সাড়ে তিন মাসের মাথায় কঠিন সংকটে সরকার

ঢাকার জাতীয় সংসদ ভবন

প্রতিবেদন:

·

, , ,

নবগঠিত বিএনপি সরকারের বয়স মাত্র সাড়ে তিন মাস অতিক্রম করলো। এরই মধ্যে সংকটের মুখোমুখি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজের সরকারের নাজুক পরিস্থিতির কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন ইতিমধ্যে। তিনি বলেছেন- সামনে কঠিন সময়, হেসেখেলে দিন কাটালে দেশ ক্ষতিগ্রস্থ হবে। তবে তিনি যা কিছুটা আভাস দিয়েছেন প্রকৃত পরিস্থিতি কিন্তু এরচেয়েও অনেক গুরুতর। শীর্ষনিউজ ও শীর্ষকাগজের নিজস্ব অনুসন্ধানে এমন তথ্যই বেরিয়ে আসছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সামনে কঠিন সংকট।’ কিন্তু প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, সংকট ইতিমধ্যেই এসে পড়েছে। সরকারের ভেতরে-বাইরে নানামুখী সংকট শুরু হয়ে গেছে। শেখ হাসিনা একনাগাড়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় বহাল থাকার দীর্ঘ ১৫ বছরের মাথায় যতটা সংকটে পড়েছিলেন বর্তমান বিএনপি সরকার মাত্র সাড়ে তিন মাসের মাথায় তারচেয়েও অন্ততঃ তিনগুণ বেশি সংকটে পড়েছে বা পড়ছে। হাসিনার ওই সংকটটা ছিল একমুখী- শুধুমাত্র ভূ-রাজনীতিগত। আর বর্তমান সময়ে বিএনপি সরকারের সংকট বহুমুখী। এরমধ্যে ভূ-রাজনীতির ভয়াবহ সংকটও বিদ্যমান। তাছাড়া অর্থসংকট তো রয়েছেই। পাশাপাশি অনেক ভুল পদক্ষেপ, দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড সরকারকে ভাবমূর্তি সংকটের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

রাজনৈতিক বিরোধীপক্ষ এমনকি সাধারণ সমালোচনার মানুষের কথা বাদ দিলেও, সরকারের নিজস্ব লোকজনের মুখেই অভ্যন্তরীণ চরম সমালোচনা, ক্ষোভ-অসন্তোষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিগত সময়ে দীর্ঘ ফ্যাসিস্ট আমলে যারা জেল-জুলুম, চরম নির্যাতন-নিপীড়নের মুখেও মাটি কামড়ে পড়েছিলেন ভালো কিছু দেখার আশায়- এইসব ত্যাগী নেতা-কর্মী এবং সমর্থকরাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ক্ষুব্ধ-অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছেন। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের নানারকমের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড এবং সরকারের একের পর এক ‘ভুল’ পদক্ষেপ এইসব নেতা-কর্মী, সমর্থককে ক্ষুব্ধ করে তুলছে। ‘ভুল’ পদক্ষেপগুলোকে ‘ভয়াবহ আত্মঘাতী’ বলেও অনেকে উল্লেখ করছেন। এসবের বিবরণ পরবর্তীতে আলাদা প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে। সংকটের ‘ধরন’ এবং ‘মাত্রা’ এ প্রতিবেদনে আলোকপাত করা হচ্ছে।

ভূ-রাজনীতির সংকট

বিএনপি সরকারের সামনে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় সংকটটা ভূ-রাজনীতি নিয়ে। যা তিন মাসের সরকারের সময়ে মোটেই আশা করা হয়নি। আদতে বর্তমান বিএনপি ক্ষমতায় এসেছেই কঠিন এক সংকটকে বোঝা হিসেবে নিয়ে। আওয়ামী লীগকে ১৫ বছরেও যা ভুগতে হয়নি। আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তিন টার্ম পূর্ণ করেছে কোনো রকমের ভূ-রাজনীতিগত সংকট ছাড়াই। বাংলাদেশে ভূ-রাজনীতির প্রভাব রয়েছে ভারত এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই। চীনের প্রভাব তেমন একটা নেই। শুধুমাত্র অর্থনীতির ক্ষেত্রেই তারা সীমাবদ্ধ। আওয়ামী লীগের তিন টার্মের প্রায় পুরোটা সময় ভারতের ইচ্ছেকেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিরোধীপক্ষের দফায় দফায় কঠোর আন্দোলনেও হাসিনা সরকারের কিছুই হয়নি, যদিও হাসিনার জনপ্রিয়তায় ধস নেমেছিল অনেক আগেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য চায়, এটা সবারই জানা কথা। এক সময় তাদের চাহিদা ছিল সেন্ট মার্টিন দ্বীপ। পরবর্তীতে ক্রমান্বয়ে তা পরিবর্তিত হয় সামরিক চুক্তি- অকাস এবং জিসোমিয়া-য়। এই দু’টি সামরিক চুক্তির খসড়াও শেখ হাসিনার আমলে শেষের দিকে আদান-প্রদান হয়েছিল। কিন্তু ভারত কোনো ক্রমেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ ধরনের চুক্তি করতে দেবে না, তাই শেখ হাসিনা পারেননি চুক্তি চূড়ান্ত করতে।

ভারত জানে, আমেরিকার পরিকল্পনায় যা আছে সেটি ভারতের জন্য মহাবিপর্যয়কর। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে ঢুকতে পারলে ভারতের অখন্ডতাকে তছনছ করে দেবে। আর জানে বলেই নানা কৌশলে এতদিন যুক্তরাষ্ট্রের এ অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি ঠেকিয়ে রেখেছে। বার্মা অ্যাক্ট করেছিল যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে সামরিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্যই। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের সঙ্গে শুরু থেকেই ভারতের সম্পর্ক ‘সাপে নেউলে’ ছিল। এর কারণ, ড. ইউনূস আমেরিকার লোক। ভারত চাচ্ছিল, বাংলাদেশে বিকল্প অন্য কোনো সরকার আসুক। তাই বাংলাদেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং বিএনপির ক্ষমতায় আসাকে সমর্থন দিয়েছে তারা।

শুরুতে এটা ধরে নেওয়া হয়েছিল যে, আওয়ামী লীগের মতোই বিএনপিও পুরোপুরি ভারত প্রভাবিত সরকার হিসেবে চলবে। প্রথম আড়াই মাস অনেকটা সেভাবেই চলছিল। কিন্তু তারপর থেকেই ভিন্ন পথে চলতে শুরু করে বিএনপি সরকার। গত ৭ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডক্টর খলিলুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির দিল্লী সফরে যান। সফরের শুরুটা আন্তরিকতাপূর্ণ হলেও শেষটা ভালো হয়নি। যে কোনো কারণেই হোক সফরটা তিক্ততার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। হয়তো এমনটা হবে, আগে থেকেই জানা ছিল বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান যে একান্তভাবেই আমেরিকার লোক, এটা কারো অজানা নয়। ভারত সফরের পর পরই ভিন্ন দিকে হাঁটতে শুরু করে সরকার। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। এটা আসলে যুক্তরাষ্ট্রেরই কেরামতি! চীন ইতিপূর্বে বরাবরই এ অঞ্চলে মার্কিন আধিপত্যবিরোধী ছিল। কিন্তু এ মুহূর্তে চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন বিশেষ সমঝোতা গড়ে উঠেছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো দাবি করছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে বর্তমান বিএনপি সরকারের সম্প্রতি চোরাচালান, মাদক এবং কৌশলগত তথ্য বিনিময়ের একটি চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। যদিও পাকিস্তানের সঙ্গে বিএনপি সরকারের কোনো রকমের চুক্তি ভারতের জন্য একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। অন্যদিকে একই সময়ে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে একের পর এক প্রতিনিধিদল চীন সফরে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও চীন সফরে যাচ্ছেন খুব শিগগিরই। তারিখ এখনো সরকারিভাবে ঘোষণা হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম এখনই আগাম চীন যাওয়ার কথা রয়েছে। ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এরপর ২৩ জুন কুয়ালালামপুর থেকে বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে তার। এমন পরিকল্পনা নিয়ে ঢাকায় প্রস্তুতি চলছে। এদিকে পদ্মা ব্যারেজ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথেও অত্যন্ত দ্রুতগতিতে আগাচ্ছে বিএনপি সরকার। এমনকি মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বহুল আলোচিত ‘অকাস’ এবং ‘জিসোমিয়া’ চুক্তিও একই সঙ্গে ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে বলে চাউর হয়েছে। এই ইস্যুগুলোর প্রত্যেকটিই ভারতের জন্য ‘স্পর্শকাতর’ এবং মহাচিন্তার বিষয়। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে বিএনপি সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

সরকারের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং এর ভবিষ্যৎ

গত সপ্তায় বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি হয়েছে। ঘটনাটি ছোট হলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে এর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। তাই গণমাধ্যম এবং সরকারের তরফ থেকেও এটিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয়েছে। এটিকে ষড়যন্ত্রের ‘সংকেত’ হিসেবে মনে করা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সরকার যতটা জনপ্রিয়তা বা জনসমর্থন ধরে রাখতে পারবে ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার সম্ভাবনা ততই কম থাকবে। কিন্তু আদতে জনপ্রিয়তা ক্ষুণ্ন হচ্ছে কিনা, এ ব্যাপারে সরকার কী তেমন একটা সতর্ক?

সরকারের লোকজন নিজেদের মধ্যে পাওয়া-না পাওয়া এবং পারস্পরিক বৈষম্যের অভিযোগ তুলছেন ব্যাপকভাবে। যার যেটা পাওয়ার কথা নয়, তিনি তারচেয়ে বেশি কিছু পাচ্ছেন। আবার অন্যরা ক্রমাগত বঞ্চিত হচ্ছেন। এ নিয়ে সরকারের ভেতরকার লোকজনের রেষারেষি বাড়ছে প্রবলভাবে। সরকারের অনেক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারেই ‘কেন’ প্রশ্নের জবাব নেই। দীর্ঘ দুই দশক পর বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে। জিয়াউর রহমানের আমলের কথা বাদ দিলেও বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এই বিএনপি দুই দফায় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। তারেক রহমান বিদেশে থাকলেও বিএনপির রাজনীতি, দেশের সরকার পরিস্থিতি এমনকি সরকারের প্রতিটি খাত নিয়েও কাজ করেছেন বলে দেখা গেছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মানুষ আশা করেছিল আরও দক্ষ ও সুশৃঙ্খলভাবে সরকারের কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এখন যেভাবে সরকার চলছে এতটা অগোছালো কেউই মেনে নিতে পারছেন না। কোনো কিছুর ওপরই সরকারের নিয়ন্ত্রণ আছে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতারও অনেক অভাব আছে বলে অভিযোগ উঠছে, যদিও এটিই বেশি মাত্রায় চাইছে মানুষ। প্রকাশ্য ঘুষ-দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠার পরও সরকারের তরফ থেকে এ ব্যাপারে কোনোই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। আর এসব কারণে সমালোচনার মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে।

অভিযোগ উঠেছে, অনেক বিষয়েই উল্টো পথে হাঁটছে সরকার। ভোটের কালি মোছার আগে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা বলা হচ্ছে বার বার। এ ব্যাপারে খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড প্রভৃতি কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষের চাহিদা কি, মানুষ কোনটি কীভাবে দেখতে চাইছে, কোন কাজটি আগে চাইছে- সেদিকে নজর না দিয়ে নিজের মতো করে কাজ করে যাচ্ছে সরকার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এমন অবস্থা চলতে থাকলে অতি দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাবে বিএনপি সরকার। তাতে এক পর্যায়ে অস্তিত্ব সংকটও দেখা দিতে পারে। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে একটি জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে। বিপ্লবের যে স্পিরিট তা এখনো রয়ে গেছে, এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। বিপ্লবের পর ‘প্রতিবিপ্লব’ একটা প্রচলিত শব্দ। এবং এটা সবারই জানা কথা। একদিকে সাধারণ মানুষের অসন্তুষ্টি, অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরের ক্ষুব্ধতা- এগুলো সরকারের জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে। সাধারণ মানুষের অসন্তোষ ও সমালোচনার মাত্রা বাড়তে থাকলে ‘প্রতিবিপ্লবের ষড়যন্ত্র’ গাঢ় হয়ে উঠবে নিঃসন্দেহেই। দলের ভেতরের অসন্তোষ-ক্ষুব্ধতা সেই ষড়যন্ত্রকে ঠেকাবে না, বরং জায়গা করে দেবে। তাই সময় থাকতে এখনই এসব ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত, বলছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

সূত্র: শীর্ষনিউজ

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ