সোভিয়েত আমলের যে হ্রদে এখনো ভেসে ওঠে মানুষের হাড়গোড়

কারো কাছে ইয়েমভার সাঁতারের হ্রদটি একটি ‘চমৎকার জায়গা’, রাজহাঁসে ভরা এক মনোরম জলাধার, গরমের দিনে ঠান্ডা পানিতে ডুব দেয়ার জন্য আদর্শ। আবার অন্যরা একে বলে কবরস্থান।

রাশিয়ার উত্তরাঞ্চলের কোমি প্রজাতন্ত্রে অবস্থিত এই কৃত্রিম সৈকতের একটি ছবির নিচে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এক মন্তব্যে বলা হয়েছে, ‘পুরো শহর জানে, সেখানে শুধু হাড়ের ওপর হাড় রয়েছে।’

দশকের পর দশক ধরে স্থানীয়রা এই হ্রদে সাঁতার কাটছেন। কিন্তু এটি তৈরি করা হয়েছিল এমন একটি স্থান খনন করে, যা একসময় সোভিয়েত গুলাগ ব্যবস্থার যারা শিকার হয়েছেন, তাদের গণকবর ছিল। গুলাগ ছিল জোরপূর্বক শ্রমশিবিরের একটি কুখ্যাত নেটওয়ার্ক।

স্থানীয় বাসিন্দারা নিয়মিত তীরে মানবদেহের হাড় খুঁজে পান। মৃতদের স্মরণে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ বা ফলক নেই, যা সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করতে পারত। কর্তৃপক্ষ কখনোই স্থানটিকে চিহ্নিত করেনি।

এমনকি সম্প্রতি ওই দেহাবশেষ নিয়ে কী করা উচিত তা নিয়ে বিতর্কের সময়ও তারা নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে যে হাড়গুলো গুলাগ বন্দিদের। খননের সময় একটি এক্সকাভেটর শুধু মাটিই নয়, মানুষের দেহাবশেষ এবং কফিনের কাঠের টুকরাও তুলে আনে।

তবু মস্কো থেকে এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি উত্তর-পূর্বে অবস্থিত ওই স্থানে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি। ভূগর্ভস্থ ঝরনার পানি গর্তে প্রবাহিত করা হয় এবং প্রায় ১৫ হাজার জনসংখ্যার ইয়েমভার বাসিন্দারা তখন থেকেই সেখানে সাঁতার কাটছেন।

তবে পাঁচ বছর আগে ওই এলাকায় একটি অগ্নিকাণ্ড এবং একদল গবেষকের আগমন হাড়গুলো নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়। কিছু স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, পুরো এলাকা আবার খুঁড়ে সব দেহাবশেষ পুনরায় সমাহিত করা উচিত। অন্যরা সেখানে একটি ক্রুশ স্থাপনের আহ্বান জানান।

আবার কেউ কেউ বলেন, এত হইচইয়ের প্রয়োজন নেই। গুলাগগুলো এতটা ভয়াবহ ছিল না এবং সেখানে ছিল শুধু অপরাধীরা। শেষ পর্যন্ত স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কিছুই করেনি।

এই নিষ্ক্রিয়তা রাশিয়ার একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন, যেখানে ওই সময়কার গণকবরগুলো সচরাচর চিহ্নিত করা হয় না।

যারা ভুক্তভোগীদের নিয়ে গবেষণা বা তাদের স্মরণ করার চেষ্টা করেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। আর গুলাগ ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা ক্রমশ নিষিদ্ধ বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

মস্কোর গুলাগ ইতিহাস জাদুঘরের হিসাব অনুযায়ী, (যা কর্তৃপক্ষ এ বছর বন্ধ করে দেয়), ১৯৩০ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে প্রায় দুই কোটি মানুষ সোভিয়েত শ্রমশিবির, দণ্ড উপনিবেশ ও কারাগারের মধ্য দিয়ে গেছে।

তাদের মধ্যে প্রায় ৪০ লাখকে রাজনৈতিক কারণে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। স্টালিনের আমলে এবং তার পরপরই পরিচালিত এই দমন-পীড়নের সময়ে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে দুই মিলিয়নের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।

আরো ৬০ লাখ মানুষকে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জোরপূর্বক পুনর্বাসনের শিকার হতে হয়। কোমি ভাষায় ‘বিশুদ্ধ পানি’ অর্থে ব্যবহৃত ইয়েমভা শহরের উৎপত্তি ১৯২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি শ্রমশিবির থেকে।

এলাকাটির বেশিভাগ বাসিন্দাই গুলাগ বন্দি অথবা প্রহরীদের বংশধর। পুরো কোমি অঞ্চলেই চিত্রটি প্রায় একই। এখনো ইয়েমভায় একটি সাজাপ্রাপ্ত পুরুষদের কলোনি চালু রয়েছে।

উত্তরের উপ-আর্কটিক চিরসবুজ বনাঞ্চলে ঘেরা শিবিরগুলোর জীবন ছিল নিষ্ঠুর। বন্দিদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসন ছিল না। এমনকি শীতকালে তাপমাত্রা যখন মাইনাস ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যেত, তখনও অনেককে মাটির গর্ত বা তাঁবুতে থাকতে হতো। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তারা বন কেটে রেলপথ নির্মাণ করত।

তাদের দৈনিক খাদ্য ছিল ৪০০ গ্রাম রুটি এবং এক বাটি স্যুপ। ইতিহাসবিদদের ধারণা অনুযায়ী, কোমির শিবিরগুলোর মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক উভয় ধরনের মিলিয়ে ১০ লাখের বেশি বন্দি গেছে। তবে সেখানে কতজনের মৃত্যু হয়েছে তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নেই।

২০২১ সালে নিকটবর্তী একটি ঘাসের আগুন নেভাতে গিয়ে দমকলকর্মীরা অন্তত তিনজন মানুষের হাড়গোড় খুঁজে পান। তখন স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।

তদন্তকারীরা নিশ্চিত হন যে দেহাবশেষগুলোর বয়স অন্তত ১৫ বছর এবং সেখানে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই। ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতির কারণে’ তারা কোনো মামলা শুরু করেনি।

তদন্তকারীদের সিদ্ধান্তে বলা হয়, যেখানে হাড় পাওয়া গেছে, সেটি ১৯৩০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে গুলাগ বন্দিদের একটি ‘অনানুষ্ঠানিক গণকবরস্থল’ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল।

বিষয়টি সেখানেই শেষ হয়ে যেত, যদি না ছয় মাস পরে গুলাগ ইতিহাস নিয়ে কাজ করা একদল গবেষক আঞ্চলিক রাজধানী সিক্তিভকার থেকে সেখানে যেতেন।

লেখক ও স্থানীয় ইতিহাসবিদ গ্রিগরি স্পিচাক বলেন, ‘আমরা খনির জায়গাটিতে গিয়েছিলাম এবং কিছু খুঁজতেও হয়নি, হাড় আমাদের সামনে প্রায় সাথে সাথেই দেখা দেয়।’

তখন গবেষক দলের আরেক সদস্য ইগর সাজিন বলেন, “আমরা পাঁজরের হাড় এবং শ্রোণিচক্রের হাড় পেয়েছি। এগুলোকে পশুর দেহাবশেষ বলে ভুল করার উপায় নেই। ‘এভাবে ফেলে রাখা নিছক অমানবিক। অতীতের এই ভয়াবহ স্মৃতিচিহ্নকে স্বীকার না করেই ইয়েমভা তার জীবনযাপন চালিয়ে যাচ্ছে।’

রুশ আইনে নবআবিষ্কৃত সমাধিস্থল, যার মধ্যে ‘গণদমন-পীড়নের শিকারদের কবর’ও রয়েছে, কর্তৃপক্ষকে নিবন্ধন ও চিহ্নিত করতে হয় এবং প্রয়োজন হলে দেহাবশেষ পুনরায় সমাহিত করতে হয়।

সাজিন সরকারি কৌঁসুলির সাথে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।প্রায় এক বছর পরে তিনি স্থানীয় প্রশাসন ও গির্জার কাছে অন্তত হ্রদের পাশে একটি ক্রুশ স্থাপনের অনুরোধ জানান।

কিন্তু প্রশাসন কৌঁসুলির দফতরকে জানায়, আঞ্চলিক কারা বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং একটি স্থানীয় ইতিহাস জাদুঘরের সাথে যোগাযোগ করার পরও তারা এটিকে গুলাগের কবরস্থান হিসেবে প্রমাণ পায়নি।

তবে অন্যরা এ বিষয়ে অনেক বেশি নিশ্চিত। গবেষক ওরেস্ট রোমাঙ্কো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, ‘এগুলো অবশ্যই গুলাগের ভুক্তভোগীদের দেহাবশেষ, কারণ তাদের পোশাক ও জুতা ছাড়া, কোদালের ফলার সমান গভীরতায় সমাহিত করা হয়েছিল।’

রাশিয়ায় গণদমন-পীড়নের ইতিহাস একটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিষয় এবং গণকবর শনাক্ত করার চেষ্টা করেছেন এমন ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।

পশ্চিম রাশিয়ার একটি গুলাগ ইতিহাস জাদুঘরের পরিচালক নিকোলাই আরাকচিয়েভকে অনুমতি ছাড়া একটি খুলি উত্তোলনের দায়ে জরিমানা করা হয়।

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।