আবাসন খাতে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক মডেলে ক্ষতিগ্রস্ত ৪০ হাজার নাগরিক

প্রতিবেদন:

·

,

আবাসন খাতে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক মডেলের উদ্বেগজনক বিস্তারের মাধ্যমে জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট নির্মাণ ও হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। এ ধরনের ব্যবস্থায় জমির মালিকানা, ভবনের অনুমোদিত নকশা, নির্মাণের সক্ষমতা, অর্থের ব্যবহার, ফ্ল্যাটের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও হস্তান্তরের আইনি নিশ্চয়তা স্পষ্ট না থাকায় ৪০ হাজার নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং অনেকে সর্বস্বান্ত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন। আগামী দুই থেকে তিন বছরে এ ধরনের প্রকল্প ঘিরে মামলা ও আইনি জটিলতায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা আটকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব)।

রোববার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগের কথা জানান রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল।

সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পে প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪০ হাজার ক্রেতা এবং ১২ হাজার কোটি টাকা সংশ্লিষ্ট। জমির মালিকানা, ভবনের অনুমোদিত নকশা এবং নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের আইনগত নিশ্চয়তা না থাকায় বিনিয়োগ করেও ফ্ল্যাট বুঝে পাচ্ছেন না অনেক ক্রেতা। ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তাঁরা সামাজিক ও পারিবারিক সংকটেও পড়ছেন।

সংগঠনটির অভিযোগ, একই জমি বা ভবনের বিপরীতে একাধিক ব্যক্তির কাছে শেয়ার বিক্রি, যথাযথ অনুমোদন ছাড়াই অর্থ সংগ্রহ, নির্মাণ ব্যয়ের অস্বচ্ছ হিসাব এবং জাল দলিলের মতো অনিয়মের ঘটনা ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের মিল নেই। নির্মাণবিধি ও ভবনের নিরাপত্তাসংক্রান্ত শর্তও যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না।

রিহ্যাবের নেতারা বলেন, জমির অবিভক্ত অংশের মালিকানা থাকলেই নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের আইনগত মালিকানা নিশ্চিত হয় না। এ কারণে ভবিষ্যতে ফ্ল্যাট বিক্রি, ব্যাংকে বন্ধক রাখা কিংবা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনেও জটিলতা দেখা দিতে পারে। জমির মালিকানা, ফ্ল্যাট বরাদ্দ, নির্মাণ ব্যয় ও দখল নিয়ে অংশীদারদের বিরোধ আদালত পর্যন্ত গড়াচ্ছে। এতে ক্রেতাদের অর্থ দীর্ঘদিন আটকে থাকার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।

এ সময় শেয়ারভিত্তিক অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসা বন্ধে ছয় দফা দাবি জানায় রিহ্যাব। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—জমির শেয়ার বিক্রি করে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাট দেওয়ার প্রতিশ্রুতিনির্ভর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসা বন্ধ করা; প্রয়োজনীয় আইনগত পর্যালোচনার মাধ্যমে এ ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ অথবা কঠোর নিয়ন্ত্রণে আনা; জমির মালিকানা, নিবন্ধন, দায়-দেনা ও প্রকল্পের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত না করে অর্থ সংগ্রহ বন্ধ করা; বিদ্যমান প্রকল্পগুলোতে স্বাধীন কারিগরি ও আইনগত নিরীক্ষা চালানো এবং একই জমি একাধিকবার বিক্রি বা জাল দলিলের অভিযোগ তদন্ত করা। পাশাপাশি প্রকল্পের অর্থ সংগ্রহ ও নির্মাণ ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাব নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি প্রকল্পে যোগ্য স্থপতি, প্রকৌশলী ও পেশাদার জনবল নিয়োগের আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।

রিহ্যাব নেতারা বলেন, আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় তিন শ ধরনের সংযোগ শিল্প জড়িত। নির্মাণ খাতের অবদান মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৫ থেকে ১৬ শতাংশ এবং এই শিল্পে প্রায় ৫০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক মডেলের কারণে নিয়ম মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছে।

রিহ্যাবের দাবি, অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসায়িক মডেলে তৈরি করা ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ ভবনে কোনো না কোনো সমস্যা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রতিটি ভবনের স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কারিগরি যাচাই করা প্রয়োজন। রিহ্যাবের মাধ্যমে এগুলোর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বৈধ অনুমোদন ও জমির মালিকানা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত নতুন প্রকল্পের বিক্রয় এবং অর্থ সংগ্রহ বন্ধ রাখতে হবে। অন্যথায় অর্থ পরিশোধের পরও নির্ধারিত সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর কিংবা বৈধ মালিকানা নিশ্চিত করতে জটিলতা লেগেই থাকবে।

রিহ্যাব সভাপতি ড. আলী আফজাল বলেন, বৈধ যৌথ মালিকানা বা স্বচ্ছ বিনিয়োগ ব্যবস্থার বিরোধিতা করছে না রিহ্যাব। তবে জমির অংশীদারত্ব বা যৌথ উদ্যোগের নামে এমন ব্যবসা পরিচালনা করা উচিত নয়, যেখানে বিনিয়োগের বিপরীতে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটের মালিকানা ও হস্তান্তরের নিশ্চয়তা নেই এবং সরকারি রাজস্ব যথাযথভাবে পরিশোধ করা হয় না।

তিনি বলেন, শেয়ারভিত্তিক অনিয়ন্ত্রিত আবাসন ব্যবসার সমস্যা শুধু রিহ্যাবের নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। এর সঙ্গে মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয়, আবাসনের নিরাপত্তা, সরকারি রাজস্ব এবং দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ জড়িত। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এর আর্থিক, সামাজিক ও আইনি ক্ষতির দায় রাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে রিহ্যাবের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আব্দুর রাজ্জাক, সহসভাপতি-২ মো. বরকত উল্লাহ, সহসভাপতি-৩ এ এফ এম ওবায়দুল্লাহ ও সহসভাপতি (অর্থ) ড. হারুন অর রশিদসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ