আমাদের প্রধান খাদ্য চাল নিয়ে দেশে বছরের পর বছর ধরে যে সুসংগঠিত ও জঘন্য প্রতারণা চলছে, শনিবার যুগান্তরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এর এক ভয়ংকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। কৃষিবিজ্ঞানী থেকে শুরু করে নীতিপ্রণেতারা একবাক্যে স্বীকার করেছেন, দেশে মিনিকেট নামে ধানের কোনো জাত নেই, নেই কোনো সরকারি স্বীকৃতি। অথচ এক অদ্ভুত মায়াজালের মতো দেশের প্রতিটি ছোট-বড় বাজারে বছরের পর বছর ধরে দাপটের সঙ্গে বিক্রি হচ্ছে এই তথাকথিত সরু চাল। জানা যায়, মূলত স্বর্ণা, পাইজাম ও বিআর-২৮-এর মতো মোটা ও মাঝারি জাতের ধান কৃষকদের কাছ থেকে কম দামে কিনে মজুত করে একশ্রেণির অসাধু মিলার। এরপর আধুনিক অটো রাইস মিলে সেগুলোকে অতিরিক্ত ছাঁটাই, ঘর্ষণ এবং কেমিক্যালের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে পলিশ করে চকচকে ও সরু আকার দেওয়া হয়, যার নতুন নাম হয় মিনিকেট। এই কারসাজির মাধ্যমে শুধু যে ভোক্তার পকেট থেকে বছরে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে তা-ই নয়, গোটা জাতিকে এক দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে, যা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, অতিরিক্ত ছাঁটাই ও পলিশ করার কারণে চালের গায়ে থাকা প্রাকৃতিক ও অতি প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান যেমন-ভিটামিন বি-১, বি-৬, আয়রন ও ফাইবার সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। আর এই অতি-পরিশোধিত চাল খাওয়ার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পায়, যা দেশে ডায়াবেটিস, স্থূলতা ও হৃদরোগের মতো মারাত্মক অসংক্রামক রোগ বাড়িয়ে তুলছে। উল্লেখ্য, এই প্রতারণা রুখতে ২০২৩ সালে একটি সুনির্দিষ্ট আইনও প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেই আইনে চালের বস্তার গায়ে অবৈজ্ঞানিক বা কাল্পনিক নাম লিখলে ২ বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার কঠোর বিধান রাখা হয়। পরিতাপের বিষয়, তদারকি সংস্থাগুলোর শৈথিল্য ও নিয়মিত বাজার মনিটরিংয়ের অভাবে অসাধু ব্যবসায়ীরা প্রকাশ্যেই এই নিষিদ্ধ চালের রমরমা বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
এই জনবিরোধী খাদ্য প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে হলে সরকারকে অবিলম্বে কঠোর ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে ২০২৩ সালের আইনের শতভাগ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে একদিকে দেশব্যাপী সমন্বিত ও চিরুনি অভিযান পরিচালনা করে দায়ীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অন্যদিকে, মিল পর্যায় থেকে চালের বস্তার গায়ে ধানের আসল জাত এবং মিলিংয়ের তারিখ লেখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কোনো বস্তায় ‘মিনিকেট’ শব্দটির ব্যবহার পেলেই তা বাজেয়াপ্ত করতে হবে। একইসঙ্গে, ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা বাড়াতে হবে। বাহ্যিক সৌন্দর্য বা চকচকে সাদা চাল মানেই যে পুষ্টিকর নয়, বরং তা একপ্রকার বিষ, এ তথ্যটি প্রয়োজনে সরকারি উদ্যোগে গণমাধ্যমে প্রচার চালিয়ে মোটা ও লাল চালের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে জনগণকে সচেতন করতে হবে। আমরা আশা করব, নীতিনির্ধারকরা এই সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার লুণ্ঠন ও স্বাস্থ্যবিধ্বংসী বাণিজ্য বন্ধে মিলারদের সিন্ডিকেট ভেঙে দেবেন। দেশের মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির অধিকার নিশ্চিতে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে, এটাই প্রত্যাশা।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
