ইরাকে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের মিশন শেষ

সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে এক দশকেরও বেশি সময় আগে ইরাকে মোতায়েন করা মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) তাদের মিশন শেষ করেছে। দেশটির নেতারা এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে এ নিয়ে ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

২০১৪ সালে তথাকথিত উগ্রবাদী গোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস)-এর বিরুদ্ধে লড়াই করার অজুহাতে ইরাক ও সিরিয়ায় জোটের সেনা মোতায়েন করা হয়।

২০১৭ সালে ইরাকে এবং ২০১৯ সালে সিরিয়ায় আইএস পরাজিত হয়। তবে গোষ্ঠীটির অবশিষ্ট সদস্যদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে জোটের সেনারা সেখানে থেকে যান।

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরাক মিশনটি ধীরে ধীরে বন্ধ করার বিষয়ে একমত হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে পর্যায়ক্রমে সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। একপর্যায়ে তাদের উপস্থিতি স্বায়ত্তশাসিত উত্তরাঞ্চলীয় কুর্দিস্তান অঞ্চলে সীমিত হয়ে পড়ে।

ইসলামিক স্টেটকে বোঝাতে ট্রাম্প এক পোস্টে বলেন, ‘এই দিনটি যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়, ইরাকের বিজয় এবং আইএসের বিরুদ্ধে একটি সুস্পষ্ট বিজয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার সামনে সেখানে থেকে যাওয়া অথবা সেখান থেকে চলে যাওয়ার মধ্যে একটি বেছে নেয়ার সুযোগ ছিল। আর কোনো প্রশ্ন ছাড়াই আমার মনে হয়েছে, আমেরিকার ঘরে ফেরার সময় হয়েছে।’

‘সার্বভৌমত্ব’
মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট একাই আইএসকে পরাজিত করেনি। কুর্দি পেশমার্গা যোদ্ধারাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ইরানের ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীগুলোসহ ইরাকের শক্তিশালী কয়েকটি গোষ্ঠীও এতে ভূমিকা রাখে। এসব গোষ্ঠীর কয়েকটি এখনো অস্ত্র সমর্পণ করেনি।

ইরাক সরকার মনে করে, জোটের সেনা প্রত্যাহার হলে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলো অস্ত্রভাণ্ডার ধরে রাখার যে অজুহাত ব্যবহার করে আসছে, তা আর থাকবে না।

তবে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো আরো শক্তিশালী হতে পারে এবং দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র সেনা প্রত্যাহার সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এসব গোষ্ঠীর সমর্থকেরা পতাকায় সাজানো একটি জনসমাগমস্থলে জড়ো হয়ে উদযাপন করেন। সেখানে মডেল ড্রোন দিয়ে সাজানো মঞ্চ থেকে বক্তৃতা দেয়া হয়।

অনুষ্ঠানে কাতায়েব হিজবুল্লাহর সামরিক মুখপাত্র জাফর আল-হুসেইনি বলেন, গোষ্ঠীগুলো তাদের অস্ত্র ‘নিয়ন্ত্রণে আনার’ বিষয়ে আলোচনা চালিয়ে আসছে। তবে ‘ইরাক সরকারের কাছ থেকে এখনো কোনো জবাব পাওয়া যায়নি’।

তিনি আরো বলেন, এ কারণে অস্ত্র সমর্পণের বিষয়ে তারা ‘কোনো সময়সীমা বা চুক্তির আওতাভুক্ত নয়’। ইরাকের ‘সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনকারী যেকোনো মার্কিন বা ইসরাইলি কর্মকাণ্ডের সরাসরি জবাব দেয়ার অধিকার’ তাদের রয়েছে।

ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি বলেন, ‘নতুন একটি পর্যায় শুরু হয়েছে। এ পর্যায় ইরাকের সার্বভৌমত্ব, প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তি এবং দেশের বাহিনীগুলোর প্রস্তুতি দ্বারা নির্ধারিত হবে।’

হামলা বেড়েছে
যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে চলতি বছর ক্ষমতায় আসা জাইদি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র হস্তান্তরে বাধ্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তার সরকার গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র সমর্পণের জন্য ৩০ সেপ্টেম্বর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। তবে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে আনার বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকায় পরে সেই সময়সীমা প্রত্যাহার করা হয়।

কুর্দি সামরিক কমান্ডার সিরওয়ান বারজানি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘কুর্দিস্তানের আকাশ সুরক্ষার জন্য আমাদের কোনো ব্যবস্থা নেই।’

তবে তিনি বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, পেশমার্গা বাহিনী যেকোনো হুমকি মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছে।

জোটের দেয়া প্রশিক্ষণ, সহায়তা ও অস্ত্রের কারণে তাদের সক্ষমতা ‘উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে’ বলেও তিনি জানান।

কুর্দি নেতা মাসুদ বারজানিও বুধবার বলেন, ‘যেকোনো ধরনের হুমকি মোকাবেলায় ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে অত্যন্ত ভালো সমন্বয় রয়েছে।’

ইরান-সমর্থিত কয়েকটি গোষ্ঠী অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি জানানোয় জ্যেষ্ঠ রাজনীতিকেরা এখন একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

গোষ্ঠীগুলো যেসব শর্ত দিয়েছে, তার মধ্যে শুধু বিদেশী সেনা প্রত্যাহার নয়, মার্কিন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের দাবিও রয়েছে।

কাতায়েব হিজবুল্লাহ বলেছে, ‘দখলদার বাহিনীর’ প্রত্যাহার ‘পূর্ণ সার্বভৌমত্ব অর্জনের পথে একটি সূচনা’। তবে গোষ্ঠীটি জাইদি সরকারকেও হুমকি দিয়েছে।

তারা বলেছে, ‘যে সরকার জনগণের কল্যাণে কাজ করবে না, তাকে সম্ভাব্য সব উপায়ে ক্ষমতাচ্যুত করা হবে।’

ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তারা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্রও পাল্টা হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় কয়েক বছর ধরে গোষ্ঠীগুলোর বেশ কয়েকজন কমান্ডার নিহত হয়েছেন।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সময় তেহরান ও তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো ইরাকে হামলা আরো জোরদার করে। তারা কুর্দিস্তান অঞ্চলে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের সেনাদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়।