বিতর্কিত মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর দাফন নিয়ে কী ঘটেছিল

প্রতিবেদন:

·

, ,

ঘটনার পেছনে মূল ইন্ধন কার ছিল, লাশ বাড়িতে না নিয়ে কেন ইউএনও অফিস বা পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে উঠেছে প্রশ্ন। স্থানীয় বিএনপি নেতৃত্ব এবং মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্ম দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, মানিক পশারীর লাশ দাফন ও গার্ড অব অনার দেওয়াকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির দায় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের উপরে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

তাদের দাবি, গত শনিবার দুপুরে অ্যাম্বুলেন্সে লাশ নিয়ে আসার পর শহরের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের অবস্থান নিতে দেখা যায় এবং তারা দফায় দফায় লাশ দাফনে বাধা দেন। বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের সাবেক জেলা সভাপতি মাহবুবুল আলম নাঈম বাধা দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে এবং পাড়েরহাট বাজারে পিরোজপুর সোহরাওয়ার্দী সরকারি কলেজ ছাত্রশিবিরের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মুঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে দাফন না করার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল হয়।

অপরদিকে স্থানীয় জামায়াত নেতারা দাবি করেছেন, তারা জানাজা বা দাফনে কোনো বাধা সৃষ্টি করেননি। তারা সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মান গার্ড অব অনার দেওয়ার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়ার চেষ্টা এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর মরহুম নায়েবে আমির আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওপর জুলুমের প্রতিবাদ হিসেবে মিথ্যা সাক্ষীর গেজেটভুক্তি নিয়ে ফুঁসে উঠে সাধারণ জনতা।

সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, জনরোষ ও দাফনে বাধার নেপথ্য কারণ কী ছিল, পশারী আদৌ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন কী না এসব প্রশ্নের অনুসন্ধান করতেই বুধবার ভোরে পিরোজপুর প্রতিনিধিকে নিয়ে এ প্রতিবেদক পৌঁছান সদর উপজেলার শঙ্করপাশা ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামে। কথা হয় মানিক পশারীর পরিবারের সদস্য, স্বজন ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে। পাশাপাশি কথা হয় স্থানীয় সংসদ সদস্য, বীর মুক্তিযোদ্ধা, বিএনপি ও জামায়াত নেতা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও। তবে সংবেদনশীল এ ইস্যুর গভীরে যেতে প্রশাসনের অনেকেই পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন।

জানা গেছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়া মানিক পশারী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় তার মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং গত দুই মাস ধরে অসুস্থ থাকার পর ২৪ অক্টোবর সকালে সেখানেই মারা যান।

২০০৯ সালের ১১ আগস্ট পিরোজপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালতে মানিক পশারী আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। পরে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাঈদীর বিরুদ্ধে চলা মূল মামলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। সেখানে মানিক পশারী রাষ্ট্রপক্ষের ছয় নম্বর সাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন।

‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্তি নিয়ে বিতর্ক

মানিক পশারীর মুক্তিযোদ্ধা হওয়া ও গেজেটভুক্তি নিয়ে এলাকায় রয়েছে তীব্র বিতর্ক। পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের আহ্বায়ক আহমেদ শহীদুল হক গতকাল বুধবার আমার দেশকে জানান, তিনি ৪০ বছর আগের নির্বাচিত কমান্ডার থাকাকালে মানিকের নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না। ২০১৭ সালে তিনি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হন। আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলার বাদী হওয়ার আট বছর পর মানিককে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত করা হয়।

তবে ২০১৭ সালের তালিকার হালনাগাদের কার্যক্রম এখনো শেষ হয়নি উল্লেখ করে শহীদুল হক বলেন, বিষয়টি নিয়ে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল বর্তমানে একটি যাচাই-বাছাই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ কার্যক্রম সমাপ্তির পর যে নতুন গেজেট হবে, সেটা হবে চূড়ান্ত।

এখন জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল যাচাই-বাছাই করছে। এক্ষেত্রে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের কেউ বাদ পড়ে থাকলে তাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। আবার যদি কেউ ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা থাকে, সে বাদ যাবে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, প্রায় ৮৫ হাজার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা গেজেটভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজারকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের ভাতাও বন্ধ করা হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নথি যাচাই করে দেখা গেছে, ট্রাইব্যুনালের কাছে মানিক পশারী নিজেই স্বীকার করছেন তিনি মুক্তিযুদ্ধ করেননি। ২০১১ সালে দেওয়া জবানবন্দিতে তিনি জানান, সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করেননি; তবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছিলেন। পরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আউয়ালের (সাইদুর রহমান) দেওয়া একটি ডিও লেটারের (আধাসরকারিপত্র) মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে তার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেনের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, মানিক কোনো মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না; মূলত আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষী দেওয়ার প্রতিদান হিসেবেই তাকে জালিয়াতি করে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছিল।

গার্ড অব অনারে জনরোষ

২৪ অক্টোবর দুপুরে মানিক পশারীর লাশ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে আনা হলে স্থানীয় বিক্ষুব্ধ জনতা ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং এক অমুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদে গার্ড অব অনারে বাধা দেন।

মানিকের মেয়ে-জামাই ফারুক হোসেন জানান, সকাল ১০টায় মৃত্যুর পর দুপুর ১২টায় তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে গেলে গার্ড অব অনারের কথা বলে বিকাল ৫টা পর্যন্ত সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে বরফ বা চা-পাতা ছাড়াই লাশ রাখা হয় এবং স্থানীয় প্রশাসন দাফনের কোনো দায়িত্ব নেয়নি।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি এড়াতে পরে প্রশাসনের উদ্যোগে পুলিশি পাহারায় লাশ পিরোজপুর পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয় এবং নিরাপত্তার স্বার্থে সাংবাদিকদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। সেখানে বিকাল ৫টার দিকে গোপনীয়তার সঙ্গে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়।

নিজ গ্রামে দাফনে তীব্র বাধা

পুলিশ লাইনস থেকে লাশ শংকরপাশা ইউনিয়নের চিথলিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হলে বিক্ষুব্ধ জনতা ও স্থানীয়দের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটে। মানিকের মিথ্যা সাক্ষ্যের কারণে আল্লামা সাঈদীর ওপর জুলুম করা হয়েছিল এমন আবেগ ও ক্ষোভ থেকে স্থানীয় জনগণ তার জন্য খুঁড়ে রাখা কবর মাটি ও বাঁশ দিয়ে ভরাট করে দেয়।

পাড়েরহাট বাজারে সাবেক ছাত্রশিবির নেতা মঈনের নেতৃত্বে পিরোজপুরে মানিককে দাফন না করার দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।

রাতের আঁধারে দাফন সম্পন্ন ও গ্রামপুলিশের বয়ান

গ্রামপুলিশ মতিউর রহমান জানান, কবর খোঁড়ার সরঞ্জাম আনতে গিয়ে তিনি মানিক পশারীর বোনদের পান এবং তারা ও স্থানীয় দুই ব্যক্তি মিলে কবর খনন করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিও প্রসঙ্গে তিনি জানান, ওই সময় নারীরা মাটি সরাচ্ছিলেন মাত্র। পরে পুলিশ, গ্রামপুলিশ ও প্রশাসনের নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে শনিবার রাত ১টা থেকে ২টার মধ্যে চিথলিয়া গ্রামে নিজ বাড়িতে তার দাফন সম্পন্ন হয়। তবে জানাজায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের অংশ নেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি এবং নিজ এলাকায় তার জানাজাও হয়নি।

পরিবারের সদস্যদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান

ঘটনার সময় খুলনায় শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান করছিলেন জানিয়ে মানিকের বোন হেনা পশারী জানান, তার ভাই ওই মামলার বিষয়ে কখনো কিছু জানাননি। তবে আল্লামা সাঈদী সম্পর্কে তিনি স্থানীয় গণমাধ্যমে মন্তব্য করেন যে, মানুষ হিসেবে তিনি আল্লাহর ওলি ছিলেন। কিন্তু তিনি সে বক্তব্য অস্বীকার করেন। তবে তার আগের বক্তব্যের ভিডিওচিত্র সাংবিদিকের কাছে সংরক্ষিত আছে।

ভাগনে আজিজুল জানান, দাফনের জন্য দুপুর দেড়টার দিকে কবর তৈরি করে তারা খাবার খেতে গেলে তার বাবা ফোন করে জানান, লোকজন আসছে; ফলে ভয়ে তারা আর সেখানে যাননি।

শীর্ষ নেতাদের প্রতিক্রিয়া ও ইন্ধন প্রসঙ্গে বক্তব্য

আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে ও পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদী গতকাল বুধবার বলেন, মানিক পশারী ২০১১ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, তিনি যুদ্ধ করেননি। তাহলে তিনি কীভাবে মুক্তিযোদ্ধা হয়ে গেলেন? তৎকালীন জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির প্রভাবে তিনি ডিও লেটার নিয়ে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন এবং ১০ বছর ধরে জনগণের ট্যাক্সের টাকা নিয়েছেন।

তিনি আরো বলেন, একজন অমুক্তিযোদ্ধাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদেই সাধারণ জনতা ক্ষুব্ধ হয়ে রাস্তায় নেমেছিল। সেখানে জামায়াত নেতাকর্মীরা পরিস্থিতি শান্ত করতে এবং কোনো তৃতীয় পক্ষ যেন নাশকতা করতে না পারে, সেজন্য দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছেন। শেষ পর্যন্ত জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীরাই দাফনের কাজে প্রশাসনকে সহযোগিতা করেছেন।

জেলা জামায়াত সেক্রেটারি জহিরুল হক ও সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক দাবি করেন, তারা লাশ দাফনে কোনো বাধা দেননি। তাদের আপত্তি ছিল মানিক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা না হওয়ায় তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া নিয়ে। সেই আপত্তিকে কেন্দ্র করে দাফনে বাধা দেওয়ার অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে দাবি তাদের।

পিরোজপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম পুরো ঘটনাকে একটি রাজনৈতিক ও বিতর্কিত বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এটি বিরোধী দলের, বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কোনো গ্রুপের এক গভীর ষড়যন্ত্র হতে পারে। ষড়যন্ত্র করে লাশটি ইউএনও অফিস ও পুলিশ লাইনসে পাঠানো হয়েছিল। আমি চাই, সরকারি পর্যায়ে প্রশাসন তদন্ত করে দেখুক লাশ কীভাবে সদরে বা ইউএনওর কাছে এলো এবং এর পেছনে কাদের ইন্ধন ছিল।

থমথমে জনপদ

সরেজমিনে চিথলিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায় মানিকের বাড়ি এখন তালাবদ্ধ ও নির্জন। গ্রামপুলিশ মতিউর রহমান, প্রতিবেশী সাফিয়া বেগম এবং আরিফ জানান, এলাকার সার্বিক পরিবেশ থমথমে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে অজানা আতঙ্কে কথা বলতে চায় না কেউই।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, রাজনীতিবিদ ও সাধারণ জনগন বলছেন, পিরোজপুরের ঘটনাটি কেবল একটি দাফনকে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া সাময়িক উত্তেজনা নয়; বরং এটি ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা বানিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার অপচেষ্টা, রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং তার বিপরীতে তৈরি হওয়া দীর্ঘদিনের সামাজিক ও রাজনৈতিক জনক্ষোভের এক জটিল প্রতিফলন।

তদন্ত কমিটি গঠন জামায়াতের

মানিক পশারীর জানাজা ও দাফনে জামায়াতে ইসলামী নেতাকর্মীদের বাধা দেওয়ার অভিযোগ তদন্তে মঙ্গলবার দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে দলটি। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সদস্যরা হলেন জামায়াতের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন ও নূরুল ইসলাম বুলবুল।