আরও বলেন, “এটি ব্যবসায় প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করেছে। এখন কৃষক বিক্রি দর এবং পাইকারি দরের মধ্যে বিশাল পার্থক্য দেখা জায় না। অবশ্যই যেকোনো দাম বৃদ্ধি ভোক্তাদের প্রভাবিত করে, কিন্তু কৃষকরা উপকৃত হন।”

    ঢাকার মিরপুরের বিশাল ভাণ্ডার পাইকারি আড়তের প্রতিনিধি হিসেবে হেফজুল বারী ফকির (৪০) মহাস্থানেই থাকেন। তিনি বলেন, “আমি প্রতিদিন সকালে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঢাকা থেকে সবজির চাহিদার সঙ্গে সঙ্গে সম্ভাব্য দামের নির্দেশনা পাই। এর পর কৃষক এবং ছোট ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সবজি কিনি এবং সেগুলো ঢাকায় পরিবহন করি। কিন্তু অনেক সময়ই ঢাকা থেকে দেওয়া দামে সবজি কেনা যায় না। আর কখনও কখনও সম্ভব্য দামের চেয়ে কম দামেও কিনতে পারি। আবশ্য তা ঘটে প্রধানত: সবজির কম বেশি সরবরাহের ওপর।” উল্লেখ করেন তিনি।

    “কৃষকদের বাজারের তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং তারা যে ব্যক্তি তাদের ভালো দাম দেয়, তার কাছে বিক্রি করার চেষ্টা করেন। উৎপাদন কমে গেলে, অথবা যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হলে, সবজির দাম বেড়ে যায়।”
    সবজি পচনশীল এবং দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়।

    বিশেষজ্ঞরা হিসাব করেছেন যে, ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানোর আগে উৎপাদিত সবজির ৩০% নষ্ট হয়ে যায়। কৃষক এবং ব্যবসায়ীরা এখন দ্রুত দামের তথ্য পেতে সক্ষম হওয়ায়, এটি তাদের দ্রুত সবজি বিক্রি করতে সহায়তা করা উচিত। আশা করা হচ্ছে, এটি নষ্ট হওয়া কমাবে।

  • কালো ধান অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা।

    কালো ধান অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনা।

    রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলায় প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে চাষ হচ্ছে পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ও উচ্চমূল্যের ব্ল্যাক রাইস বা কালো ধান। প্রচলিত সোনালি ধানের পাশাপাশি মাঠজুড়ে নতুন এ জাতের ধান কৃষকদের মধ্যে তৈরি করেছে আগ্রহ ও আশা। ফলন ও বাজারদর অনুকূলে থাকলে এ ফসল স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

    উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, দুর্গাপুর পৌরসভার দেবীপুর গ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা সোহান ১৬ কাঠা জমিতে এবং মাড়িয়া ইউনিয়নের পালি গ্রামের কৃষক আবু তালেব প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে কালো ধানের আবাদ করেছেন। নতুন এ ফসলের পরিচর্যা, ফলন বৃদ্ধি ও বাজারজাতকরণ বিষয়ে কৃষকদের কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দিচ্ছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

    কৃষক আবু তালেব বলেন, ‘ব্ল্যাক রাইস আমাদের এলাকায় একেবারেই নতুন। তাই ঝুঁকি বিবেচনায় পরীক্ষামূলকভাবে আড়াই বিঘা জমিতে চাষ করেছি। ফলন ভালো হলে এবং বাজারে ন্যায্য দাম পেলে লাভবান হওয়ার আশা করছি। উদ্যোগটি সফল হলে আশপাশের অন্য কৃষকেরাও এ ধান চাষে আগ্রহী হবেন।’

    কৃষকদের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বিঘায় ১৬-১৮ মণ ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রতি মণ ধানের সম্ভাব্য বিক্রয়মূল্য ৪ হাজার টাকা ধরা হলে বিঘাপ্রতি মোট বিক্রয় আয় হতে পারে ৬৪-৭২ হাজার টাকা। তবে এটি সম্ভাব্য আয়ের হিসাব; উৎপাদন খরচ, প্রকৃত ফলন ও বাজারদরের ওপর নির্ভর করবে চূড়ান্ত মুনাফা।

    কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, কালো চালে অ্যান্থোসায়ানিন নামের একধরনের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রঞ্জক উপাদান থাকায় এর রং কালো বা গাঢ় বেগুনি হয়। এতে খাদ্য-আঁশসহ বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এ কারণে স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তাদের মধ্যে কালো চালের চাহিদা তৈরি হয়েছে। তবে উচ্চমূল্যের এ ফসলের বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চিত করতে উৎপাদনের পাশাপাশি উপযুক্ত বাজার ও কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

    দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, ‘দুর্গাপুরে প্রথমবারের মতো ব্ল্যাক রাইসের আবাদ কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। নতুন ও সম্ভাবনাময় ফসল চাষে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে। এবারের ফলন, উৎপাদন খরচ ও বাজারের চাহিদা পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে আবাদের পরিধি বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’পৌরসভা ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ এবং পালি ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুমিনুজ্জামানের তত্ত্বাবধানে খেতগুলো পরিচর্যা করা হচ্ছে।

    সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আবহাওয়া অনুকূলে থাকা, সন্তোষজনক ফলন এবং প্রত্যাশিত বাজারমূল্য পাওয়া গেলে কালো ধানের আবাদ দুর্গাপুরের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

    রাজশাহী অঞ্চলে ঐতিহ্যগতভাবে আউশ ও আমন ধানের চাষ হয়ে আসছে। পরবর্তী সময়ে গভীর নলকূপ ও আধুনিক সেচব্যবস্থার সম্প্রসারণে বরেন্দ্র অঞ্চলে বোরো ধানের আবাদও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কৃষিতে বৈচিত্র্য আনার ধারাবাহিকতায় দুর্গাপুরে কালো ধানের পরীক্ষামূলক চাষকে নতুন উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করছে মাঠের ফলন, উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে ক্রেতাদের প্রকৃত চাহিদার ওপর।#

  • ভেড়ামারায় ৫ বিঘা থেকে ৭০ বিঘায় পিতা-পুত্রের মিশ্র ফলের বাগান

    ভেড়ামারায় ৫ বিঘা থেকে ৭০ বিঘায় পিতা-পুত্রের মিশ্র ফলের বাগান

    কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় ৫ বিঘা জমিতে পেয়ারা চাষ দিয়ে শুরু করে এখন ৭০ বিঘা জমিতে মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলেছেন পিতা-পুত্র হযরত আলী ও রাসেল হোসেন। পরিকল্পিত পরিচর্যা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও কঠোর পরিশ্রমে তাদের এ উদ্যোগ এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।

    উপজেলার মোকারিমপুর ইউনিয়নের ফকিরাবাদ আওড়ের বিলের মাঠে সেতুসংলগ্ন কৃষিজমিতে ২০১৪ সালে তারা এ বাগান ও নার্সারি গড়ে তোলেন। পাঁচ বিঘার পেয়ারা বাগান দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা সম্প্রসারিত হয়ে বর্তমানে ৭০ বিঘায় পৌঁছেছে।

    বাগানে উৎপাদন বাড়াতে তারা ইন্টারনেটে কৃষিবিষয়ক বিভিন্ন ভিডিও দেখে আধুনিক ফল চাষ, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সেচ ও সার প্রয়োগের কৌশল শেখেন। পরে সেসব পদ্ধতি নিজেদের বাগানে প্রয়োগ করতে শুরু করেন। পরিকল্পিত পরিচর্যা ও প্রযুক্তির ব্যবহারে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে উৎপাদন।

    বর্তমানে বাগানের ৩০ বিঘা জমিতে উন্নত জাতের পেয়ারা, মাল্টা, কমলা, ড্রাগন ফল, কলা, আঙুর, বরই, সফেদা, স্ট্রবেরি ও লেবুসহ বিভিন্ন ধরনের ফল চাষ হচ্ছে।রাসেল হোসেন জানান, বাগানের প্রতিটি গাছ নিয়মিত ছাঁটাই, সুষম সার প্রয়োগ, সেচ ব্যবস্থাপনা এবং রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিচর্যা করা হয়। এতে ফলের উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি গুণগত মানও উন্নত হয়েছে। চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক পরিচর্যার কারণে গত বছরের তুলনায় পেয়ারার ফলন অনেক বেশি হয়েছে। আকারে বড় ও স্বাদে মিষ্টি হওয়ায় এসব পেয়ারার চাহিদাও ভালো।

    হযরত আলী জানান, বর্তমানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি দূরদূরান্ত থেকে সাধারণ ক্রেতারাও সরাসরি বাগানে এসে পছন্দমতো ফল সংগ্রহ করছেন। এতে ক্রেতারা তাজা ফল পাচ্ছেন, পাশাপাশি মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই উৎপাদিত ফল বিক্রি করে তাঁরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন। বর্তমানে প্রতি মণ পেয়ারা ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

    স্থানীয় কৃষকেরা জানান, হযরত আলী ও রাসেল হোসেনের সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে তারাও আধুনিক ও লাভজনক মিশ্র ফল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।

    ভেড়ামারার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. রবিউল ইসলাম জানান, তরুণদের কৃষিকাজে আগ্রহী করে তুলতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দিচ্ছে। হযরত আলী ও রাসেলের উদ্যোগ প্রমাণ করে, আধুনিক প্রযুক্তি, পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও পরিশ্রমের সমন্বয়ে কৃষিকে লাভজনক ও সম্মানজনক পেশায় পরিণত করা সম্ভব। নিজ এলাকায় থেকেই সফল উদ্যোক্তা হওয়ার সম্ভাবনাও তাঁদের সাফল্যে ফুটে উঠেছে।

  • ১১২৫ হেক্টর জমিতে কলা চাষ

    ১১২৫ হেক্টর জমিতে কলা চাষ

    বান্দরবানের আলীকদমে পাহাড়ের ঢালে ঢালে বাড়ছে কলার আবাদ। কলা চাষ করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও বাঙালি সম্প্রদায়ের প্রান্তিক কৃষকেরা। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে এখানকার কলা সরবরাহ করা হচ্ছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। তবে সারসংকট, সরকারি প্রণোদনার অভাব ও যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় এ খাতের সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছেন না চাষিরা।

    উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ে বছরজুড়েই বাংলা, চাপা, সাগর, সরবি ও কাঁচকলার চাষ হয়। তবে আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কলার ফলন বেশি পাওয়া যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, শুধু রবিবারেই পানবাজার ও আমতলী নদীঘাট থেকে ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার ছড়া কলা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়।চৈক্ষ্যং ইউনিয়নের ভরিমুখ কর্মকারপাড়া এলাকার দুই তরুণ কৃষক মো. হাসান ও খুরশেদ আলম ১০ একর জমিতে কলা চাষ করেছেন। তাঁরা জানান, প্রতি সপ্তাহে ২০০ থেকে ২৫০টি কলার ছড়া বিক্রি করেন। ছড়াপ্রতি দাম পান ১৫০ থেকে ৫০০ টাকা। তবে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না। পর্যাপ্ত সার সরবরাহ করা গেলে উৎপাদন দ্বিগুণ করা সম্ভব বলে মনে করেন তাঁরা।

    কলা পরিবহনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ কমছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরাও। চকরিয়ার ব্যবসায়ী মো. শামশুল আলম বলেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও টোলের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কলা পরিবহনে ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান বলেন, আকার ও গুণগত মানের কারণে পাহাড়ি কলার চাহিদা ভালো।

    কৃষকদের মতে, পর্যাপ্ত সার, সরকারি প্রণোদনা ও উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে আলীকদমে কলা চাষের পরিসর আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে প্রান্তিক কৃষকদের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিও আরও গতিশীল হবে।

    উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর আলীকদমে মোট ১ হাজার ১২৫ হেক্টর জমি ও পাহাড়ের ঢালে কলার আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে বাংলা কলা ৬৭৭ হেক্টর, চাপা কলা ৩৫৪ হেক্টর, সাগর কলা ৫২ হেক্টর, সরবি কলা ২৭ হেক্টর এবং কাঁচকলার আবাদ হয়েছে ১৫ হেক্টর জমিতে।

    উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা বলেন, পাহাড়ের মাটিতে প্রাকৃতিকভাবেই কলাগাছ বেড়ে ওঠে। চারার আশপাশের জঙ্গল পরিষ্কার করা, মরা পাতা অপসারণ এবং অতিরিক্ত চারা কেটে ফেলার মতো পরিচর্যা করলেই ভালো ফলন পাওয়া যায়। সার ও কীটনাশক ছাড়াই চাষ করা হয় বলে এ কলার পুষ্টিগুণ অটুট থাকে এবং বাজারে চাহিদাও বেশি।

    তিনি আরও বলেন, উপজেলায় সারের চারজন ডিলার থাকলেও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম। তবে সমন্বয়ের মাধ্যমে সব কৃষকের মধ্যে সার বিতরণের চেষ্টা চলছে।

  • কৃষকরা শসা চাষে নতুন স্বপ্ন দেখছেন

    কৃষকরা শসা চাষে নতুন স্বপ্ন দেখছেন

    জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে আগাম শসার চাষ করা হয়েছে। কম খরচ ও স্বল্প সময়ে অধিক লাভজনক হওয়ায় শসা চাষে ঝুঁকছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়ায় এবার শসার বাম্পার ফলন হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে সন্তোষজনক দাম পাওয়ায় কৃষকদের মুখে ফুটেছে হাসি। উৎপাদিত শসা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন ট্রাকযোগে সরবরাহ করা হচ্ছে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।

    উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে মাদারগঞ্জে প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে আগাম শসার আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন শসা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও হয়েছে ভালো।

    কৃষকরা জানান, বর্তমানে পাইকারি বাজারে প্রতি কেজি শসা ৩০-৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজির দাম ৫০-৬০ টাকা। শসা চাষে তুলনামূলক কম খরচ এবং লাভের সম্ভাবনা বেশি থাকায় এ বছর আগাম শসা চাষে কৃষকদের আগ্রহ বেড়েছে।সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, মাঠের পর মাঠজুড়ে শসার আবাদ। মাচায় ফুটেছে হলুদ-সাদা ফুল। কোথাও থরে থরে ঝুলছে শসা। কেউ জমিতে সেচ দিচ্ছেন, কেউ গাছের পরিচর্যায় ব্যস্ত। আবার কেউ ক্ষেত থেকে শসা তুলে বস্তায় ভরছেন। শসাভর্তি বস্তা অটোরিকশায় করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে বাজারে। এবার কৃষকেরা গ্রিন বিউটি, জাদু, জিনিয়া ও ময়নামতিসহ বিভিন্ন উন্নত জাতের শসা আবাদ করেছেন।

    জোড়খালী ইউনিয়নের ফুলজোড় এলাকার কৃষক সাইদুর রহমান বলেন, ‘শসার বীজ রোপণের ৩০-৩৫ দিনের মধ্যে গাছে ফল ধরতে শুরু করে। এবার শসার ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে। ফলন ও দাম এভাবে অব্যাহত থাকলে শসা চাষ করে লাভবান হওয়া সম্ভব।’বালিজুড়ী ইউনিয়নের নাংলা এলাকার কৃষক তৈয়ব আলী বলেন, ‘প্রতি বিঘা জমিতে শসা চাষে খরচ হয় ১৫-২০ হাজার টাকা। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘার শসা বিক্রি করা যায় প্রায় ৩০-৪০ হাজার টাকায়। তবে শ্রমিকের মজুরি, সেচ, সার ও বাজারজাতকরণের খরচের ওপর প্রকৃত লাভের পরিমাণ নির্ভর করে। এবার দাম ভালো থাকায় আমরা খুশি। আগামীতে আরও জমিতে শসা চাষ করার ইচ্ছা আছে।’

    উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুর রহমান বলেন, ‘এ বছর মাদারগঞ্জে প্রায় ৬০ হেক্টর জমিতে আগাম শসার আবাদ হয়েছে। চাষিরা আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে শসার আবাদ করছেন। উপজেলায় প্রায় ২ হাজার মেট্রিক টন শসা উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার মাটি ও জমি শসা চাষের জন্য উপযোগী। এ কারণে প্রতিবছরই শসার আবাদ বাড়ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ফলনও ভালো হয়েছে।’

  • ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে

    ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ খাদ্য সংকটে

    দেশে খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছে বিপুলসংখ্যক মানুষ। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আয় ও কর্মসংস্থানের সংকটের পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) পূর্বাভাস বলছে, ২০২৬ সালের শেষ চার মাসে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকিতে থাকতে পারে দেশের ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ। বছরের শুরুর তুলনায় এ সংখ্যা ২৮ লাখ বেশি।আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) বিশ্ব খাদ্য দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আজকের উদ্ভাবন, আগামী দিনের পুষ্টি’। ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০তম সম্মেলনে দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে প্রথমবারের মতো দিবসটি উদযাপন করা হয়। খাদ্যপ্রাপ্তি ও পুষ্টির গুরুত্ব তুলে ধরার এ দিনে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার পরিস্থিতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।

    ডব্লিউএফপির গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। পণ্যের উচ্চমূল্য ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি বন্যায় কৃষিজমির ক্ষতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খাদ্যসহায়তা অব্যাহত রাখা নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

    খাদ্যের জোগান থাকলেও তা কেনার সামর্থ্য অনেক পরিবারের নেই। সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) হিসাবে, বর্তমানে বাজারে মোটা চালের কেজি অন্তত ৫০ টাকা। খোলা আটার দামও কেজিপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের মাসিক ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে খাবার কিনতে।খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার প্রবণতা শুরু হয় ২০২২ সালের প্রথম দিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা প্রায় এক যুগের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরবর্তী কয়েক মাসও এ হার ১০ শতাংশের ওপরে ছিল। বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার কমলেও পণ্যের দাম কমে আগের অবস্থায় ফেরেনি।

    বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সেপ্টেম্বরের হিসাবে, খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩০ শতাংশে। অর্থাৎ, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের ব্যয়ের চাপ পুরোপুরি কমেনি।

    অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৩ অক্টোবরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ২ শতাংশে নেমে আসতে পারে। একই সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে। প্রবৃদ্ধির ধীরগতি ও মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত থাকলে মানুষের আয়, ক্রয়ক্ষমতা এবং বিনিয়োগের পরিবেশ আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

    কৃষি উৎপাদনেও দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে। ডব্লিউএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ৮০ হাজার হেক্টর কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়েছে ২ লাখ ৩০ হাজার কৃষক পরিবার এবং ১৩ লাখ মানুষ। কৃষিজমি নষ্ট হওয়ায় একদিকে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে, অন্যদিকে কৃষির ওপর নির্ভরশীল বহু মানুষের আয়ের পথ সংকুচিত হয়েছে।

    খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে প্রবাসী আয়ের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট প্রবাসী আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এ অঞ্চলে অস্থিরতার কারণে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে দেশের অর্থনীতি ও পরিবারগুলোর ক্রয়ক্ষমতার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

    খাদ্যের অভাবের পাশাপাশি পুষ্টিহীনতাও উদ্বেগজনক। ডব্লিউএফপির তথ্য অনুযায়ী, দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চার শিশুর একজন খর্বকায়। অর্থাৎ বয়সের তুলনায় তাদের উচ্চতা কম। এ ছাড়া ১১ শতাংশ শিশু ক্ষীণকায়, অর্থাৎ উচ্চতার তুলনায় তাদের ওজন কম। দেশের প্রতি পাঁচটি পরিবারের মধ্যে দুটিতে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অণুপুষ্টির ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত খাবার ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান না পাওয়ায় শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।খাদ্য বিতরণে সরকারি কর্মসূচির তথ্যেও কিছুটা ঘাটতির চিত্র পাওয়া যায়। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে ৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ৮ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল ও গম বিতরণ করা হয়েছে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ হাজার টন কম। তবে দেশে বর্তমানে প্রায় সাড়ে ২৩ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে।

    খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা মোকাবিলায় সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, সংকট মোকাবিলায় সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে তাদের কাছে দ্রুত ও কার্যকর সহায়তা পৌঁছে দেওয়া।

    তিনি বলেন, নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর, কৃষিশ্রমিক, নারীপ্রধান পরিবার এবং দুর্যোগকবলিত এলাকার মানুষের জন্য খাদ্যসহায়তা বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্যে চাল, ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি এবং প্রকৃত অভাবগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নগদ সহায়তার পরিধি বাড়াতে হবে।

    বাজারে কৃত্রিম সংকট ও পণ্যের দাম নিয়ে কারসাজি ঠেকানোর ওপরও গুরুত্ব দেন সেলিম রায়হান। তার মতে, মজুতদারি প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি এবং খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্য সহায়তা যেন প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।