যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগের দিন মিশিগানে সিনেট আসনের লড়াইয়ে শেষ মুহূর্তের প্রচার চালিয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ ও রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। সোমবার সন্ধ্যায় দুই প্রার্থী পৃথক সমাবেশে অংশ নিয়ে ভোটারদের কাছে নিজেদের পক্ষে সমর্থন চেয়েছেন। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই নির্বাচন কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ সময়ে নানা নাটকীয় ঘটনা ঘটলেও জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন আল-সাইয়েদ। নিউইয়র্ক টাইমস ও সিয়েনা কলেজের রোববার প্রকাশিত এক জরিপে সম্ভাব্য ভোটারদের মধ্যে তার সমর্থন ৫৩ শতাংশ। অন্যদিকে রজার্সের পক্ষে সমর্থন ৪২ শতাংশ। অর্থাৎ ১১ শতাংশ পয়েন্টে এগিয়ে রয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী। জরিপটির ভুলের সীমা ৩ দশমিক ৬ শতাংশ পয়েন্ট।
সোমবার রাতে রচেস্টার হিলসে সমাবেশে অংশ নেন সাবেক কংগ্রেস সদস্য রজার্স। টম পেটির ‘আই ওন্ট ব্যাক ডাউন’ গান বাজতে থাকা অবস্থায় মঞ্চে উঠে তিনি নির্বাচনকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘হৃদয় ও আত্মার’ লড়াই হিসেবে বর্ণনা করেন।
সমর্থকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল স্বাধীনতার জন্য লড়াই করতে প্রস্তুত তো? দেশের বাকি অংশকে এই বার্তা দিতে প্রস্তুত তো যে, আমরাই ডেমোক্র্যাট সোশ্যালিস্টদের পরাজিত করেছি?’
অন্যদিকে ডেট্রয়েটে শ্রমিক সংগঠন ইউনাইটেড অটো ওয়ার্কার্সের (ইউএডব্লিউ) সদস্যদের নিয়ে আয়োজিত সমাবেশে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিকে সামনে আনেন আল-সাইয়েদ। তবে প্রচারের শেষ দিনগুলোতে তাকে ঘিরে ছড়ানো ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণের বিষয়েও কথা বলেন তিনি।
সমাবেশে আল-সাইয়েদ বলেন, ‘জ্বালানির দাম যখন বেশি, মানুষ যখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন কেউ নির্বাচনে জিততে চাইলে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে কথা বলবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তারা এসব নিয়ে কথা বলতে চায় না। তারা কথা বলতে চায় আমাকে নিয়ে, আমার নাম নিয়ে, আমার ধর্মবিশ্বাস নিয়ে।’
আল-সাইয়েদের পরিবার মিসর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন করে। তার বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্যের অন্যতম প্রধান উৎস হিসেবে উঠে এসেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম। ট্রাম্প দাবি করেছেন, আল-সাইয়েদ নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘জিহাদিদের ঢল’ নামবে।
বিভিন্ন সময় তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে আল-সাইয়েদের নাম বিকৃত করে ‘আবদুল রমজান’ বলেও উল্লেখ করেছেন। কখনো তার মধ্যনাম ‘মোহাম্মদ’ সামনে এনেও কটাক্ষ করেছেন।
এসব আক্রমণের জবাবে আল-সাইয়েদ বলেন, ‘ট্রাম্প আমার নাম জানেন কি না, তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। কারণ, আগামীকালের পর আমরা নিশ্চিত করব, তিনি আমাকে সিনেটর বলেই ডাকছেন।’
তবে নির্বাচনের ঠিক আগে ডেমোক্র্যাট শিবিরের ভেতর থেকেই আল-সাইয়েদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। দলীয় প্রাথমিক নির্বাচনে তার কাছে হেরে যাওয়া কংগ্রেস সদস্য হ্যালি স্টিভেন্স রোববার প্রকাশ্যে রিপাবলিকান প্রার্থী রজার্সকে সমর্থন জানান। তার এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে নিজের অবস্থানের ব্যাখ্যা দেন স্টিভেন্স। তিনি জানান, এল-সায়েদের প্রচারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন একটি বিজ্ঞাপন তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলেছে।
ওই বিজ্ঞাপনে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের সঙ্গে নিত্যপণ্যের ক্রমবর্ধমান দামের সম্পর্ক তুলে ধরা হয়েছিল। এ ছাড়া আল-সাইয়েদের নির্বাচনী প্রচারে তাকে উপেক্ষা করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
স্টিভেন্স লেখেন, ‘মাইক রজার্সের সঙ্গে অনেক বিষয়ে আমার মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু মিশিগানকে একজন সিনেটর নির্বাচন করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ থাকার কোনো সুযোগ নেই। আবদুল আল-সাইয়েদ যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের দায়িত্ব পালনের যোগ্য নন—এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর পর কাকে সমর্থন করা উচিত, সেই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাকে।’
নিজের সমর্থনের কারণে সমালোচনার মুখে পড়া ডেমোক্র্যাট সহকর্মীদেরও কটাক্ষ করেন স্টিভেন্স। আগামী জানুয়ারিতে তার বর্তমান দায়িত্ব শেষ হওয়ার পর দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে ভূমিকা রাখার ইঙ্গিতও দেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমরা আরো শক্তিশালী, আরো অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সাহসী ডেমোক্র্যাটিক পার্টি গড়ে তুলতে পারি। আর সেই উদ্যোগে নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা আমার রয়েছে।’
রজার্সের সমাবেশে স্টিভেন্সসহ কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নেতার সমর্থনের বিষয়টি তুলে ধরলে উপস্থিত সমর্থকেরা করতালি দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। স্টিভেন্সের সিদ্ধান্তকে ‘বিশেষ ধরনের সাহস’ বলে অভিহিত করেন রজার্স। এ সময় সমর্থকেরা ‘হ্যালি’ স্লোগান দেন।
সব মিলিয়ে, মিশিগানের সিনেট নির্বাচন এখন শুধু দুই দলের প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সীমাবদ্ধ নেই। আল-সাইয়েদকে ঘিরে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে বিতর্ক এবং ডেমোক্র্যাট শিবিরের অভ্যন্তরীণ বিভক্তি—সবকিছু মিলিয়ে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তের প্রচার আরো উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
