ফিলিস্তিন ইস্যুতে অনড় আনোয়ার

ইসরাইলকে আর ‘সভ্য রাষ্ট্রসমাজের’ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যায় না বলে মন্তব্য করেছিলেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম। ফিলিস্তিনে ইসরাইলি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কঠোর পদক্ষেপের দাবিতে সাম্প্রতিক সময়েও একই অবস্থান ধরে রেখেছেন তিনি। অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা বন্ধ, ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ ঠেকানো, ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বন্ধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে আসছেন মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী।

২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত আরব ও ইসলামি দেশগুলোর বিশেষ সম্মেলনে আনোয়ার বলেছিলেন, ইসরাইল ‘সভ্য রাষ্ট্রসমাজের’ অংশ হিসেবে থাকার সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং জাতিসংঘে দেশটির সদস্যপদ স্থগিত বা প্রয়োজনে বহিষ্কারের মতো কঠোর ব্যবস্থা বিবেচনার আহ্বান জানান। মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বক্তব্যেও এসব কথা রয়েছে।

তবে ওই বক্তব্যের দুই বছর পরও ফিলিস্তিন ইস্যুতে আনোয়ারের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলোতে তিনি ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপকে আরো কার্যকর ও বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দিয়েছেন।

গত ২১ আগস্ট পশ্চিম তীরের ই১ এলাকায় ইসরাইলের নতুন বসতি নির্মাণের পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা করেন আনোয়ার। তিনি বলেন, পূর্ব জেরুজালেমের কাছের এই এলাকায় বসতি নির্মাণ হলে অধিকৃত পশ্চিম তীর কার্যত বিভক্ত হয়ে যাবে এবং একটি সংলগ্ন ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

আনোয়ার বলেন, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতিগুলো আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ হলেও ইসরাইল তা অব্যাহত রেখেছে। গাজায় চলমান ধ্বংসযজ্ঞ এবং পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মধ্যেই নতুন বসতি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ই১ প্রকল্পে কোনো আন্তর্জাতিক কোম্পানি অংশ নিলে মালয়েশিয়া বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

এরপর ১১ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি বসতির বিরুদ্ধে ১২টি পশ্চিমা দেশের ঘোষণাকে স্বাগত জানান মালয়েশীয় প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, শুধু বিবৃতি দিলেই হবে না; এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে।

ব্রিটেন, কানাডা ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ ইসরাইলি বসতি থেকে উৎপাদিত পণ্যের বাণিজ্য নিষিদ্ধ বা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়ায় আনোয়ার তা স্বাগত জানান। একই সঙ্গে তিনি পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি তাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কাজে লাগিয়ে ইসরাইলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তার মতে, বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি বন্ধ, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞের জন্য জবাবদিহি এবং মানবিক সহায়তা নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।

আনোয়ার একই বক্তব্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে শুধু নিন্দা ও বিবৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে ‘বাস্তব ও বাধ্যতামূলক’ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা, ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত এবং মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য এখন কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

সর্বশেষ গত ১৫ সেপ্টেম্বর মালদ্বীপ সফরের সময়ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে কঠোর অবস্থানের কথা জানান আনোয়ার। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জুর সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, গাজায় নৈতিকতা ও ন্যায়বিচারের সম্পূর্ণ পরিত্যাগ ঘটেছে। মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলা দেশগুলো গাজায় প্রতিদিনের হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞ সহ্য করছে। মালয়েশিয়া ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে তার সমর্থন অব্যাহত রাখবে।

একই দিন ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে পারে এমন কোনো পণ্য পরিবহনের জন্য মালয়েশিয়ার ভূখণ্ড ব্যবহার করতে না দেওয়ার অবস্থানও স্পষ্ট করেন আনোয়ার। তিনি বলেন, ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে বা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতে পারে—এমন কোনো চালানের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে মালয়েশিয়াকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

সন্দেহজনক কোনো চালান পাওয়া গেলে তা পরীক্ষা ও তদন্ত করা হবে এবং মালয়েশিয়ার আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ‘দৃঢ় পদক্ষেপ’ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে আনোয়ারের সাম্প্রতিক অবস্থান থেকে দেখা যায়, তার নীতিতে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক চাপের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। ইসরাইলি বসতির পণ্য বর্জন, বসতি নির্মাণে আন্তর্জাতিক কোম্পানির অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতায় সহায়তা করতে পারে এমন চালান ঠেকানোর কথা তিনি প্রকাশ্যে বলেছেন।

২০২৪ সালের রিয়াদ সম্মেলনে আনোয়ার যে আরও কঠোর অবস্থানের কথা বলেছিলেন, তার মধ্যে ছিল ইসরাইলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং জাতিসংঘে দেশটির সদস্যপদ স্থগিত বা বহিষ্কারের বিষয় বিবেচনা করা। সেই বক্তব্যের সঙ্গে ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো মিলিয়ে দেখলে তার অবস্থানের মূল বিষয়গুলোতে ধারাবাহিকতা স্পষ্ট।

অর্থাৎ, আনোয়ারের বর্তমান বার্তা হলো—ফিলিস্তিন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের শুধু নিন্দা জানানো যথেষ্ট নয়; ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ, ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি এবং গাজায় মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক সক্ষমতায় সহায়তা করতে পারে এমন সরবরাহ ও পরিবহন বন্ধ করতেও দেশগুলোকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ফিলিস্তিনিদের জন্য একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও কার্যকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান অব্যাহত রাখার কথাও বলেছেন। তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে আন্তর্জাতিক আইন ও ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে ভিত্তি করে এই অবস্থান তুলে ধরা হয়েছে।

ফলে ২০২৪ সালে ইসরাইলকে ‘সভ্য রাষ্ট্রসমাজের’ অংশ না বলার যে কঠোর মন্তব্য করেছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম, ২০২৬ সালের বক্তব্যগুলোতে তারই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে—তবে এবার তিনি কথার পাশাপাশি বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা, বসতি নির্মাণে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং ইসরাইলমুখী সামরিক সরঞ্জাম পরিবহন বন্ধের মতো নির্দিষ্ট পদক্ষেপের ওপর জোর দিচ্ছেন।