যুক্তরাষ্ট্রে ইতিহাস গড়লেন হিজাবী পাঁচ মুসলিম নারী

প্রতিবেদন:

·

, ,

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বেশ কিছু চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে হিজাব পরা চারজন অঙ্গরাজ্য সিনেটর এবং একজন কংগ্রেস সদস্যের বিজয় বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। দেশটির ইতিহাসে এই প্রথম এতসংখ্যক হিজাব পরিহিত নারী একসঙ্গে নির্বাচিত হয়ে আইনসভায় যাচ্ছেন।

মঙ্গলবারের এ নির্বাচনে এমন ফলাফলকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে তৈরি হওয়া প্রতিক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছে সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও হুমকি বেড়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম, রিপাবলিকান রাজনীতিক এবং অনলাইন ট্রলদের বিদ্রূপ ও অপমানের শিকার হয়েছেন এসব নারী। তাদের পোশাক ও ধর্মীয় পরিচয় নিয়েও নানা ধরনের আক্রমণ হয়েছে।

গত সপ্তাহে মুসলিম পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিল (এমপ্যাক) যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র ডানপন্থি ও ইসলামবিদ্বেষী উসকানিদাতাদের তৎপরতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। সংস্থাটির আশঙ্কা ছিল, এসব তৎপরতার কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি উঠতে পারে, যা মুসলিম আমেরিকানদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করতে পারে।

তবে ভোটারদের উপস্থিতির বিস্তারিত চিত্র এখনো পর্যালোচনাধীন। এর মধ্যেই তরুণ ও প্রকাশ্যে মুসলিম পরিচয় বহনকারী কয়েকজন নারী নির্বাচনে জয়ী হয়ে জনপ্রতিনিধি হয়েছেন। তাদের সবাই প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাট।

জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যে স্টেট সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন রুয়া রোমান। তুলনামূলক রক্ষণশীল এই অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় হিজাব পরা প্রথম মুসলিম নারী ছিলেন তিনি। এবার স্টেট সিনেটর নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন।

২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি পান রোমান। ওই সময় ফিলিস্তিনপন্থি ডেমোক্র্যাটরা দলীয় সম্মেলনে একজন ফিলিস্তিনি বক্তাকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কমিটি (ডিএনসি) ও প্রেসিডেন্ট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়।

জেরুজালেমে জন্ম নেওয়া দাদার নাতনি রোমানেরই ওই সম্মেলনে ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। এর আগেই তিনি দুই বছর ধরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।

নিউইয়র্কে প্রথম ফিলিস্তিনি-আমেরিকান আইনপ্রণেতা

নিউইয়র্কে আগামী জানুয়ারিতে স্টেট সিনেটে যোগ দিতে যাচ্ছেন আবের কাওয়াস। রোমানের মতো তিনিও একজন ফিলিস্তিনি অভিবাসী, যিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ী হয়েছেন।

চলতি বছরের শুরুর দিকে মিডল ইস্ট আইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কাওয়াস বলেছিলেন, নিজের নতুন শহরে সম্মিলিত উদ্যোগ ও নাগরিক অংশগ্রহণকে মানুষের মধ্যে বিভেদ দূর করার একটি পথ হিসেবে দেখেন তিনি।

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মুসলমানদের ওপর কঠোর নজরদারি ও দমন-পীড়ন শুরু হয়। নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন এলাকায় এফবিআইয়ের অভিযান, গ্রেপ্তার এবং মসজিদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নজরদারি বাড়ানো হয়। সে সময় কাওয়াসের বাবা ছিলেন বৈধ অভিবাসন নথিপত্রবিহীন। তাকে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থা (আইসিই)। প্রায় তিন বছর আটক রাখার পর তাকে জর্ডানে ফেরত পাঠানো হয়।

এদিকে দিনের আলোয় জনসমক্ষে আইসিইর সহিংস গ্রেপ্তার অভিযান যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের পেছনে এসব অভিযানও ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করছে মিডল ইস্ট আই। এই নির্বাচনি ফলাফলকে ‘ব্লু ওয়েভ’ বা ডেমোক্র্যাটদের নীল ঢেউ হিসেবে অভিহিত করা হচ্ছে।

ইলিনয়ে নাবিলা সৈয়দের জয়

ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে ২৭ বছর বয়সী স্টেট রিপ্রেজেন্টেটিভ নাবিলা সৈয়দ রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছ থেকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত ৫৭ শতাংশ ভোট পেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জয়ী হন তিনি।

ভারতীয় বংশোদ্ভূত এই মুসলিম নারী ২০২২ সালে অঙ্গরাজ্যের আইনসভার একটি শূন্য আসনে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এবার নির্বাচনে জয়ী হয়ে নিজের অবস্থান আরো সুসংহত করেছেন।

স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এবং সমতা প্রতিষ্ঠাকে নিজের কাজের প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে তুলে ধরেছেন তিনি।

সম্প্রতি তাকে সমর্থন জানিয়েছে বৃহত্তর শিকাগো এলাকায় প্রচারিত ১৫০ বছরের পুরোনো সংবাদপত্র ‘দ্য ডেইলি হেরাল্ড’ এবং প্রভাবশালী ‘শিকাগো ট্রিবিউন’।

রোমান ও কাওয়াসের মতো নাবিলাও ইসরাইলের সমালোচনা করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের নেতৃত্বাধীন হামলার পরদিন ইলিনয়ের কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করেন তিনি। ওই চিঠিতে ওয়াশিংটনের কাছে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়েছিল।

তবে সমালোচকেরা চিঠিটিকে হামাসের পক্ষে অবস্থান হিসেবে অভিহিত করেন।

চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘লাখ লাখ ফিলিস্তিনি যখন মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত, তখন আমরা শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারব না। সহিংসতার মূল কারণ—অর্থাৎ অসমতা—দূর করে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই।’

কানেকটিকাটে সিনেটর হচ্ছেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মরিয়ম খান

কানেকটিকাট অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি মরিয়ম খানও আগামী জানুয়ারিতে স্টেট সিনেটে যোগ দিতে যাচ্ছেন। ২০২২ সাল থেকে দায়িত্ব পালন করা এই ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন।

এর আগে আগস্টে অনুষ্ঠিত দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে প্রায় এক দশক ধরে দায়িত্ব পালন করা ডেমোক্র্যাট দলের এক প্রভাবশালী প্রার্থীকে হারিয়েছিলেন তিনি।

পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া মরিয়ম খান অঙ্গরাজ্যের আইনসভায় দায়িত্ব পালনকালে বিশেষ শিক্ষাবিষয়ক সিলেক্ট কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এ ছাড়া বিচার বিভাগীয় ও শিক্ষা কমিটিতেও কাজ করেছেন তিনি।

কানেকটিকাট স্টেট সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা বব ডাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে মরিয়ম খানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাকে সাবেক বিশেষ শিক্ষা শিক্ষক এবং শিশুদের অধিকার আদায়ে লড়াই করা একজন যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।

চলতি বছরের শুরুর দিকে নিজের ডেস্কে পাকিস্তানের পতাকা রাখায় রিপাবলিকানদের সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মরিয়ম খান। উল্লেখ্য, যুদ্ধ-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনায় যুদ্ধবিরতির পথ তৈরিতে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল।

এ বিষয়ে ‘দ্য কানেকটিকাট মিরর’কে মরিয়ম খান বলেন, ‘নিজের ঐতিহ্য ও ব্যক্তিগত গর্বের বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই আমি পাকিস্তানের পতাকাটি রেখেছিলাম। এটিকে অনুপযুক্ত বা অবিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে দেখার ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।’

তিনি আরো বলেন, ‘পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক অংশীদার। নিজের শিকড় ও পটভূমিকে স্বীকার করার অর্থ এই নয় যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি কিংবা কানেকটিকাটের মানুষের সেবা করার ক্ষেত্রে আমার অঙ্গীকার কমে গেছে।’