ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ৯.৫০ শতাংশ রাখল বাংলাদেশ ব্যাংক

মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর সাথে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বর্তমান অবস্থা, ব্যাংক খাতের চাপ এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা বিবেচনায় নিয়ে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকের জন্য নীতি সুদহার নয় দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত রেখেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এবারই ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে মুদ্রানীতি ঘোষণা করল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলে আগের ছয় মাস পরপর মুদ্রানীতি ঘোষণার ব্যবস্থা থেকে সরে এসে অর্থনীতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে দ্রুত সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হলো।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রথম ত্রৈমাসিক মুদ্রানীতি বিবৃতি (এমপিএস) উপস্থাপন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ড. মো: হাবিবুর রহমান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

মুদ্রানীতি ঘোষণাকালে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং দেশী-বিদেশী ঝুঁকি এখনো রয়েছে। এ কারণে অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে নীতি সুদহার নয় দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি কমলেও তা স্থায়ীভাবে মূল্য স্থিতিশীলতার পর্যায়ে ফিরে আসার যথেষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তাই সতর্ক মুদ্রানীতি অবস্থান অব্যাহত রাখা হয়েছে।

ডেপুটি গভর্নর জানান, গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির (এমপিসি) ১৪তম সভায় নীতি সুদহার নয় দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। একইসাথে স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটির (এসএলএফ) সুদহার ১১ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটির (এসডিএফ) সুদহার সাত দশমিক ৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রয়েছে।

এর আগে, গত ২ আগস্ট থেকে নীতি সুদহার ৫০ ভিত্তি পয়েন্ট কমিয়ে নয় দশমিক ৫০ শতাংশ করা হয়েছিল।

ড. হাবিবুর রহমান বলেন, মূল্যস্ফীতির ভবিষ্যৎ গতিপথের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন কয়েকটি ঝুঁকি বাংলাদেশ ব্যাংক নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও সারের দামের অস্থিরতা, হরমুজ প্রণালি দিয়ে সমুদ্রপথে বাণিজ্যে সম্ভাব্য বিঘ্ন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব এবং জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা।

তিনি জানান, জুনে নয় দশমিক ১৬ শতাংশ থেকে আগস্টে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে আট দশমিক ২৬ শতাংশে নেমেছে। এটি ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন। মূলত খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমার কারণেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমেছে।

আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমে সাত দশমিক ০২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি নয় দশমিক ৩২ শতাংশে রয়ে গেছে।

ড. হাবিবুর রহমান বলেন, খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি এখনো বড় উদ্বেগের বিষয়। দেশের জ্বালানির দাম বাড়ায় পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এর ফলে অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ব্যয়জনিত মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রকৃত মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি চার দশমিক ১৪ শতাংশ হতে পারে বলে প্রাথমিক হিসাব পাওয়া গেছে। অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধি আরো কমে দুই দশমিক দুই শতাংশে নেমেছে।

এই সময়ে শিল্প উৎপাদন দশমিক ২৮ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে। শিল্প উৎপাদন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি সরবরাহ এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহসহ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন তাৎক্ষণিক সূচকেও শ্লথগতির চিত্র পাওয়া গেছে।

ডেপুটি গভর্নর বলেন, ঋণের উচ্চ ব্যয়, জ্বালানি সঙ্কট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দেশী-বিদেশী চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা অর্থনীতির পুনরুদ্ধারকে এখনো বাধাগ্রস্ত করছে।

তিনি বলেন, মুদ্রানীতির কার্যকারিতা বা নীতিগত সুদহারের পরিবর্তন বাজারে ঋণের সুদ ও ঋণপ্রবাহে কতটা প্রভাব ফেলছে, সেই সঞ্চালন প্রক্রিয়ায় ব্যাংক খাতের দুর্বলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে।

জুনে দেশের খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়ে ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে আগস্টে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র চার দশমিক ৭৫ শতাংশ। এতে বোঝা যায়, এর আগে নীতি সুদহার কমানো হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে তার উল্লেখযোগ্য প্রভাব এখনো পড়েনি।

ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ব্যাংকিং খাতে তারল্য পরিস্থিতি ও অর্থবাজারের সুদহারে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে ঋণঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংকগুলো তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি সিকিউরিটিজে বিনিয়োগের দিকে বেশি ঝুঁকছে।

উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বাড়াতে শুধু মুদ্রানীতির পদক্ষেপ যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ব্যাংক খাতের পুনর্গঠন, মূলধন পুনর্গঠন, সুশাসন জোরদার এবং ঋণ প্রদানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা মুদ্রানীতির কার্যকর সঞ্চালন নিশ্চিত করার জন্য অপরিহার্য।

উৎপাদনশীল খাতকে সহায়তা দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেন ডেপুটি গভর্নর।

তিনি জানান, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্রণোদনা প্যাকেজ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এর মধ্যে বন্ধ হয়ে যাওয়া শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর জন্য নির্দিষ্টভাবে ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

এছাড়া কৃষি, কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (সিএমএসএমই) এবং রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার জন্য পুনঃঅর্থায়ন সুবিধাও জোরদার করা হয়েছে।

বৈদেশিক খাতের পরিস্থিতি তুলে ধরে ড. হাবিবুর রহমান বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের সামগ্রিক লেনদেনের ভারসাম্যে (ব্যালান্স অব পেমেন্টস) ছয় দশমিক ছয় বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত ছিল। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে আর্থিক হিসাবে নিট অর্থপ্রবাহের কারণে সামগ্রিক লেনদেন ভারসাম্য ঘাটতিতে পড়েছে।

তিনি বলেন, বৈদেশিক খাতে এখনো রেমিট্যান্স গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯০ শতাংশ।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত শক্তিশালী করতে এবং আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতির চাপ কমাতে সহায়তা করেছে বলে জানান তিনি।

ডেপুটি গভর্নর বলেন, অর্থনীতির তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি পরিচালনা করবে। একইসাথে মূল্যস্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টেকসই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সহায়তা করার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।

তিনি বলেন, দেশী ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে সামষ্টিক অর্থনৈতিক ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এদিকে বিশ্বব্যাংক চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি চার দশমিক ছয় শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের পূর্বাভাস চার দশমিক তিন শতাংশ থেকে কমিয়ে তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ করেছে।