রোহিঙ্গা মামলার রায়ে বদলে যাচ্ছে গণহত্যার সংজ্ঞা

প্রতিবেদন:

·

, ,

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করেছে গাম্বিয়া। রোহিঙ্গা গণহত্যা বিষয়ে করা এই মামলার রায় আসন্ন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে নেদারল্যান্ডসের হেগের এই আদালত রায় ঘোষণা করতে পারে। মামলার যে রায় দেয়া হতে পারে তাতে বদলে যেতে পারে বিশ্বের গণহত্যার সংজ্ঞা।

মিডল ইস্ট আই এক বিশ্লেষণে জানিয়েছে, এই রায়ের মাধ্যমে শুধু রোহিঙ্গাদের দীর্ঘ নিপীড়নের বিচারিক স্বীকৃতিই মিলবে না, বরং আন্তর্জাতিক আইনে ‘গণহত্যা’র সংজ্ঞায়ন এবং গাজায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলমান দক্ষিণ আফ্রিকার মামলার ক্ষেত্রেও তা অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সেনাবাহিনীর নৃশংস অভিযানের মুখে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

বর্তমানে কক্সবাজারের বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে। ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সমর্থনে ২০১৯ সালের নভেম্বরে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আইসিজেতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে এই মামলা দায়ের করে। আদালত যদি মিয়ানমারকে দোষী সাব্যস্ত করে, তবে এটিই হবে আইসিজের ইতিহাসে সরাসরি কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে গণহত্যা চালানোর প্রথম রায়।

কক্সবাজারে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের দাবি
রোহিঙ্গা সাক্ষীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা লিগ্যাল অ্যাকশন ওয়ার্ল্ডওয়াইড (ল’)-এর নির্বাহী পরিচালক আন্তোনিয়া মালভে জানান, বিশ্ব আদালতের এই রায় কক্সবাজারের শরণার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংস্থাটির করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৮৬ ভাগ রোহিঙ্গা মনে করে তাদের জন্য আসল বিচার হলো মিয়ানমারে পূর্ণ নাগরিকত্ব ফিরে পাওয়া এবং নিজেদের রোহিঙ্গা হিসেবে পরিচয়ের অধিকার নিশ্চিত করা।

তারা শুধু আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা অপরাধীদের সাজাই চায় না, বরং সমস্যার মূল উৎপাটন চায়। তারা ১৯৮২ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইনের বাতিল, ভিটেমাটি ফেরত এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা দাবি করছে।

গণহত্যার প্রমাণ ও মিয়ানমারের যুক্তি
চলতি বছরের জানুয়ারিতে শুনানির সময় হেগের আদালতে উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্য দেন তিনজন রোহিঙ্গা প্রত্যক্ষদর্শী। তারা স্বজনদের হত্যা, ব্যাপক ধর্ষণ এবং বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়ার লোমহর্ষক বর্ণনা দেন। শুনানিতে উঠে আসে যে সেনারা প্রজননক্ষম বয়সের রোহিঙ্গা নারীদের চিহ্নিত করে দলবদ্ধভাবে ধর্ষণ করেছে।

গাম্বিয়ার আইনজীবীরা যুক্তি দেখান, অন্তত ৮ লাখ মানুষের ওপর চলা এই নির্বিচার নিপীড়ন, শিশুদের হত্যা এবং পালিয়ে যাওয়ার সময় পেছনের দিকে গুলি চালানো কোনোভাবেই সাধারণ কোনো অভিযান হতে পারে না। এটি ছিল স্পষ্টত একটি পুরো জাতিকে নির্মূল করার সুপরিকল্পিত অভিপ্রায়।

অন্যদিকে মিয়ানমারের প্রধান প্রতিরক্ষা যুক্তি ছিল— তারা কেবল বিচ্ছিন্নতাবাদী আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মির (আরসা) বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’ পরিচালনা করেছে। তবে আইনজীবীরা এর জবাবে আদালতে তুলে ধরেন যে, কোনো সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের অজুহাতে নারী ও শিশুদের পুড়িয়ে মারা কিংবা বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া আইনসিদ্ধ হতে পারে না।

এমনকি এক পর্যায়ে মিয়ানমার দাবি করে তারা নিধন করতে চায়নি, বরং দেশছাড়া করতে চেয়েছিল। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা জানান, নির্বিচারে হত্যা করে বিতাড়িত করাও গণহত্যার অংশ। বৃটেন, কানাডা, ফ্রান্স ও জার্মানির মতো পশ্চিমা দেশগুলোও আইসিজেতে গাম্বিয়ার যুক্তির পক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে।

ইসরাইল ও গাজা মামলার সমীকরণ
ডাবলিনের ট্রিনিটি কলেজের আন্তর্জাতিক আইন বিভাগের অধ্যাপক মাইকেল বেকার জানান, আইসিজের এই আসন্ন রায় আন্তর্জাতিক গণহত্যার আইনকে নতুন রূপ দিতে পারে। বিশেষ করে, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আড়ালে গণহত্যা চললে তা কীভাবে প্রমাণ করা যাবে, সে সংক্রান্ত নজির তৈরি হবে এখানে।

গাজায় চলমান যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইসরাইলও একই ধরনের যুক্তি দিয়ে আসছে যে তারা হামাসের বিরুদ্ধে লড়ছে, বেসামরিক নাগরিকদের নির্মূল করছে না। ফলে আইসিজে যদি মিয়ানমারের ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের’ অজুহাত প্রত্যাখ্যান করে গণহত্যার চূড়ান্ত রায় দেয়, তবে তা আইসিজেতে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা ইসরাইলবিরোধী মামলায় তেল আবিবকে চরম আইনি চাপে ফেলবে।

রায় কার্যকরের জটিলতা
আইসিজের রায় চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক হলেও তা সরাসরি কার্যকরের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা বা পুলিশ বাহিনী আদালতের নেই। কোনো দেশ রায় মানতে অস্বীকার করলে তা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ওঠে, যেখানে মিয়ানমারের পক্ষে রাশিয়া ও চীনের ভেটো দেয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নিরাপত্তা পরিষদের বাইরে গিয়েও এই রায় মিয়ানমারের জান্তা সরকারের ওপর বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবরোধ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে। বিশ্বমঞ্চে বিচ্ছিন্নতা এড়াতে যেকোনো ভবিষ্যৎ বর্মি সরকারকে আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায় মানার দায় নিতেই হবে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ