শরীয়াহর দৃষ্টিতে সম্পত্তি হস্তান্তর বিলে যেসব সমস্যা

Written by

in

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’-এ এমন একটি বিধান রাখা হয়েছে, যার মাধ্যমে পিতা-মাতা বা পিতামহ-মাতামহ তাঁদের সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও দখল করার অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন। একই ধরনের বিধান নির্দিষ্ট অন্যান্য পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য করা হয়েছে।

আইনটির উদ্দেশ্য হিসেবে বয়স্ক পিতা-মাতার নিরাপত্তা ও সামাজিক বাস্তবতার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। এমনকি আইনমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই নতুন ব্যবস্থা প্রচলিত হেবা বা মুসলিম আইনের অন্যান্য সম্পত্তি হস্তান্তরকে প্রভাবিত করবে না; বরং এটিকে একটি স্বতন্ত্র আইনগত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।কিন্তু এখানে মৌলিক প্রশ্ন হলো—একটি সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তর করার পর একই সঙ্গে দাতা নিজের জন্য সেই সম্পত্তির জীবনকালীন ভোগদখলের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারবেন কি-না? ইসলামী আইনে এর অবস্থান কী?

এই প্রশ্নের উত্তর দিতে হলে প্রথমে ইসলামে মালিকানা হস্তান্তরের প্রকৃতি এবং বিশেষত হেবা (الهبة)-এর শরয়ী সংজ্ঞা ও বিধান বুঝতে হবে।

১. ইসলামে হেবার প্রকৃতি : ইসলামী ফিকহে হেবা বলতে বোঝায়

تَمْلِيكُ الْعَيْنِ فِي الْحَيَاةِ بِلَا عِوَضٍ

অর্থাৎ, জীবদ্দশায় কোনো বিনিময়মূল্য ছাড়াই কোনো সম্পদের মূল মালিকানা (عين) অন্যের কাছে হস্তান্তর করাকে হেবা বলা হয়। ফিকহি বিশ্বকোষেও হেবার মূল সংজ্ঞা হিসেবে ‘বিনা বিনিময়ে জীবদ্দশায় কোনো সম্পদের মালিকানা প্রদান’-কে উল্লেখ করা হয়েছে। (তাকমিলা: ৭/১৩, শামী: ৪/৫৩০, বাহরুর রায়েক: ৭/৩০৯)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, হেবার মাধ্যমে শুধু সম্পত্তির ব্যবহারাধিকার দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং কবজের মাধ্যমে সম্পত্তির মূল মালিকানা (رقبة) গ্রহীতার কাছে চলে যায়।

সুতরাং কেউ যদি বলে, ‘আমি এই বাড়িটি তোমাকে দিয়ে দিলাম; কিন্তু যতদিন আমি জীবিত থাকব, ততদিন এর মালিকানা, নিয়ন্ত্রণ ও পূর্ণ ভোগাধিকার আমার কাছেই থাকবে’—তাহলে প্রশ্ন দেখা দেবে, এখানে প্রকৃতপক্ষে হেবার মাধ্যমে সম্পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে কি না? উত্তর—না। তার মানে এই শর্তের কারণে হেবা সম্পন্ন হয়নি।

২. হেবা, হাদিয়া ও সদকার পার্থক্য:

হেবা, হাদিয়া ও সদকা—তিনটিই মূলত: বিনিময় ছাড়া সম্পদ প্রদানমূলক চুক্তি। ফিকহি দৃষ্টিকোণে হেবা একটি ব্যাপকতর পরিভাষা; হাদিয়া ও সদকা তার বিশেষ রূপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। কাউকে সম্মান ও সৌজন্যের উদ্দেশ্যে দেওয়া হলে তা হাদিয়া, আর আল্লাহর নৈকট্যে বা সাওয়াবের প্রত্যাশায় অভাবীকে দেওয়া হলে তা সদকা হিসেবে পরিচিত।

অতএব, ‘দান’, ‘গিফট’, ‘হাদিয়া’ ও ‘হেবা’—শব্দের পার্থক্য থাকলেও সম্পত্তির মালিকানা বিনা বিনিময়ে হস্তান্তরের ক্ষেত্রে এগুলোর মূল ফিকহি কাঠামো একই বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। (আল-মওসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ: ৪২/১২০)

Comments

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।