‘মোদির বাপও যাবে’

প্রতিবেদন:

·

, ,

মেজাজ হারিয়ে ভরা সভায় ‘কুমন্তব্য’ করে বিপাকে পড়েছেন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ‘বাপ তুলে অসম্মান করায়’ দেশজুড়ে বিজেপি প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ দেখানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গমগমে রাজনৈতিক আবহে খাড়গের এই মন্তব্য এক অন্য মাত্রা জুড়েছে।

ঘটনাস্থল বিহারের রাজধানী পাটনা। গতকাল রোববার সেখানে বিহারের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী শ্রীকৃষ্ণ সিংয়ের ১৩৯তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত কংগ্রেসের এক সভায় কংগ্রেস সভাপতি দেশের বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হয়ে নরেন্দ্র মোদি কী কী মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, কীভাবে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছেন, প্রতিষ্ঠান দুর্বল করছেন, তা জানিয়ে তিনি বলেন, এসআইআরে যারা কারচুপি করেছে কংগ্রেস তাদের জেলে পাঠাবে। মোদিকেও জেলে পাঠানো হবে।

খাড়গের কথার মাঝেই সভা থেকে এক তরুণকে বলতে শোনা যায়, ‘মোদি নেহি যায়েগা’ (মোদি ক্ষমতাচ্যুত হবেন না)। ওই মন্তব্য শুনে খাড়গে মেজাজ হারান। সাধারণত যিনি নম্র ও মৃদুভাষী, হঠাৎই তিনি উত্তেজিত হয়ে ওই তরুণের উদ্দেশে বলে ওঠেন, ‘মোদি কা বাপ ভি যায়েগা (মোদির বাপও যাবে), বাপ ভি যায়েগা।’

খাড়গের ভাষণে বাধা দেওয়া ওই তরুণকে কংগ্রেস কর্মীরা সভা থেকে বের করে দেন। অভিযোগ তাঁকে মারধরও করা হয়। তরুণের নাম সন্তোষ কুমার। গণমাধ্যমকে তিনি বলেন, তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছে। তিনি নাকি বলেছিলেন, অত সহজে মোদি যাবেন না। তাঁকে সরাতে গেলে বিদ্রোহ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ‘বাপ’ তুলে কথা বলার খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বিজেপির শীর্ষ নেতারা সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিবাদী হন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, মোদিজির বাবার বিষয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করে কংগ্রেস সভাপতি শালীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছেন। রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস দিন দিন অশালীন হচ্ছে।’

অমিত শাহ লিখেছেন, ‘একের পর এক ভোটে হেরে কংগ্রেস হতাশা ও নৈরাশ্যে ডুবে গেছে। কুকথার রাজনীতি ছাড়া তাদের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। তারা নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের কাছেও গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে।’

বিজেপি সভাপতি নীতিন নবীন থেকে শুরু করে দলের মুখপাত্র সম্বিত পাত্র, সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুরেরা কংগ্রেস নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনা করেন। নীতিন নবীন বলেন, দেশের উন্নয়ন ও জনকল্যাণ নিয়ে কংগ্রেস ভাবে না। তারা শুধু কুমন্তব্য করতে জানে। ব্যক্তিগত আক্রমণের দিকে যায়।

সম্বিত পাত্র বলেন, দিনের পর দিন কংগ্রেসের কুকথা মাত্রা ছাড়াচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর মাকে নিয়ে তারা মশকরা করেছে, এবার প্রয়াত বাবাকেও টেনে আনল। অনুরাগ ঠাকুর বলেন, আজ থেকে নয়, সেই শুরুর দিন থেকেই কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রী মোদিকে অপদস্থ করে চলেছেন। কুকথা বলে অসম্মানিত করে যাচ্ছেন। এবার তা এক নতুন মাত্রা পেল।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও বিহারের বেগুসরাই লোকসভা জয়ী গিরিরাজ সিং বলেন, এভাবে গালিগালাজ করে মোদিকে সরানো যাবে না। নরেন্দ্র মোদি আগামী ৩০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকবেন।

বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট সিং, এনডিএ শরিক লোকজনশক্তি পার্টির নেতা চিরাগ পাসোয়ানও বিবৃতি দিয়ে কংগ্রেসের নিন্দা করেছেন। বিজেপি নেতাদের দাবি, কুমন্তব্য প্রত্যাহার করে কংগ্রেস সভাপতির উচিত নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়া।

কংগ্রেস যদিও বলেছে, তাদের সভায় লোক ঢুকিয়ে বিজেপি-আরএসএস গোলমালে প্ররোচনা দিচ্ছে। এভাবেই তারা বিরোধী নেতাদের মনোযোগ নষ্ট করে।

বিজেপি ঠিক করেছে, আজ সোমবার দেশের সব রাজ্যে, সব জেলায় দলীয় কার্যালয়ের সামনে নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা অশালীন মন্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমাপ্রার্থনার দাবিতে বিক্ষোভ দেখাবেন।

বিজেপি ও কংগ্রেস নেতাদের পারস্পরিক ‘কুমন্তব্য’ ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়। নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী, সে সময় অনেকেই তাঁকে ‘বুচার অব গুজরাট’ বা ‘গুজরাটের কসাই’ বলে অভিহিত করেছিলেন। গুজরাট দাঙ্গার কারণেই ওই সম্বোধন।

২০০৭ সালে গুজরাট বিধানসভা নির্বাচনের সময় কংগ্রেসনেত্রী সোনিয়া গান্ধী নেই বিশেষণই কিছুটা ঘুরিয়ে মোদিকে ‘মৌত কা সওদাগর’ বা ‘মৃত্যুর সওদাগর’ বলেছিলেন। সেই থেকে একের পর এক কংগ্রেস নেতা মোদিকে নানাভাবে অসম্মান করেছেন।

২০১৭ সালে মণিশংকর আয়ার মোদিকে ‘নিচ আদমি’ বা ‘নিচু মনের মানুষ’ বলেছিলেন। সে নিয়ে প্রচুর জলঘোলা হয়েছিল। মোদি নিজেই তা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছিলেন। নিজের ‘অনগ্রসর’ জাতের প্রসঙ্গ টেনে বলেছিলেন, কংগ্রেস তাঁকে জাত তুলে অসম্মান করেছে।

২০১২ সালে কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদিকে ‘রাবণের’ সঙ্গে তুলনা করে বলেছিলেন, অহংকার ত্যাগ না করলে তাঁর দশাও রাবণের মতো হবে। ২০১৪ সালে কংগ্রেস নেতা পি চিদম্বরম বলেছিলেন, মোদি একজন ‘কম্পালসিভ লায়ার’ বা অভ্যাসগত মিথ্যুক। মোদিকে চিদাম্বরম ‘এনকাউন্টার মুখ্যমন্ত্রীও’ বলেছিলেন।

‘অগ্নিবীর’ বিতর্কের সময় বিহারের কংগ্রেস নেতা সুবোধকান্ত সহায় বলেছিলেন, একনায়ক মোদির মৃত্যু হবে হিটলারের মতোই। ২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভার ভোটের প্রচারে মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেছিলেন, মোদি এক ‘বিষাক্ত সাপ’।

রাহুল গান্ধীও ছেড়ে দেননি মোদিকে। কংগ্রেস নেতা তাঁকে ‘চোরেদের সর্দার’ বলে অভিহিত করেছিলেন। সে নিয়ে মামলা মোকদ্দমাও হয়েছিল। মোদি নিজেকে দেশের ‘চৌকিদার’ বলেছিলেন। রাহুল সেই কথার রেশ টেনে বলেছিলেন, ‘চৌকিদার চোর হ্যায়’।

২০২৩ সালের কর্ণাটক বিধানসভার ভোটের আগে বিজেপির তথ্যপ্রযুক্তি সেলের প্রধান অমিত মালভিয়া এক তালিকা প্রকাশ করেছিলেন। তাতে দেখানো হয়েছিল, নরেন্দ্র মোদিকে কংগ্রেস ও বিরোধীরা ৯১ বার গালিগালাজ করেছেন। মোদিও বিভিন্ন জনসভায় বলতে শুরু করেন, দিনে তিনি ২ থেকে ৩ কেজি গালাগালি হজম করেন। ২০ বছর ধরে তিনি ‘গালি ডায়েটে’ রয়েছেন। এই গালিই তাঁর শক্তির উৎস।

‘কুকথার’ ইতিহাসে মোদিও জ্বলজ্বল করছেন। ২০০৪ সালে লালকৃষ্ণ আদভানির ‘ভারত উদয় যাত্রা’ চলাকালে এক জনসভায় সোনিয়া গান্ধীর বিদেশি বংশোদ্ভূত চরিত্র নিয়ে মোদি তাঁকে ‘জার্সি কাউ’ বা জার্সি গরু বলেছিলেন। তাঁর ছেলে রাহুলকে বলেছিলেন, ‘হাইব্রিড বাছুর’।

রাহুল গান্ধীকে ‘শাহি খানদান কে যুবরাজ’, ‘শেহজাদা’, ‘নামদার’, ‘পাপ্পু’ বলার পাশাপাশি সম্প্রতি তাঁকে ‘ব্যর্থ পণ্য’ বা ‘ফেইলড প্রোডাক্ট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ২০১২ সালে কংগ্রেস নেতা শশী থারুরের প্রয়াত স্ত্রী সুনন্দা পুষ্করকে ইঙ্গিত করে মোদি তাঁকে ‘৫০ কোটির গার্লফ্রেন্ড’ বলে কটাক্ষ করেছিলেন।

মল্লিকার্জুন খাড়গে মেজাজ হারিয়ে নরেন্দ্র মোদির ‘বাপ’ তুলে যা বলেছেন, তা গত আড়াই দশকের রাজনৈতিক রেষারেষি ও ‘কুকথারই’ ধারাবাহিকতা। ভারতীয় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক পরিসর দিন দিন কীভাবে কলুষিত হচ্ছে, কীভাবে শিষ্টাচার ও শালীনতা উবে যাচ্ছে এটা তার আরও এক নমুনা।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ