যশোর সদরের আরবপুর ইউনিয়নের বাইপাস রোড ধর্মতলা এলাকায় বাগ-ই-আদম নামে একটি একতলা বাড়ি। বাড়ির ঠিক পেছনে রেললাইন। মহাসড়ক আর রেললাইনের মাঝখানে দুই একরের কিছু বেশি জায়গার ওপরে ‘বাগানবাড়ি’। প্রধান ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়বে ছোট্ট একটি গাছে অনেক আম ঝুলছে। পরিপুষ্ট ও সাইজে বড় এই আমের নাম চাংমাই। বিদেশি জাতের এই আম পরিপক্ব হলে এক কেজির মতো ওজন হয়।
শুধু চাংমাই নয়, এই ‘অ্যাডামস অ্যাগ্রো ফার্মে’ রয়েছে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে ৭৫ প্রজাতির আম। যেখানে যশোর হর্টিকালচার সেন্টারে রয়েছে মাত্র ৫৩ প্রজাতির। বাগানে শুধু আমগাছই আছে প্রায় সাড়ে আটশ। কথাগুলো বলছিলেন ‘অ্যাডামস অ্যাগ্রো ফার্মে’র উদ্যোক্তা আব্দুল্লাহ মো. হোসেন মাসুদ। ফার্মের দুপাশে আমের বাগান, মাঝখানে দুটি পুকুর। প্রবেশপথের ডান পাশের বাগানটিতে প্রথমে আম গাছের চারা লাগানো হয়, জানান ৬৪ বছর বয়সি মাসুদ। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স সম্পন্ন করেন ১৯৮৮ সালে।
আলাপচারিতায় বলেন, ২০১৩ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি এলজি বাটারফ্লাই গ্রুপে জব করেন। ওইসময় তার কর্মরত প্রতিষ্ঠানের পাশে ব্র্যাকের নার্সারিতে নানা জাতের ফলের চারা দেখেন। সেখানে তিনি মনস্থির করেন বাবার স্বপ্ন বাস্তবায়নে নিজ ভিটায় একটি ফার্ম করার। বড়ভাই হর্টিকালচারিস্ট, তাকে জানালে তিনিও সায় দেন। তখন ওই নার্সারি থেকে ইনডিয়ান তোতাপুরি, তোশা, আমেরিকান কেন্ট, অস্ট্রেলিয়ান আরটুইটু, সিমওয়ান, মেক্সিকান পালমার, হাইব্রিড গোপালভোগ, আলফানসো, ব্যানানা ম্যাঙ্গো, মালয়েশিয়ান একটি আননোন জাত-পরে যার নাম নিজেই রাখেন ‘আদম সুন্দরী’ প্রভৃতি প্রজাতির ২৫ থেকে ৩০ পিস চারা কিনে পাঠিয়ে দেন। পরে বাড়িতে এসে সেগুলো রোপণ করেন। ওই মাদারগাছ থেকে এখন বহু গাছের জন্ম হয়েছে। যার কলম মাসুদ নিজেই দেন।
মাসুদের বাবার নাম আবুল হোসেন, মা বেগম জাহান আরা। বাবা যশোর জেলা মৎস্য অফিসার ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল পরিবার গ্রামে রেখে তিনি শহরে ফেরেন। শহরেই পাক আর্মিদের হাতে গুলিবিদ্ধ এবং গুম হন। তার লাশ পাওয়া যায়নি। ওই দম্পতির ৬ ছেলে। শেষেরজন মাসুদ।
বাগ-ই-আদমে পৈতৃক জমি ছিল প্রায় ২৫ কাঠার মতো। পরে মাসুদরা সব ভাই মিলে আরও জমি ক্রয় করেন। বর্তমানে এই ফার্মে জমির পরিমাণ দুই একরের কিছু বেশি। বাগানে আম্রপলি, ল্যাংড়া, বারি-৪, বারি-১১, খিরসা, রাণীপছন্দ, গৌরমতি, ইনডিয়ান তোতাপুরি, চোষা, অরুণিমা, আলফানসো, সুরিয়া, জরদালু, কেশর, সিইটু, দশোরি, পাকিস্তানি চোষা, নামফোকলাই, ইয়েলো, গ্রিন, ডকমাই, থাই হোয়াইট, চিলিম্যাংগো, হাড়িভাঙ্গা, আমেরিকান কেন্ট, থাই কাটিমন, চিয়াংমাই, রেড আইভরি, নীলাম্বরি, সিমন, মল্লিকা, মিয়াজাকি, সুইট টার্ট, ভেনাস গ্লেন, নাগ ফজলি, রেড চিয়াংমাইসহ নানা প্রজাতির আম। এছাড়া দেশি ফলের মধ্যে জাম, কাঁঠাল, লিচু, লেবু, সফেদা, বরই, বেল, কতবেল, জলপাই, খেজুর, তাল, পেয়ারা, করমচা, ফলসা, গাব-এমনকি আপেল গাছও রয়েছে। পুকুরে চাষ হচ্ছে নানা ধরনের মাছ। ফার্মে রয়েছে একশ পাতিহাঁস, রাজহাঁস ১৯টি। এছাড়া দেশি মুরগি সবমিলিয়ে তিনশর বেশি।
মাসুদ বলেন, বাবা-মায়ের স্মৃতিচিহ্ন অটুট রাখতে এই অ্যাগ্রো ফার্মটি করেছি। উদ্দেশ্য-ফলদ উদ্ভিদের দেশি-বিদেশি জাত ও প্রজাতির সংগ্রহ ও সংরক্ষণ, শিক্ষামূলক প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণ, নির্বাচিত জাতের নার্সারি উন্নয়ন ও চারা বিপণন, উৎপাদিত ফল অভ্যন্তরীণ বাজার ও বিদেশে রপ্তানি এবং সর্বোপরি মা-বাবার সম্পত্তি সংরক্ষণ ও স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং তাদের আদর্শ সমুন্নত রাখা। যশোর হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক দীপঙ্কর দাশ বলেন, যশোরে এতো বৈচিত্র্যময় আমের জাতের বাগান আর কোথাও নেই।
এ এম
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
