সন্ধ্যা নদীতীরের গ্রামে ফুলের চারা উৎপাদন বদলে দিচ্ছে অর্থনীতি

Flower nursery boom reshapes economy of riverside villages in southern Bangladesh

প্রতিবেদন:

·

, , , , ,

শীত মৌসুম এলেই বরিশালের বানারীপাড়া ও পিরোজপুরের নেছারাবাদের গ্রামগুলো যেন ভিন্ন এক কর্মব্যস্ততায় মুখর হয়ে ওঠে। সন্ধ্যা নদীর তীরঘেঁষা এই দুই উপজেলায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য নার্সারি। শীত মৌসুমে নার্সারিগুলোয় শুরু হয় ফুলের চারা উৎপাদনের প্রস্তুতি।

নদীতীরের এসব গ্রামে নার্সারির চারাগুলোর শাখায় শাখায় আর কদিন পরই ফুটবে লাল, নীল, হলুদ, গোলাপি, বেগুনি—নানা ফুল। এই চারা ও ফুল উৎপাদনের মধ্য দিয়েই স্থানীয় উদ্যোক্তারা গড়ে তুলেছেন এক নীরব কিন্তু বিস্তৃত অর্থনৈতিক বিপ্লব।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে প্রায় অর্ধকোটি ফুলের চারা বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে, যার সম্ভাব্য মূল্য ১০ কোটি টাকার বেশি।

নার্সারিমালিকদের দাবি, গত বছর তাঁরা প্রত্যাশা অনুযায়ী ফুলের চারা বিক্রি করতে পারেননি। এতে অনেকেই লোকসানের মুখে পড়েছিলেন। এবার সেই লোকসান পুষিয়ে নিতে আগের চেয়ে বেশি জমিতে তাঁরা চারা উৎপাদন শুরু করেছেন। অগ্রহায়ণের শুরুতেই এসব নার্সারি মুখর হয়ে ওঠে শ্রমিকদের কর্মব্যস্ততায়।

সম্প্রতি বানারীপাড়া উপজেলা সদরের তেতলা, পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার অলংকারকাঠি, কুনিয়ারী, মাহমুদকাঠি, সুলতানপুরসহ নানা এলাকা ঘুরে দেখা গেছে—নার্সারিগুলোতে মানুষের ব্যস্ততা। গাঁদা, ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, রজনীগন্ধা, গোলাপ, টিউলিপ, কসমস, বেলি, সূর্যমুখী, অর্কিড, সিলভিয়া, মর্নিং ফ্লাওয়ার, ক্যালেন্ডুলাসহ শতাধিক প্রজাতির দেশি-বিদেশি ফুলের চারা। কেউ চারা পরিচর্যা করছেন, কেউ পানি দিচ্ছেন, কেউবা পলিথিনে, টবে, সিমেন্টের বস্তা দিয়ে বানানো ব্যাগে মাটি ভরে নতুন চারা করার জন্য প্রস্তুত করছেন। শুধু নেছারাবাদ ও বানারীপাড়া উপজেলাতেই অন্তত ২০টি গ্রামজুড়ে চলছে এই কর্মযজ্ঞ।

নার্সারিমালিক আবদুর কাদের বলেন, ‘সারা বছর বিভিন্ন ফলের চারা উৎপাদন করি, তবে শীত আসার আগেই শুরু করি ফুলের বীজ বপন। এই তিন মাস আমরা ফুলের চারা বিক্রি নিয়েই ব্যস্ত থাকি। প্রতি মৌসুমে পাঁচ–ছয় লাখ টাকার ফুলের চারা বিক্রি হয়—এর অর্ধেকই থাকে লাভ।’

নেছারাবাদ উপজেলার কুড়িয়ানার নার্সারিমালিক সমীরণ রায় বলেন, ‘এবার ৯০ শতাংশ জমিতে ফুলের চারা করেছি। আশা করছি অন্তত দুই লাখ টাকার বিক্রি হবে।’

নার্সারির শ্রমিক রাহাত হোসেন জানান, এখানে ফুলের চারার দাম ৫০ টাকা থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। বনসাই ও বিদেশি জাতের ফুলের চারা সবচেয়ে দামি।

নার্সারি ঘিরে দুই উপজেলায় অসংখ্য নারীর কর্মসংস্থান হয়েছে। নারী শ্রমিক আয়েশা আক্তার তাঁদের একজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নারীদের আয়ের প্রধান উৎস এখন নার্সারি। প্রতিটি নার্সারিতে চার-পাঁচজন করে নারী শ্রমিক কাজ করেন। দৈনিক মজুরি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত ব্যস্ত থাকতে হয়। এখানে কর্মসংস্থান হওয়ায় আমাদের সংসারে আগের টানাপড়েন আর নেই।’

কোহিনুর নার্সারির ব্যবস্থাপক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘গতবছর বরিশালের বাইরে থেকে ক্রেতারা কম এসেছিলেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফুল ও বাগান তৈরির বরাদ্দও কম ছিল, তাই ক্ষতি হয়েছিল। এবার আশা করি, বিক্রি ভালো হবে। বাইরের ক্রেতারা এরই মধ্যে চারা নেওয়ার জন্য যোগাযোগ করছেন।’

রূপ-গন্ধে ভরা অলংকারকাঠি

বরিশাল শহর থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে, বরিশাল–বানারীপাড়া–নেছারাবাদ সড়কের পাশে অলংকারকাঠি গ্রাম। চোখ ফেরালেই দেখা যায়, সবুজ আর শাখায় শাখায় বাহারি ফুলের শোভা।

গ্রামের নার্সারি মালিক নূর হোসেন ব্যাপারী (৬৫) জানান, তিনি দেড় একর জমি ভাড়া নিয়ে সাত বছর আগে গড়ে তুলেছেন ‘ইয়ামিন নার্সারি’। তিনি জানান, অলংকারকাঠি গ্রামেই এখন ১৫০টির বেশি নার্সারি। ফুলের চারা বিক্রির পাশাপাশি ফলের চারা বিক্রি করেও ভালো আয় করছেন তাঁরা।

স্থানীয় লোকজন জানান, নদীনালায় ঘেরা এ অঞ্চলে ধান চাষের সুযোগ কম। আগে চেরাই কাঠ, ভাসমান ফলদ-বনজ চারা উৎপাদন ও পেয়ারা–নারকেল–সুপারি বাগানের প্রচলন ছিল। সেই বাগানের চাহিদা থেকেই প্রায় ৫০ বছর আগে শুরু হয় বাণিজ্যিক নার্সারি ব্যবসা। গত দুই দশকে এখানে ফুলের চারা উৎপাদনও ব্যাপকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে দেশের ফুলের চারার বড় অংশই আসে পিরোজপুর-বরিশালের এই উপজেলা থেকে।

নার্সারিমালিক শাহাদাৎ হোসেন জানান, আশ্বিন মাসে ঢাকা থেকে বীজ সংগ্রহ করেন তাঁরা। এরপর তা দিয়ে বীজতলা তৈরি করেন। ১৫–২০ দিন পর চারা গজালে পলিথিন, সিমেন্টের ব্যাগ, টবে তুলে পরিচর্যা শুরু হয়। অগ্রহায়ণ মাস থেকে ফুল ফোটা শুরু হয়। এই ফুলও তাঁরা পাইকারি বিক্রি করেন। চৈত্র মাস পর্যন্ত ফুল বিক্রি চলে।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, বর্তমানে এ অঞ্চলে ৯ হাজার ৫৬৭ একর জমিতে চারা উৎপাদন হচ্ছে। এর অর্ধেকের বেশি জমিতে শীতকালীন ফুলের চাষ হয়। সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে পিরোজপুর জেলার ২৯১ একর জমিতে।

নেছারাবাদ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজুল ইসলাম বলেন, উপজেলায় প্রায় দুই হাজার নার্সারি আছে, এর মধ্যে ৩৬৩টি বড় আকারের। এ বছর চাষ বেড়েছে ১৫–২০ শতাংশ।

বরিশাল বিভাগীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, দক্ষিণাঞ্চলে নার্সারি ব্যবসা এখন অত্যন্ত জনপ্রিয়। দেশের নানা অঞ্চলের ক্রেতারা বরিশাল ও পিরোজপুরের নার্সারির দিকে ঝুঁকছেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এ বছর উৎপাদন ভালো হয়েছে, কৃষকেরাও লাভবান হবেন।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ