ব্রিটেনের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি ঔপনিবেশিক দেশগুলোর

দাসপ্রথা ও ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য ব্রিটেনের কাছে ক্ষতিপূরণ বা পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচারের দাবি জোরদার করছে ক্যারিবীয় দেশগুলো। দাবি আদায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি আইনি পথেও এগোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশগুলো। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক আদালতেও যাওয়ার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে।

বার্বাডোসে অনুষ্ঠিত তিন দিনের এক আঞ্চলিক সম্মেলনে ক্যারিবীয় নেতারা এ বিষয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। ১৭ থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত সম্মেলনটি আয়োজন করে ক্যারিকম রিপারেশনস কমিশন, বার্বাডোস সরকার ও ক্যারিকম সচিবালয়।

ক্যারিবীয় নেতাদের দাবি, আটলান্টিক দাস বাণিজ্য ও দাসপ্রথার ফলে তাদের সমাজ ও অর্থনীতিতে যে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি হয়েছে, তার স্বীকৃতি ও প্রতিকার প্রয়োজন। বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিপূরণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ঐতিহাসিক দায় স্বীকার, আনুষ্ঠানিক ক্ষমা, সাংস্কৃতিক সম্পদ ফেরত দেওয়া এবং দাসপ্রথার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার বিষয়ও যুক্ত।

বার্বাডোসের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মোটলি বলেন, এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ব্রিটেনকে অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করা নয়; বরং ঐতিহাসিক অন্যায়ের স্বীকৃতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। তিনি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সময় ক্যারিবীয় অঞ্চলে আফ্রিকানদের শ্রম ও জীবনের ব্যাপক শোষণের কথা তুলে ধরেন।

ক্যারিকমের সংশোধিত ১০ দফা পরিকল্পনায় ক্ষতিপূরণের পাশাপাশি আনুষ্ঠানিক ক্ষমা, সাংস্কৃতিক সম্পদ ও ঐতিহাসিক নিদর্শন ফেরত দেওয়া, দাসপ্রথার কারণে সৃষ্ট বৈষম্য মোকাবিলা এবং নারী ও শিশুদের ওপর দাসপ্রথার বিশেষ প্রভাবের বিষয়ও গুরুত্ব পেয়েছে। পরিকল্পনাটিকে ‘রিপারেটরি জাস্টিস’ বা ক্ষতিপূরণমূলক ন্যায়বিচারের একটি কাঠামো হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।

আইনি পদক্ষেপের বিষয়টিও এবার গুরুত্ব পাচ্ছে। ক্যারিবীয় নেতাদের আলোচনায় যুক্তরাজ্যের প্রিভি কাউন্সিল এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আইনি উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর আগে জ্যামাইকা ব্রিটিশ রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে একটি আবেদন করেছে। ওই আবেদনে ব্রিটিশ শাসনামলে আফ্রিকানদের জোরপূর্বক জ্যামাইকায় নিয়ে যাওয়া বৈধ ছিল কি না এবং ব্রিটেনের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কোনো আইনগত দায় রয়েছে কি না—এসব বিষয়ে আইনি মতামত চাওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে ব্রিটিশ সরকার এখন পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ব্রিটিশ সরকারের অবস্থান হলো, যুক্তরাজ্য দাসপ্রথার জন্য ক্ষতিপূরণ দেবে না। ফলে ক্যারিবীয় দেশগুলোর নতুন উদ্যোগের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের অবস্থানের বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়েছে।

দাসপ্রথা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়েও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ আফ্রিকানদের দাস বাণিজ্য ও বর্ণভিত্তিক দাসপ্রথাকে মানবতার বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে একটি প্রস্তাব গ্রহণ করে। ক্যারিবীয় নেতারা এই সিদ্ধান্তকে তাদের ক্ষতিপূরণ দাবির আইনি ও নৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন।

এর আগে জুন মাসে ঘানার রাজধানী আক্রায় আফ্রিকা ও ক্যারিবীয় দেশগুলোর নেতারা দাসপ্রথা ও ঔপনিবেশিকতার ক্ষতিপূরণ নিয়ে একটি বৈশ্বিক কাঠামো গ্রহণ করেন। সেখানে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষতিপূরণ, সাংস্কৃতিক সম্পদ ফেরত এবং ঋণের বোঝা কমানোর মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ক্যারিবীয় নেতাদের এই উদ্যোগের পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হতে পারে কমনওয়েলথ সরকারপ্রধানদের বৈঠক। অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডায় অনুষ্ঠেয় ওই বৈঠকে রাজা তৃতীয় চার্লসের উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। ক্যারিবীয় দেশগুলো সেখানে দাসপ্রথা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি আলোচনায় তোলার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ক্যারিবীয় দেশগুলোর বর্তমান উদ্যোগ তাই শুধু অতীতের দাসপ্রথার ক্ষতিপূরণ দাবি নয়; বরং দাসপ্রথা ও ঔপনিবেশিকতার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের স্বীকৃতি, বৈষম্য কমানো এবং ঐতিহাসিক সম্পর্ককে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা হিসেবে সামনে এসেছে। তবে ব্রিটিশ সরকারের বর্তমান অবস্থানের কারণে এ বিষয়ে কূটনৈতিক ও আইনি লড়াই আরও দীর্ঘ হতে পারে।

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।