ইয়েমেনের ইরান–সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা সাম্প্রতিক দিনগুলোয় সৌদি আরবের দিকে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে। এসব মোকাবিলায় টালমাটাল অবস্থায় পড়েছে রিয়াদ। এর মধ্যেই শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র আর ড্রোন ধ্বংসে ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক ক্ষেপণাস্ত্রের সংকট দেখা দিয়েছে তাদের।
পরিস্থিতি সামাল দিতে আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের দ্বারস্থ হয়েছে সৌদি আরব সরকার। তাদের কাছে অতিপ্রয়োজনীয় সহায়তা চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত—এমন দুজন আঞ্চলিক কর্মকর্তা গতকাল বুধবার এ কথা জানান।
এই কর্মকর্তারা বলেন, সৌদি আরবের পক্ষ থেকে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের সঙ্গে সহায়তার বিষয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আরও স্পষ্ট করে বললে, ইরান–সমর্থিত হুতি ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র–ড্রোন ঠেকাতে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে রিয়াদ।
সৌদি আরবের প্রধান মিত্র ও অস্ত্র সরবরাহকারী যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধরত যুক্তরাষ্ট্র নিজেও এখন ক্ষেপণাস্ত্র–প্রতিরোধী অস্ত্রের সংকটে। ছয় মাসের বেশি সময় ধরে চলা টানা যুদ্ধের জেরে দেশটিতে এসব অস্ত্রের মজুত কমতির দিকে। এ কারণে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী না থেকে অন্যান্য দেশের কাছে সহায়তা চাইছে, বলেন সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা।
ওই দুই কর্মকর্তা নিজেদের নাম–পরিচয় প্রকাশ করার অনুমতি দেননি। বলেছেন, এ বিষয় নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার অনুমতি তাঁদের নেই। তাই তাঁরা পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাৎক্ষণিক সাড়া পাওয়া যায়নি।
সৌদির অভিযোগ, হুতিদের নাকচ
চলমান ইরান যুদ্ধের জেরে নতুন করে সংঘাতে জড়িয়েছে সৌদি আরব ও হুতিরা। এটা এখন ইরান যুদ্ধের নতুন একটি ফ্রন্ট। গতকাল সৌদি আরব অভিযোগ করে, পবিত্র নগরী মক্কার দিকে ড্রোন ছুড়েছে হুতিরা। এ ঘটনায় বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন নিন্দা জানিয়েছে। তবে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার কোনো লক্ষণ এ পর্যন্ত দেখা যায়নি।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)–এর জন্মস্থান মক্কা। পবিত্র কাবা এ নগরে অবস্থিত। মুসলিমদের কাছে পবিত্র নগরী হিসেবে স্বীকৃত মক্কা। প্রতি বছর পবিত্র হজ পালনের সময় বিশ্বের লাখো মুসল্লি এখানে জড়ো হন। এ পবিত্র নগরীর দিকেই হুতিদের ছোড়া ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে সৌদি আরব।
সৌদি আরব হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, পবিত্র নগরীতে হুতিদের এ ধরনের হামলার চেষ্টা ‘চূড়ান্ত সীমা’ লঙ্ঘন হিসেবে দেখা হবে। তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করা হবে না।
তবে ইয়েমেনের সীমান্ত থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ কিলোমিটার বা ৬৮০ মাইল দূরের পবিত্র নগরীটিতে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে হুতিরা।
এর মধ্যেই গতকাল ইয়েমেনের আকাশে সৌদি আরবের একটি এফ–১৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করার দাবি করেছে হুতিরা। ভূপাতিত যুদ্ধবিমানটির ধ্বংসাবশেষের ছবিও প্রকাশ করা হয়েছে।

সৌদি আরবের এফ–১৫ যুদ্ধবিমানের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন হুতি যোদ্ধারা। ইয়েমেনের মারিব প্রদেশ
মিত্রদের পাশে পেতে মরিয়া
জ্বালানি তেলের শীর্ষ রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। ধনী দেশটি এখন হুতিদের সবচেয়ে বড় নিশানা। দেশটির প্রধান আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ইরান হুতিদের পেছনে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু সামরিক সহায়তা নয়, নিরাপদ পথে জ্বালানি তেল রপ্তানির উপায় খোঁজাও সৌদি সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কোনোটিরই আপাত সহজ সমাধান দেখা যাচ্ছে ন
অতিসম্প্রতি সৌদি আরবে এক হামলায় কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্বালানি তেলের পাইপলাইন (ইস্ট–ওয়েস্ট পাইপলাইন) বন্ধ হয়ে গেছে। এর পেছনে ইরাকের ইরানপন্থী মিলিশিয়াদের কথা বলা হচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পাইপলাইনটি টানা কয়েক সপ্তাহ বন্ধ থাকতে পারে। এ ছাড়া হুতিরা সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও লোহিত সাগরে দেশটির জাহাজে হামলা করছে।
এদিকে লোহিত সাগরের বাব আল-মানদেব প্রণালির কয়েকটি দ্বীপ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে হুতিরা। প্রণালিটি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি তেল রপ্তানি কার্যত বন্ধ রয়েছে। সৌদি আরবের সামনে হরমুজের বিকল্প ছিল বাব আল–মানদেব। কিন্তু সেখানেও হুতিদের নিয়ন্ত্রণ নতুন সংকটের জন্ম দিয়েছে।
হরমুজের পর বাব আল–মানদেব দিয়ে জ্বালানি তেল রপ্তানিতে সংকটের বিষয়টি আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম চড়া করেছে। ইতিমধ্যে দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। জ্বালানি নিয়ে সংকটে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ বহু দেশ।
আঞ্চলিক এক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরব এখন ‘খুব কঠিন অবস্থায়’ পড়েছে। কারণ, দেশটিকে শুধু সামরিক ঘাঁটি কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা রক্ষা করলেই হচ্ছে না। দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা তেল স্থাপনাগুলোও নিরাপদ রাখতে হচ্ছে।
অন্য আরেক কর্মকর্তা বলেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপ নিতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক মিত্রদের পাশে টানার চেষ্টা করছে। তিনি জানান, ইয়েমেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে ওমান ও মিসর নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার ফেলো অ্যাডাম ব্যারন বলেন, এটা শুধু হুতি বনাম সৌদি আরবের ইস্যু নয়। আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের বৃহত্তর পথগুলো কীভাবে নিরাপদ রাখা যায়, সেটিও এখন মুখ্য বিষয়।
বিষয়টি সম্পর্কে জানাশোনা আছে—এমন দুই কর্মকর্তা বলেন, ওমানের মাসকাটে গত সপ্তাহান্তে হুতি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছেন মার্কিন কর্মকর্তারা। বৈঠকে একজন হুতি কর্মকর্তা নিজেও উপস্থিত ছিলেন। আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমনের কৌশল নিয়ে দুপক্ষ কথা বলেছে।
এর বাইরে বৈঠকটি সম্পর্কে আর বিস্তারিত জানা যায়নি। সংবাদমাধ্যমের সামনে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট সূত্রও নাম–পরিচয় গোপন রাখার অনুরোধ করেছে।
কূটনৈতিক সহায়তায় আগ্রহ
আঞ্চলিক ও পশ্চিমা মিত্রদের কাছে মরিয়া হয়ে সামরিক সহায়তা চাইছে সৌদি আরব। জানা গেছে, মিত্রদেশগুলো সামরিক সহায়তা দিতে খুব একটা আগ্রহী নয়; বরং তারা কূটনৈতিক সহায়তা দিতে আগ্রহী।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র টম ওয়েলস গত মঙ্গলবার বলেন, যুক্তরাজ্য ও সৌদি আরবের খুবই ‘ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব’ রয়েছে। তবে সৌদি আরব সামরিক সহায়তা চেয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি। সৌদি আরবের ভূখণ্ডে ব্রিটিশ সেনারা আছেন কি না, সেটি জানাতেও অস্বীকৃতি জানান ওয়েলস।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর কর্মকর্তারা ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র–প্রতিরোধী ব্যবস্থার তীব্র সংকটের কথা স্বীকার করেন। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে সহায়তা করার মতো সক্ষমতা ইউরোপের আছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে তুরস্কের একজন সরকারি কর্মকর্তা বলেন, উত্তেজনা কমানোর চেষ্টার অংশ হিসেবে দেশটি ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে আলোচনা করছে। তবে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। সংবাদমাধ্যমের সামনে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার অনুমতি না থাকায় তিনিও নাম–পরিচয় প্রকাশ করতে চাননি।
তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তুরস্ক ও পাকিস্তান মিলে সম্প্রতি সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে। ‘মক্কা চুক্তি’ নামে পরিচিত এ চুক্তির সামনে প্রথম চ্যালেঞ্জ হিসেবে এসেছে হুতিরা। তবে পাকিস্তান ও তুরস্কের কর্মকর্তারা এপিকে বলেন, হুতিকে প্রতিহত করতে তাদের কাছে সৌদি আরবের পক্ষ থেকে সরাসরি কোনো অনুরোধ আসেনি।
মক্কায় হামলাচেষ্টার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নিন্দা জানাতে গিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেন পাকিস্তান ও সৌদি আরব ‘অটলভাবে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে’ একসঙ্গে রয়েছে। অন্যদিকে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান সৌদি আরবের প্রতি সংহতি জানিয়ে তুর্কি রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আনাদোলুকে বলেন, এ ঘটনায় কোনো দেশই ‘নির্লিপ্ত থাকতে পারে না’।

অস্ত্র হাতে ইয়েমেনের হুতি যোদ্ধারা
সৌদি–হুতি বিবাদ থেকে দূরে যুক্তরাষ্ট্র
সৌদি আরবের কাছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সঙ্গে অন্য ধরনের সহায়তার প্রতিশ্রুতিও বেশ আগে থেকেই পেয়ে আসছে সৌদি সরকার। তবে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের কথায় বোঝা যাচ্ছে, ওয়াশিংটন এখন সৌদি–হুতি সংঘাতে সরাসরি জড়াতে আগ্রহী নন।
গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে ওয়াশিংটনের ‘নিয়মিত যোগাযোগ’ রয়েছে। অন্যদিকে হুতিদের সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্র ‘সরাসরি আলোচনা’ করেছে।
সৌদি আরব সামরিক হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড সৌদি বাহিনীকে গোয়েন্দা তথ্য আদান–প্রদান ও সামরিক পরিকল্পনায় সহায়তা বৃদ্ধির জন্য একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তা আরও বলেন, গত সপ্তাহে আটটি দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের নিয়ে বসেছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। জার্মানিতে ওই বৈঠক হয়। মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধি করার সুযোগ নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়েছে। তবে ওই বৈঠকে কোন কোন দেশ অংশ নেয়, তা জানাননি ওই মার্কিন কর্মকর্তা।
চীন সফরে আব্বাস আরাগচি
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধরত ইরান থেকে সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল কেনে চীন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি চীন সফরে গেছেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ইয়েমেন ও লোহিত সাগরে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ওয়াং ই।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, তেহরান এ অঞ্চলে শান্তি ফিরিয়ে আনতে চায়। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক চায়।
