কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলার প্রাচীন আদি পেশা পান চাষ। এই পেশার ওপর নির্ভর করেই জীবিকা নির্বাহ করে আসছে মহেশখালীর হাজারো পরিবার। তবে দেশের দ্রব্য মূল্যের উর্ধ্বগতি, উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি, বাজারে পানের দরপতন এবং সরকারি সুযোগ-সুবিধার অভাবে বর্তমানে চরম সংকটে পড়েছেন স্থানীয় পান চাষিরা। অনেকেই ঋণ নিয়ে পান বরজ তৈরি করলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয় পান চাষি আমির হোসেন জানান, মহেশখালীতে প্রতিবছর তিন হাজারেরও বেশি পান বরজ রোপণ করা হয়। উপজেলার প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পান চাষের সঙ্গে জড়িত। তাঁর মতে, প্রায় ৩০০ বছর আগেও মহেশখালীতে পান চাষের প্রচলন ছিল। দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের মতো মহেশখালীতেও বহু শতাব্দী ধরে পান চাষ হয়ে আসছে। একসময় জমিদার পরিবারগুলো বিবাহ ও সামাজিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে পান চাষে বিশেষ গুরুত্ব দিত।
মহেশখালী উপজেলায় ১৬০০ হেক্টর জমিতে পান চাষ হয়। এর মধ্যে ১৪০০ হেক্টর চাষাবাদ হয় পাহাড়ি জমিতে। পানের বরজের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজারের মতো।
ঐতিহাসিক মৈনাক পর্বতের চারিদিকে ঢালু জমিতে যে মিষ্টি পান উৎপাদিত হয় তা দুনিয়ার আর কোথাও হয় না। এ কারণেই মহেশখালীর মিষ্টি পান এত গুরুত্ব ও তাৎপর্য বহন করে বিশ্বজুড়ে। এমনটাই মনে করেন ঐতিহাসিকরা।
পান চাষের জন্য প্রয়োজন উপযোগী ও উঁচু জমি। বিশেষ করে পাহাড়ের পাদদেশে পান চাষ ভালো হয়। কিছু এলাকায় বিল বরজেও পান চাষের প্রচলন রয়েছে।
একটি পান বরজ তৈরির জন্য প্রথমে জমি সমতল করা হয়। এরপর খুঁটি স্থাপন, রশি দিয়ে সারি নির্ধারণ, গর্ত তৈরি, ছন ও বাঁশ দিয়ে ছায়া তৈরি, মাটি খনন করে পাঠি নির্মাণসহ নানা কাজ সম্পন্ন করতে হয়। পরে অন্য বরজ থেকে রোগমুক্ত ও ভালো মানের লতা নির্বাচন করে দুই বা তিন গিরা করে চারা প্রস্তুত করা হয় এবং মাটির প্রলেপ দিয়ে রোপণের জন্য সংরক্ষণ করা হয়।
রোপণের ১২ থেকে ১৩ দিন পর সার প্রয়োগ করতে হয়। ৪০ থেকে ৫০ দিন পর পরিচর্যার কাজ শুরু হয়। রোগবালাই দেখা দিলে কীটনাশক প্রয়োগ করতে হয়। রোপণের প্রায় তিন মাস পর থেকে পান সংগ্রহ করা যায়।
চাষিদের দাবি, একটি মাঝারি আকারের পান বরজ তৈরি ও পরিচর্যায় প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। অধিকাংশ কৃষক ঋণ নিয়ে বরজ তৈরি করেন। কিন্তু বাজারে পানের ন্যায্য মূল্য না থাকায় উৎপাদন খরচই উঠছে না।
পান চাষি সুকুন্দ, মিদুল, আব্দুল করিম, আমির হোসেন ও আবু বক্কর বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে বাপ-দাদার আদি পেশা হিসেবে পান চাষ করে আসলেও আমরা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা পাইনি। এমনকি এক মুঠো সারও পাইনি। যদি পানের ন্যায্য মূল্য পেতাম, তাহলে আমাদের জীবনযাপন অনেক সুন্দর হতো।”
তাঁরা আরও বলেন, “ঋণের টাকায় বরজ তৈরি করে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় দিনের পর দিন পরিবার নিয়ে মানসিক চাপে থাকতে হচ্ছে। অনেক সময় পান বিক্রির টাকা দিয়ে বাজার খরচও মেটানো যায় না।”
মহেশখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল গাফ্ফার বলেন, মহেশখালী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে অনেকবার আবেদন করা হয়েছে। যেহেতু মহেশখালীর মিষ্টি পান চট্টগ্রাম অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি সাথে সম্পৃক্ত এবং বাংলাদেশের জন্য বিখ্যাত। তাই পান চাষীরা সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলে উৎপাদনে আরো উৎসাহিত হবে এবং এই এলাকার পান চাষীরা উপকৃত হবে।
মহেশখালী উপজেলা কৃষি বিভাগের সিনিয়র উপসহকারী কর্মকর্তা জনাব জোনায়েদ জানান, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো পান চাষিদের জন্য বিশেষ সহায়তা কার্যক্রম চালু হচ্ছে। আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে নগদ অর্থসহ বিভিন্ন সরকারি সুবিধা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ জাতীয় সংসদে মহেশখালীর পানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং জিআই স্বীকৃতির দাবি তুলে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন।
স্থানীয় চাষিদের আশা, পানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং সরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করা হলে মহেশখালীর প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবারের জীবনমান উন্নত হবে এবং কৃষকের মুখে আবারও হাসি ফুটবে।
মহেশখালীর মিষ্টি পানের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। সরকারিভাবে পান রপ্তানি বৃদ্ধি এবং নতুন বিদেশি বাজার সৃষ্টি করা। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পান বরজের জন্য ক্ষতিপূরণ ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান। পানের সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থা আধুনিক করা। রোগবালাই দমনে কৃষি বিভাগের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি।
পান চাষিদের জন্য ভর্তুকি ও কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করা।
মহেশখালীর মিষ্টি পান বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও খ্যাতিমান কৃষিপণ্য। মহেশখালীর পাহাড়ি ঢাল ও উপকূলীয় জলবায়ু পান চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী, যা এ পানের স্বাদ ও গুণগত মানকে অনন্য করেছে। মিষ্টি স্বাদ, বড় আকার ও উন্নত মানের কারণে এ পানের সুনাম দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে; হাজারো কৃষকের জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি এই পান চাষ।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
