শিক্ষার্থী ভর্তিতে বিপরীত চিত্র; মাদ্রাসায় বাড়ছে, স্কুলে কমছে

প্রতিবেদন:

·

, , ,

দেশে সাধারণ ধারার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমলেও মাদ্রাসায় বাড়ছে। এক বছরের ব্যবধানে দাখিল থেকে কামিল পর্যন্ত শিক্ষা দেওয়া হয়–এমন মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। একই সময়ে মাদ্রাসার সংখ্যাও বেড়েছে। এই সময়ে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলেও শিক্ষার্থী বেড়েছে। তবে সাধারণ শিক্ষা ধারায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও স্বতন্ত্র কারিগরি-ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী কমেছে।

শিক্ষার বিভিন্ন ধারায় শিক্ষার্থী ভর্তির এই বিপরীতমুখী প্রবণতা শিক্ষা পরিকল্পনা, শিক্ষার্থীদের পছন্দ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৫ প্রতিবেদনে সম্প্রতি এ চিত্র উঠে এসেছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে দাখিল, আলিম, ফাজিল (পাস ও অনার্স) এবং কামিল পর্যায়ে শিক্ষা দেওয়া হয়–এমন মাদ্রাসা ২০২৪ সালে ছিল ৯ হাজার ২৬৯টি। এই সংখ্যা বেড়ে ২০২৫ সালে ৯ হাজার ২৯৬টি হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ২৭ লাখ ৯৬ হাজারের কিছু বেশি ছিল। তা বেড়ে ২৮ লাখ ৪০ হাজারের বেশি হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ২৭টি, শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪৩ হাজারের বেশি। এ হিসাবে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি ও কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে দেশে সব ধরনের মাদ্রাসায় মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা এর চেয়ে বহুগুণ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষার্থী বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। মাদ্রাসার শিক্ষকরা বলছেন, আগে তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিক্ষার্থী খুঁজতে হতো, কিন্তু এখন এমনিতেই মাদ্রাসায় অনেক শিক্ষার্থী আসছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদ্রাসায় বিনামূল্যে থাকা-খাওয়াসহ সুযোগ-সুবিধা বেড়েছে। ধর্মীয় কারণেও অনেকে মাদ্রাসা শিক্ষায় আগ্রহী। করোনার পর দেশে অর্থনৈতিক সংকটময় পরিস্থিতি দীর্ঘ হওয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষায় আগ্রহ বাড়ার যোগসূত্র দেখছেন শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ।

মাদ্রাসা শিক্ষার বিভিন্ন স্তরের মধ্যে দাখিল মাধ্যমিক পর্যায়ের এবং আলিম উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের সমমানের। উচ্চ শিক্ষার স্তরে রয়েছে ফাজিল ও কামিল। দাখিল ও আলিম পর্যায়ের শিক্ষাকার্যক্রম ও পরীক্ষা পরিচালনা করে বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড। ফাজিল ও কামিল পর্যায়ের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয় ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে।

মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমেছ চার লাখের বেশি
ব্যানবেইসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৪ সালে দেশে জুনিয়র স্কুলসহ সরকারি-বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ছিল ১৯ হাজার ১১৭টি। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৯ হাজার ২১১টি। প্রতিষ্ঠান বাড়লেও শিক্ষার্থী কমেছে চার লাখ আট হাজারের বেশি। ২০২৪ সালে এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ছিল ৭৮ লাখ ৪৭ হাজার ৫৪৬ জন। ২০২৫ সালে তা কমে হয়েছে ৭৪ লাখ ৩৯ হাজারের কিছু বেশি। এক বছরে বিদ্যালয় বেড়েছে ৯৪টি, অথচ শিক্ষার্থী কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে।

এক বছরে স্বতন্ত্র কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার্থী কমেছে। বিপরীতে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৫৯৫ জন। দেশে এ ধরনের স্কুল রয়েছে ১৪৩টি। ২০২৪ সালে এসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ছিল ২৯ হাজার ৭৭। ২০২৫ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৯ হাজার ৬৭২।

কারণ অনুসন্ধানে গবেষণার তাগিদ
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমার বিপরীতে মাদ্রাসায় বৃদ্ধির কারণ ব্যানবেইসের প্রতিবেদনে বিশ্লেষণ করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের পছন্দের পরিবর্তন, অভিভাবকদের সিদ্ধান্ত, প্রতিষ্ঠানের সহজলভ্যতা কিংবা শিক্ষার ব্যয়–কোন বিষয়টি এ প্রবণতায় কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মাধ্যমিক থেকে মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী স্থানান্তর হচ্ছে কিনা– সেটিও স্পষ্ট নয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মনিনুর রশীদ বলেন, মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে করোনার পর শিখন ঘাটতি, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, সাম্প্রতিক নানা পরিস্থিতি, শিশুদের শ্রমে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাক্রমের প্রভাব থাকতে পারে। তবে এগুলোর সম্ভাব্য কারণ ও প্রকৃত চিত্র জানতে গবেষণা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, মাধ্যমিকে এত শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার কারণসহ প্রতিবেদনের অন্যান্য পরিসংখ্যানের প্রবণতা বুঝতে নিবিড় গবেষণা করতে হবে। গবেষণার ফলাফলের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

শিক্ষা-সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু শিক্ষার্থী বাড়া-কমার পরিসংখ্যান দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতি বিচার করা যথেষ্ট নয়। ঝরে পড়ার হার, শিক্ষার মান, শিক্ষক সংখ্যা ও যোগ্যতা, বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষার সুযোগ এবং উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতিও মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে শিক্ষার বিভিন্ন ধারায় বাস্তব চাহিদা নিরূপণ এবং কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ