ইয়েমেনে বাস্তুচ্যুত লাখের বেশি

ইয়েমেনে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। একদিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অনুগত বাহিনী। অন্যদিকে বিদ্রোহী হুতি। হুতিদের হাতে অত্যাধুনিক অস্ত্র থাকায় তাদের কাছে পাত্তা পাচ্ছে না সরকারি বাহিনী। ফলে একের পর এক কৌশলগত এলাকা দখল করে নিচ্ছে তারা। পাশাপাশি সৌদি আরবেও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে হুতিরা। ইরান সমর্থিত হুতিরা এতদিন মুসলিমদের কিছু অংশের সমর্থন পেলেও এখন তা ম্লান হয়ে যেতে পারে।

কারণ, তাদের ড্রোন পবিত্র মক্কা নগরীর কাছাকাছি চলে গিয়েছে। তার আগেই সৌদি বাহিনী তা ধ্বংস করেছে। ইসলামের পবিত্র স্থাপনা পবিত্র কাবা ও মদিনায় মসজিদে নববী। এগুলোর সম্মান, মর্যাদা মুসলিমদের কাছে সর্বোচ্চ। ফলে যদি পবিত্র মক্কা নগরীতে হুতিদের কোনো ড্রোন আঘাত হানে, তাহলে মুসলিম সেন্টিমেন্ট ঘুরে যেতে পারে। বার্তা সংস্থা এএফপি বলছে, ইয়েমেনের এই সহিংসতায় দেশটির ভেতরেই এক লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।

নিরাপত্তার সন্ধানে আরও হাজার হাজার মানুষ বাব-আল মান্দেব প্রণালি পাড়ি দিয়ে জিবুতিতে পৌঁছানোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রায় বাধ্য হচ্ছে। এমন তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘ। ইউএনএইচসিআরের বিবৃতিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, সহিংসতার কারণে আরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ায় সীমিত সম্পদের ওপর স্থানীয় জনগোষ্ঠীর চাপ বাড়ছে। এর ফলে মানবিক সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইয়েমেনের ভেতরে বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর জরুরি প্রয়োজন মেটাতে নতুন করে প্রায় ১৪ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন প্রয়োজন। জিবুতিতে পৌঁছানো মানুষদের জন্যও অতিরিক্ত সহায়তা দরকার।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অনেক পরিবার খুব অল্প সময়ের নোটিশে সামান্য কিছু জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়েছে। আশ্রয়, খাবার, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও সুরক্ষা সবই এখন সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন। কারণ আশ্রয় দেয়া স্থানীয় জনগোষ্ঠী এবং বাস্তুচ্যুতদের জন্য নির্ধারিত স্থানগুলোতে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে। ইয়েমেনে নিবন্ধিত ৬৫ হাজারের বেশি শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীও এই লড়াইয়ের কারণে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তাদের বেশিরভাগই সোমালিয়া ও ইথিওপিয়া থেকে আসা। ইরানের মিত্র হুতিরা দ্রুত অগ্রসর হয়ে ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ নেয়ার পর এই বাস্তুচ্যুতি শুরু হয়। বাব আল-মানদেবের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী করতেই তারা এমন পদক্ষেপ নেয়।
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাব-আল মান্দেব এখন বিকল্প নৌপথ হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাস্তুচ্যুত নারী আয়েশা মুহাম্মদকে গত সপ্তাহে হুতিরা বন্দরনগরী মোচার কাছে তার গ্রাম দখল করে নেয়ার পর নিজের পাঁচ সন্তানকে সেখানে রেখে পালাতে হয়েছে। মুহাম্মদ বলেন, তাদের আটকে রাখা হয়েছে এবং গুলি করা হচ্ছে। তাই তারা নিজেদের বাড়ির ভেতরেই আটকা পড়ে আছে। তারা শুধু ভাত রান্না করছে, রুটি নেই, অন্য কিছুই নেই। আমার মেয়েরা আমাকে ফোন করে বলেছে, তারা আমাদের সঙ্গে যোগ দিতে চায়। কিন্তু পরিস্থিতি এত কঠিন হয়ে গেছে যে তা সম্ভব হচ্ছে না।

হোদেইদা থেকে বাস্তুচ্যুত হুসেইন হায়দারা জানান, পরিবার নিয়ে তাকে হঠাৎ করে পালাতে হয়েছে। তিনি বলেন, আপনি খুব কষ্টে আপনার সন্তানদের এবং একেবারে প্রয়োজনীয় সামান্য কিছু জিনিস সঙ্গে নিতে পারবেন। গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারদের গুলিতে আমরা আতঙ্কিত ছিলাম। সন্তান ও পরিবারের নিরাপত্তার ভয়ে যত দ্রুত সম্ভব পালিয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

ইউএনএইচসিআর জানিয়েছে, গত চার দিনে ২ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ বাব আল-মানদেব প্রণালি পাড়ি দিয়ে জিবুতিতে পৌঁছেছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের বেশিরভাগই নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ।

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।