ভারতে তদন্তের মুখে টাটার আইফোন কারখানা

প্রতিবেদন:

·

, ,

অ্যাপলের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী ভারতের টাটা গ্রুপ। সম্প্রতি টাটার আইফোন যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যের কারণে ফসলি জমিতে দূষণ ও কৃষকদের মধ্যে চর্মরোগ দেখা দিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর পরপরই বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে স্থানীয় একটি রাজ্য স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

তিনজন সরকারি কর্মকর্তা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের পর্যালোচনা করা একটি দাপ্তরিক নথি থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

সূত্রমতে, গত ২৫ মে তামিলনাড়ু রাজ্যের হোসুরে অবস্থিত টাটা ইলেকট্রনিকসের এই প্ল্যান্টটিতে পার্শ্ববর্তী খামারের ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করার অভিযোগে রাজ্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড একটি সতর্কীকরণ নোটিশ পাঠিয়েছিল।

২০২১ সালে চালু হওয়া এই প্ল্যান্টটিতে আইফোনের ব্যাক কাভার বা পেছনের অংশসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। কৃষকদের ধারাবাহিক অভিযোগের পর গত মে মাসের শেষ দিক থেকে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা এই কারখানাটি নিয়ে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছেন।

প্ল্যান্টটি যে গ্রামে অবস্থিত, সেই উল্লুগুরুক্কাই গ্রামের সরকারি চিকিৎসা কর্মকর্তা অনিশ পারভিন হোসুরের ভেক্টর কন্ট্রোল অ্যান্ড জুনোসেস ইনস্টিটিউটে গত ২৭ মে একটি চিঠি পাঠান। রয়টার্সের হাতে আসা সেই চিঠিতে বলা হয়, টাটার কারখানা থেকে নির্গত বর্জ্যের কারণে এলাকায় ‘তীব্র দুর্গন্ধ’ ছড়াচ্ছে এবং পানি এতটাই দূষিত হয়েছে যে তা ‘পশুদের পানের অযোগ্য’ হয়ে পড়েছে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, টাটা ইলেকট্রনিকস থেকে নির্গত বর্জ্য পানি কাছের কৃষি জমিতে জমেছে এবং আশপাশের কুয়োর পরিষ্কার পানিকে দূষিত করছে। এই দূষণের কারণে মানুষজন চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন বলেও জানা গেছে। যদিও চিকিৎসাগতভাবে এখনো কোনো নির্দিষ্ট কেস প্রমাণিত হয়নি, তবে কৃষকদের কাছ থেকে চর্মরোগের বিস্তর অভিযোগ পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন অনিশ পারভিন।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা কৃষিজমি থেকে পানির দুটি নমুনা সংগ্রহ করে রাজ্য সরকারের গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য পাঠিয়েছিলেন। গত ৩০ মে জনস্বাস্থ্য ল্যাবরেটরির রিপোর্ট অনুযায়ী, সংগৃহীত দুটি নমুনায় ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতির পাওয়া গেছে, যা মূলত পয়োবর্জ্য বা মলমূত্রজনিত দূষণকে নির্দেশ করে।

ওই অঞ্চলের জনস্বাস্থ্য তদারককারী জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা রাজেশ কুমার সি জানিয়েছেন, স্বাস্থ্য দপ্তরের এই তদন্ত এখনো চলছে এবং দ্বিতীয় দফার পরীক্ষার ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।

এর আগে এপ্রিল মাসে দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড কারখানার কাছের দুটি খোলা কুয়ো থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করেছিল। সেখানে ‘টোটাল ডিজলভড সলিডস’ বা টিডিএসের (পানিতে দ্রবীভূত খনিজ, লবণ ও ধাতুর পরিমাণ) মাত্রা পাওয়া গেছে যথাক্রমে ১,০৮৪ এবং ১,২৮৬ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার। অথচ ব্যুরো অব ইন্ডিয়ান স্ট্যান্ডার্ডস (বিআইএস) অনুযায়ী, পানের পানির জন্য এই মাত্রা সর্বোচ্চ ৫০০ মিলিগ্রাম প্রতি লিটার হওয়া গ্রহণযোগ্য। অর্থাৎ, কারখানার আশপাশের কুয়োর পানিতে গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি ক্ষতিকর উপাদান রয়েছে।

চলতি সপ্তাহে টাটা ইলেকট্রনিকস এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড তাদের তদন্ত কার্যক্রম তুলে নিয়েছে কারণ কারখানা প্রাঙ্গণের ভেতর থেকে সংগৃহীত সাম্প্রতিক পানির নমুনা পরীক্ষায় কোনো দূষণ মেলেনি। তবে দূষণ নিয়ন্ত্রণ বোর্ড, তামিলনাড়ু সরকার কিংবা মূল প্রতিষ্ঠান অ্যাপল—কেউই এই বিষয়ে রয়টার্সের ইমেইল বা ফোনের আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি।

কারখানা সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, গত ডিসেম্বর মাসে কারখানার বর্জ্য শোধন কেন্দ্রে একটি পাম্প বিকল হয়ে যাওয়ার কারণে কিছু পয়োবর্জ্য তাদের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের পুকুরে চলে যায় এবং পরবর্তীতে তা উপচে বাইরের একটি হ্রদে গিয়ে মেশে। টাটা অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবে সেই ওভারফ্লো বন্ধ করে পাম্পটি মেরামত করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে।

রয়টার্সের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে কারখানা এলাকা পরিদর্শন করে দেখেছেন, খোলা কুয়োর পানি সম্পূর্ণ কালো রং ধারণ করেছে এবং কারখানার দেয়াল ঘেঁষে জমে থাকা পানি সবুজ ও শেওলাযুক্ত হয়ে আছে। ৪০ বছর বয়সী স্থানীয় কৃষক গুরুমূর্তি ভি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এই পানি দিয়ে বীজ বপন করলে চারা তো গজায়, কিন্তু কিছুদিন পরেই তা শুকিয়ে মরে যায়।’

এদিকে গত সোমবার স্থানীয় কৃষক দলের একজন সদস্য দূষিত পানি জমে থাকার ছবি তুলতে টাটার সীমানা প্রাচীর পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। এ সময় কারখানার একজন নিরাপত্তা কর্মী আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে তাঁকে বাধা দেন। তখন উত্তেজিত কৃষকেরা ‘আমাদের গুলি করো’ বলে চিৎকার শুরু করলে পরিস্থিতি থমথমে হয়ে ওঠে। তবে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

প্রসঙ্গত, চীন থেকে উৎপাদন সরিয়ে অ্যাপল এখন ভারতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করছে। বর্তমানে বিশ্বের মোট আইফোনের ২৬ শতাংশই ভারতে উৎপাদিত হচ্ছে। এমন একটি সময়ে গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প জায়ান্টের বিরুদ্ধে স্থানীয় দরিদ্র কৃষকদের জমি ও স্বাস্থ্য ধ্বংসের এই অভিযোগ বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে ভারতের পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা নীতিমালার কার্যকারিতাকে বড়সড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ