প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়তে নতুন রূপরেখা

প্রতিবেদন:

·

বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিতে এবার প্রযুক্তি খাতের ওপর সবচেয়ে বড় ভরসা রাখছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং টেলিকম খাতকে ‘থ্রাস্ট সেক্টর’ বা বিশেষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এর লক্ষ্য, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম মানবসম্পদে রূপান্তর করা।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, বর্তমানে জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ১ থেকে ২ শতাংশের মধ্যে থাকলেও আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এজন্য ডিজিটাল অবকাঠামো, উদ্ভাবন, গবেষণা, স্টার্টআপ এবং উন্নত প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ ও কর-প্রণোদনার ঘোষণা এসেছে এবারের বাজেটে।

এবারের প্রস্তাবিত বাজেটে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের জন্য ২ হাজার ৪৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। যা গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে ছিল ২ হাজার ৮৬৬ কোটি টাকা। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের জন্য ২ হাজার ১৪১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। অর্থাৎ আইসিটি এবং টেলিযোগাযোগ খাতের জন্য সম্মিলিতভাবে মূল বাজেটে সরাসরি বরাদ্দ থাকছে ৪ হাজার ১৯০ কোটি টাকা।

৫জি ও দ্রুতগতির ইন্টারনেটের যুগে প্রবেশ : বাজেটে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের কাছে ৫জি প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সারাদেশে ১০০ এমবিপিএস ব্রডব্যান্ড গতি নিশ্চিতের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে ‘ন্যাশনাল ফাইবার ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সুলভ মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণে সহায়তা করবে।

সাধারণ মানুষের যোগাযোগ ব্যয় কমাতে প্রতিটি সিম কার্ডের ওপর বিদ্যমান ৩০০ টাকা কর প্রত্যাহারের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। পাশাপাশি টেলিকম অপারেটরদের রেভিনিউ শেয়ারিং ও লাইসেন্স ফি-সংক্রান্ত উৎস কর তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা খাতটিতে নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে ভূমিকা রাখতে পারে।

এআই, রোবোটিক্স ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রস্তুতি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন বিশ্ব অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এই বাস্তবতায় সরকারি সেবা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং নগর ব্যবস্থাপনায় এআই ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত বাজেটে স্মার্ট সিটি গঠন, নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে এআইভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে এআই, সেমিকন্ডাক্টর, রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং এবং বিগ ডাটা অ্যানালাইসিস বিষয়ে বিশেষায়িত গবেষণাগার স্থাপনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

ডিজিটাল পরিচয় ও ক্যাশলেস অর্থনীতির পথে : ডিজিটাল সেবাকে আরও সহজ ও নিরাপদ করতে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে একজন নাগরিক একক ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণ এবং নিরাপদ আর্থিক লেনদেন করতে পারবেন।

ক্যাশলেস অর্থনীতি গড়ে তুলতে পয়েন্ট অব সেলস (পজ) মেশিনের আমদানিতে শুল্ক ও আগাম কর কমানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

স্টার্টআপ ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বড় প্রণোদনা : প্রযুক্তি উদ্যোক্তা তৈরিতে আগামী অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকার ‘স্টার্টআপ তহবিল’ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ভ্যাট অব্যাহতির সুবিধা বহাল রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

ফ্রিল্যান্সারদের জন্যও এসেছে বড় স্বস্তি। আইটি ফ্রিল্যান্সিং থেকে অর্জিত আয়ের কর অব্যাহতি সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে।

ইলেকট্রনিক্স ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নতুন সম্ভাবনা : সরকার আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে একটি বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে রূপান্তরের লক্ষ্য নিয়েছে। এজন্য ল্যাপটপ, কম্পিউটার, মোবাইল ফোন এবং এসএসডি উৎপাদনে ব্যবহৃত কাঁচামালের ওপর কর-সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিং খাতে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত বড় ধরনের শুল্ক ও কর অব্যাহতির ঘোষণা এসেছে।

এ ছাড়া গবেষণাকে সরাসরি বাণিজ্যিক সাফল্যের সঙ্গে যুক্ত করতে ‘রিসার্চ টু মার্কেট’ এবং ‘ইনোভেশন টু মার্কেট’ কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে ২০০ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দের প্রস্তাব রাখা হয়েছে।

প্রস্তাবিত বাজেট প্রসঙ্গে ট্রান্সমিশন ও টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠান ফাইবার@হোম লিমিটেড-এর চিফ টেকনোলজি অফিসার প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সুমন আহমেদ সাবির বলেন, অবকাঠামো উন্নয়ন, করছাড়, ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে এবারের বাজেট বাংলাদেশকে প্রযুক্তিনির্ভর ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গড়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে নেবে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে দ্রুত বাস্তবায়ন, দক্ষ জনবল তৈরি এবং নীতিগত ধারাবাহিকতার ওপর।

এই প্রযুক্তিবিদের মতে, এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের তরুণদের ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের জন্য প্রস্তুত করতে সহায়ক হবে। এসব সুবিধা তরুণদের উদ্যোক্তা ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে আরও উৎসাহিত করবে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ