ফিলিস্তিনিদের টিকে থাকার লড়াই

প্রতিবেদন:

·

, ,

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের হামলায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত এবং ২৫১ জন অপহৃত হওয়ার জেরে শুরু হওয়া ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের ফলে বিধ্বস্ত হয়েছে গাজা। সেখানকার ২০ লাখ মানুষ চরম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। এদিকে ইসরাইলিরা দিনটিতে শোক পালন করছেন।

বুধবার (৭ অক্টোবর) দক্ষিণ ইসরায়েলের বিভিন্ন সড়ক ও আশ্রয়কেন্দ্রে শোক পালন করেছেন ইসরাইলিরা। এ ছাড়া তিন বছর আগে হামাস যেখানে হামলা চালিয়েছিল, সেই সংগীত উৎসবের স্থানে শোক পালন করেছেন তারা।

অন্যদিকে ফিলিস্তিনিদের জন্য বার্ষিকীটি নিয়ে এসেছে চরম দুর্দশা ও কষ্টের আরেকটি দিন। গাজায় ইসরাইলের পাল্টা অভিযানে সেখানে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। উপত্যকাটির ২০ লাখ মানুষের অধিকাংশই এখন অস্বাস্থ্যকর তাঁবুর নিচে বাস করছেন এবং উপত্যকার শহরগুলোর বড় একটি অংশ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অঞ্চলটির অর্ধেকেরও বেশি এলাকা ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দখলে রয়েছে এবং প্রায় এক বছর আগে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়া সত্ত্বেও প্রায় প্রতিদিনই ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে।

এই অঞ্চলের জন্য দিনটি গত তিন বছরে ঘটে যাওয়া এক বিস্ময়কর পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে। হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘাতের জেরে ইসরাইলি সেনারা দক্ষিণ লেবাননের একটি বড় অংশ দখল করে রেখেছে। হামাসের সমর্থনে ২০২৩ সালে ইসরাইলে হামলা শুরু করেছিল হিজবুল্লাহ।

এ ছাড়া ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র এমন এক দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে, যার ফলে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোতে হামলা হয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। এই সংঘাতের পেছনে ইসরাইলের ভূমিকা ছিল এবং গাজা যুদ্ধ সম্ভবত এর পথ প্রশস্ত করেছিল।

ইসরাইলের সামরিক অভিযানে এই সরু ভূখণ্ডটি বিধ্বস্ত হয়েছে এবং এর জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন; যাদের অনেকেই একাধিকবার বাস্তুচ্যুত হওয়ার শিকার। পণ্য ও ত্রাণ প্রবেশের ওপর বিধিনিষেধের কারণে সেখানে তীব্র খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মন্ত্রণালয় তাদের পরিসংখ্যানে বেসামরিক নাগরিক ও সশস্ত্র যোদ্ধাদের মধ্যে কোনো পার্থক্য না করলেও জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই ছিলেন নারী ও শিশু। হামাস-পরিচালিত সরকারের অংশ হওয়া সত্ত্বেও মন্ত্রণালয়ের এই পরিসংখ্যানকে জাতিসংঘ ও স্বতন্ত্র বিশেষজ্ঞরা সাধারণত নির্ভরযোগ্য বলেই মনে করেন।

১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির ফলে তীব্র লড়াই থেমে গেলেও ইসরাইলি হামলা অব্যাহত রয়েছে। ইসরাইল দাবি করছে, তারা হামাস যোদ্ধাদের লক্ষ্য করেই এসব হামলা চালাচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে গাজায় ১ হাজার ১৪৫ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। একই সময়ে সাতজন ইসরাইলি সেনাও নিহত হয়েছেন।

হামাস ৭ অক্টোবরের হামলাকে ইসরাইলের কয়েক দশকের সামরিক দখলদারত্ব, ভূমি বাজেয়াপ্তকরণ এবং বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে একটি প্রতিক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্য ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন এখন আরও সুদূরপরাহত বলে মনে হচ্ছে।

চলতি মাসের শেষের দিকে ইসরাইলে অনুষ্ঠেয় একটি বিতর্কিত নির্বাচন এবারের বার্ষিকীর প্রেক্ষাপটে এক বিশেষ প্রভাব ফেলছে। গত ৫ অক্টোবর দিবসটি উপলক্ষে ইসরাইলি সরকারের আনুষ্ঠানিক স্মরণসভা হয়। এই পৃথক স্মরণসভাগুলো প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি এবং সেই দিনের ব্যর্থতার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্তে তার অনীহা নিয়ে বিদ্যমান গভীর বিভাজনকেই নির্দেশ করে।

এই হামলার ফলে ধারাবাহিক ঘটনার সূত্রপাত হয়, যা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি করে। সিরিয়া ও লেবাননের বিশাল এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে ইসরাইল, যার ফলে ৩ লাখেরও বেশি লেবানিজ নাগরিক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রও ইসরাইলের সঙ্গে যোগ দিয়ে দুই দফায় ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর হামলা চালায়। এতে ইরান যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তেমনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহু দূরে অবস্থিত বিশ্ববাজারও অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

ইসরাইল-অধিকৃত পশ্চিম তীরেও সহিংসতা বেড়েছে। সেখানে ইসরাইলের কট্টর-ডানপন্থি সরকার বসতি স্থাপনকারীদের আরও বেপরোয়া ও সাহসী করে তুলেছে, যারা ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং তাদের সম্পত্তি ধ্বংস করছে। সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট