জীবনের ব্যস্ততায় মানুষ প্রতিনিয়ত নানা ভুল করে। কখনো ইচ্ছায়, কখনো অনিচ্ছায়—কথায়, কাজে কিংবা চিন্তায় ভুল-ত্রুটি হয়ে যায়। কিন্তু ভুলের পর ফিরে আসার দরজাও খোলা রেখেছেন আল্লাহ। সেই ফিরে আসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো ইসতিগফার—আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা।
‘ইসতিগফার’ শব্দের অর্থ ক্ষমা চাওয়া। একজন বান্দা যখন আন্তরিকভাবে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলেন, তখন তিনি মূলত নিজের অসহায়ত্ব স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও দয়া প্রার্থনা করেন। ইসলামে এটি শুধু গুনাহ মাফের আমল নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তওবা এবং আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
কুরআনে ইসতিগফারের গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে ইসতিগফারের গুরুত্ব বিভিন্নভাবে তুলে ধরা হয়েছে। হজরত নূহ (আ.) তাঁর সম্প্রদায়কে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে আহ্বান করেছিলেন। সূরা নূহের ১০ থেকে ১২ নম্বর আয়াতে এসেছে—আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলে তিনি প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং বাগান ও নদী দান করবেন।
অন্যদিকে সূরা হুদের ৫২ নম্বর আয়াতেও ইসতিগফার ও তওবার সঙ্গে আল্লাহর রহমত এবং শক্তি বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, ইসতিগফার শুধু পরকালের ক্ষমার আবেদন নয়; বরং আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহ লাভের আশায় একজন মুমিনের নিয়মিত আমলও হতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও নিয়মিত ইসতিগফার করতেন
ইসতিগফারের গুরুত্ব বোঝার জন্য সবচেয়ে বড় উদাহরণ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন। সহিহ বুখারির হাদিসে হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিনি দিনে ৭০ বারের বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা ও তওবা করতেন।
সহিহ মুসলিমের আরেক হাদিসে এসেছে, তিনি মানুষকে আল্লাহর কাছে তওবা করতে বলেছেন এবং নিজে দিনে ১০০ বার তওবা করতেন বলে জানিয়েছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন নিষ্পাপ নবী; তারপরও তিনি নিয়মিত ইসতিগফার করতেন। তাই ইসতিগফারকে শুধু বড় কোনো গুনাহ করার পরের আমল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একজন মুমিনের প্রতিদিনের আত্মশুদ্ধির অংশ হতে পারে।
শুধু মুখে উচ্চারণ নয়, থাকতে হবে অনুতাপ
অনেকে মনে করেন, শুধু ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বললেই ইসতিগফার সম্পন্ন হয়ে যায়। মুখে ইসতিগফার বলা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ জিকির। তবে আন্তরিক তওবার সঙ্গে নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়া, গুনাহ থেকে ফিরে আসা এবং পুনরায় সেই কাজে না ফেরার চেষ্টা থাকা জরুরি।
অর্থাৎ কেউ অন্যের হক নষ্ট করে শুধু মুখে ইসতিগফার করলেন, কিন্তু সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেন না—তাহলে তওবার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না। আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি মানুষের অধিকার থাকলে তা আদায়ের চেষ্টাও করতে হবে।
ইসতিগফার অন্তরকে আল্লাহমুখী করে
মানুষের জীবনে দুশ্চিন্তা, ব্যর্থতা, অপরাধবোধ ও নানা ধরনের সংকট আসতে পারে। এসব সময়ে ইসতিগফার একজন মানুষকে নিজের ভুলের দিকে তাকানোর এবং আল্লাহর কাছে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
ইসতিগফার মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—ভুল হয়ে গেলেও আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। বরং নিজের ভুল স্বীকার করে তাঁর কাছে ফিরে যেতে হবে। এ কারণেই ইসতিগফার আত্মশুদ্ধির একটি শক্তিশালী মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত।
নামাজের পরও ইসতিগফার
রাসুলুল্লাহ (সা.) নামাজ শেষ করার পর তিনবার ইসতিগফার করতেন—এমন বর্ণনাও সহিহ মুসলিমে রয়েছে। সেখানে ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
এ থেকে বোঝা যায়, ইসতিগফারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ সময়ের অপেক্ষা করতে হয় না। নামাজের পর, ঘুমানোর আগে, কোনো ভুলের পর কিংবা অবসর সময়ে—যেকোনো সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া যায়।
সহজ আমল, গভীর তাৎপর্য
ইসতিগফারের সবচেয়ে সহজ বাক্য— ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’। অর্থ, ‘আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।’ অল্প কয়েক সেকেন্ডেই এই জিকির করা যায়। কিন্তু এর তাৎপর্য অনেক গভীর।
দিনের ব্যস্ততার মধ্যেও কেউ যদি নিজের ভুলের কথা স্মরণ করে আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান, তাহলে সেটি তার আত্মশুদ্ধির একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে। তবে ইসতিগফারের সঙ্গে ভালো কাজ, গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং তওবার চেষ্টাও থাকা প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, ইসতিগফার শুধু একটি বাক্য নয়; এটি আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি পথ। মানুষ যতবার নিজের ভুল বুঝতে পারে, ততবারই তার জন্য ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর একজন মুমিনের জীবনে এই ফিরে আসার অভ্যাসই তাকে আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্যের পথে এগিয়ে নিতে পারে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
