সন্তানকে প্রহার করে শাসন, ইসলাম কী বলে?

যুগ পাল্টেছে। পৃথিবীতে এসেছে বিভিন্ন প্রজন্ম। একেক প্রজন্মের মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ও জীবনযাপনে এসেছে নানা পরিবর্তন। আর তাই একটি শিশু জন্মের পর বাবা-মাকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভাবিয়ে তোলে, তার অন্যতম হলো সন্তানের সঠিক লালন-পালন।

সন্তানকে বড় করতে বাবা-মা ও পরিবারের সদস্যরা নানা পন্থা অবলম্বন করেন। কখনো আদর, কখনো শাসন—দুইয়ের সমন্বয়েই সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনার চেষ্টা করেন তারা। তবে প্রজন্ম বদলালেও সন্তানকে শাসনের একটি পুরোনো পদ্ধতি এখনো সমাজে প্রচলিত—শারীরিক প্রহার। অনেকের ধারণা, সন্তানকে ‘একটু-আধটু মার’ না দিলে সে শাসনে আসবে না।

কিন্তু সন্তানকে মারধর করে কি সত্যিই সংশোধন করা যায়? ইসলাম এ বিষয়ে কী নির্দেশনা দিয়েছে? সন্তানকে প্রহার করা কি বৈধ? বৈধ হলেও এর সীমা কতটুকু?

ইসলামের মূল শিক্ষা হলো, সন্তানদের সঙ্গে কোমলতা, মমতা ও সুন্দর আচরণ করা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আপনি যদি রূঢ় ও কঠোর হৃদয়ের হতেন, তাহলে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৫৯)। আয়াতটি মূলত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি নির্দেশনা হলেও এর মধ্যে কোমল আচরণের গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রেও কোরআনের নির্দেশনায় দায়িত্বশীলতা ও নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের এবং তোমাদের পরিবারকে সেই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন মানুষ ও পাথর।’ (সুরা আত-তাহরিম, আয়াত ৬)। অর্থাৎ সন্তানকে শুধু শাস্তি দেওয়া নয়, বরং তাকে সঠিক শিক্ষা ও নৈতিকতার পথে গড়ে তোলাই অভিভাবকের দায়িত্ব।

নামাজের ক্ষেত্রে যে হাদিসটি বলা হয়

সন্তানকে শাসনের প্রসঙ্গে সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত করা হয় নামাজসংক্রান্ত একটি হাদিস। আবদুল্লাহ ইবন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং ১০ বছর বয়সে নামাজের ব্যাপারে তাদের শাসন করো; আর তাদের শয্যা পৃথক করে দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৯৫)। হাদিসটি হাসান-সহিহ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এই হাদিসকে সন্তানকে ইচ্ছামতো মারধরের সাধারণ অনুমতি হিসেবে নেওয়া যায় না। হাদিসটির বিষয় নির্দিষ্টভাবে নামাজের শিক্ষা ও অনুশীলন। একই সঙ্গে ইসলাম শাসনের ক্ষেত্রেও সীমালঙ্ঘন, ক্ষতি করা বা নির্যাতনকে সমর্থন করে না।

শারীরিক শাসনের ইসলামি সীমা

সন্তানকে শাসনের ক্ষেত্রে ইসলাম সীমালঙ্ঘন ও ক্ষতি করার অনুমতি দেয় না। বিশেষ করে নামাজের শিক্ষা দিতে ১০ বছর বয়সের পর শাসনের কথা হাদিসে এসেছে। তবে এ শাসন কোনোভাবেই নির্যাতন বা রাগের বশে মারধরের লাইসেন্স নয়। ইসলামি দৃষ্টিতে বিষয়টি কয়েকটি সীমার মধ্যে বোঝা যায়—

১.১০ বছর বয়সের প্রসঙ্গ: সন্তানকে সাত বছর বয়স থেকে নামাজের শিক্ষা ও অভ্যাস করানোর নির্দেশ রয়েছে। ১০ বছর বয়সে নামাজের ব্যাপারে শাসনের কথা হাদিসে এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে নামাজের নির্দেশ দাও এবং ১০ বছর বয়সে এ ব্যাপারে তাদের শাসন করো।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৪৯৫)

২. উদ্দেশ্য হতে হবে সংশোধন: শাসনের উদ্দেশ্য হতে হবে সন্তানের সংশোধন ও শিক্ষা দেওয়া, নিজের রাগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করা নয়। রাগের বশে সন্তানকে আঘাত করা শাসনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই অভিভাবকের উচিত আগে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধৈর্যের সঙ্গে সন্তানকে বোঝানোর চেষ্টা করা।

৩. মুখমণ্ডলে আঘাত করা যাবে না: ইসলামে মানুষের মুখমণ্ডলে আঘাত করতে নিষেধ করা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ যখন তার ভাইয়ের সঙ্গে লড়াই করে, সে যেন চেহারা এড়িয়ে চলে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১২)। ফলে সন্তানকে শাসনের ক্ষেত্রেও মুখে আঘাত করা থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

৪. ক্ষতি করা যাবে না: ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো—কাউকে ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির জবাবেও ক্ষতি করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতির মাধ্যমে ক্ষতি করা যাবে না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৩৪০)। তাই শাসনের নামে এমন কোনো আচরণ করা বৈধ নয়, যাতে সন্তানের শরীরে আঘাত, জখম বা গুরুতর শারীরিক কিংবা মানসিক ক্ষতি হয়।

৫. নবীজির আদর্শ ছিল কোমলতা: সন্তান ও শিশুদের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ ছিল স্নেহশীল ও কোমল। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কখনো নিজ হাতে কোনো নারী বা খাদেমকে আঘাত করেননি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৩২৮)। এ থেকে বোঝা যায়, সংশোধনের ক্ষেত্রেও কোমলতা ও উত্তম আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

৬. সহজ করা ইসলামের শিক্ষা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, বিমুখ করে দিয়ো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৯)। সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রেও এই নীতির গুরুত্ব রয়েছে। তাই শাসনের নামে ভয়, আতঙ্ক ও নির্যাতনের পরিবেশ তৈরি না করে ভালোবাসা, বোঝানো ও ধৈর্যের মাধ্যমে সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

সন্তানকে শাসন মানেই মারধর নয়

ইসলামে সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে আদর্শ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আচরণ গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রতি তাঁর মমতা, স্নেহ ও কোমল আচরণের বহু দৃষ্টান্ত হাদিসে পাওয়া যায়। ফলে সন্তানকে সংশোধনের নামে রাগের বশে মারধর করা বা তাকে অপমান করা ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষা ও নবীজির আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অভিভাবকের দায়িত্ব হলো সন্তানের ভুলের কারণ বোঝা, তাকে ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা এবং প্রয়োজন হলে উপযুক্ত শাসনের মাধ্যমে সংশোধনের চেষ্টা করা। শারীরিক আঘাত, ভয় দেখানো বা অপমানকে নিয়মিত শাসনের পদ্ধতি বানানো ইসলামের উদ্দেশ্য নয়।

সুতরাং সন্তানকে মানুষ করার ক্ষেত্রে শুধু শাসন নয়, ভালোবাসা, ধৈর্য, সুন্দর আচরণ ও নৈতিক শিক্ষা—এসবের ওপরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সন্তান যেন ভয় থেকে নয়, ভালোবাসা ও বোঝাপড়ার মাধ্যমে সঠিক পথ বেছে নেয়—ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ