বিডি গ্লোবাল ডেস্ক,
একবেলা রান্না করে খেতে হয় তিন বেলা। সকালে ভাত জুটলেও রাতে খেতে হয় পান্তা। কখনো আবার অনাহারেই কাটে দিন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া শরীর, তার ওপর অসুস্থতা। নেই চিকিৎসার টাকা, নেই নিয়মিত খাবারের নিশ্চয়তা। জীবনের শেষ সময়ে এসে অভাব-অনটনে দিন কাটছে গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়নের গাছাবাড়ী গ্রামের নিঃসন্তান দম্পতি নুরজাহান বেগম (৪৯) ও হাবিজার রহমানের (৫৩)। এ যেন রসুলপুরের সেই রহিম উদ্দীনের বাড়ীতে অসহায় দম্পতি আসমানি ।
একসময় কৃষিশ্রমিকের আয়ে কোনোরকমে চলত সংসার। কিন্তু অসুস্থতার কারণে এখন বন্ধ উপার্জনের পথ। প্রতিবেশীদের সামান্য সহযোগিতায় কোনো রকমে বেঁচে আছেন তারা। শেষ বয়সে একটু ভালোভাবে বেঁচে থাকার আকুতি নিয়ে সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চেয়েছেন এ দম্পতি।
সরেজমিনে দেখা যায়, বাড়ির উঠানে বসে রান্না করছেন নুরজাহান বেগম। এই রান্না দিয়েই চালাতে হবে সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার। অভাবের সংসারে প্রতিদিন রান্না করার সামর্থ্য নেই তাদের। একবার রান্না করে তিন বেলা খেতে হয়। খাবার জুটলে খাওয়া হয়, না জুটলে থাকতে হয় অনাহারে। সংসারে নেই কোনো সন্তান। অসুস্থতার কারণে স্বামী-স্ত্রী দুজনই এখন অসহায়। একদিকে খাবারের সঙ্কট, অন্যদিকে চিকিৎসার অভাব সব মিলিয়ে মানবেতর জীবন কাটছে তাদের।
স্থানীয় অনেকেই জানায়, হাবিজার রহমান একসময় কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু অসুস্থতার কারণে এখন আর আগের মতো কাজ করতে পারেন না। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে উপার্জনের পথ। অন্যদিকে পায়ে আঘাত পাওয়ায় নুরজাহানের স্বাভাবিক চলাফেরা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। চিকিৎসা ও ওষুধ কেনার টাকা না থাকায় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না তিনি। প্রতিবেশীদের কেউ সহযোগিতা করলে ওষুধ কেনা হয়, অন্যথায় বিনা চিকিৎসায় থাকতে হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে নুরজাহান বেগম বলেন, ‘গতকাল সকালে ভাত রান্না করেছিলাম। কিছু ভাত রাতে খেয়েছি। একবার রান্না করে তিন বেলা খেতে হয়। অনেক সময় না খেয়েও থাকতে হয়। আমাদের দেখার মতো কেউ নেই। ছেলে-মেয়ে নেই। শেষ বয়সে এসে অনাহারে মরতে হচ্ছে। আপনারা একটু আমাদের দিকে তাকান।’
হাবিজার রহমান বলেন, ‘স্ত্রী অসুস্থ, ওষুধ কেনার টাকা নেই। এক বেলা খেলে আরেক বেলা উপোস থাকতে হয়। আমাদের দেখার মতো কেউ নেই। পাশের বাড়ির সাহাবুল মাঝে মাঝে ওষুধ কেনার টাকা দেন। তারও সংসার আছে। আপনারা যদি আমাদের পাশে দাঁড়াতেন, তাহলে দুমুঠো খেয়ে বেঁচে থাকতে পারতাম।’
গাছাবাড়ী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য ফরমান আলী বলেন, ‘নুরজাহান ও হাবিজার অনেক কষ্টে দিন কাটান। আমরা মাঝে মাঝে সহযোগিতা করি। স্থানীয় ব্যবসায়ী সাহাবুলও তাদের কিছু আর্থিক সহায়তা দেন। এভাবেই কোনো রকমে বেঁচে আছেন তারা। বিত্তবানরা পাশে না দাঁড়ালে তাদের কষ্টের অবসান হবে না।’
স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স ব্যবসায়ী সাহাবুল ইসলাম বলেন, ‘তারা না খেয়ে আছেন শুনলে আমরা চুপ করে থাকতে পারি না। যখন যা পারি, খাবার বা প্রয়োজনীয় জিনিস দিয়ে আসি। কিন্তু আমাদেরও সংসার আছে। একার পক্ষে তাদের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব নয়। সবাই মিলে এগিয়ে এলে পরিবারটির কিছুটা কষ্ট লাঘব হবে।’
স্থানীয় বাসিন্দা ফিরোজা বেগম বলেন, ‘তাদের অবস্থা এমন যে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। অভাবের সংসার, দেখার মতো কেউ নেই। ছেলে-মেয়েও নেই। সরকারি সহযোগিতা পেলে তাদের সংসারে কিছুটা স্বস্তি ফিরত।’
এ বিষয়ে সাঘাটা উপজেলার কচুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আমি খোঁজখবর নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব। বিভিন্ন ভাতার মাধ্যমে সহযোগিতা করারও উদ্যোগ নেব।’
সাঘাটা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো: মেহেদী হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আগে আমাদের জানা ছিল না। এখন জানলাম। তাদের সার্বিক সহযোগিতার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করব।’
নিঃসন্তান এ দম্পতির কষ্ট লাঘবে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরের সহযোগিতা কামনা করেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রত্যাশা, সরকারি সহায়তা ও মানুষের মানবিক উদ্যোগে নুরজাহান ও হাবিজারের জীবনে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরবে। এ,আর
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
