চর্বি কমে গেলেও বাড়তে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি: গবেষণা

প্রতিবেদন:

·

, ,

সাধারণভাবে শরীরের মেদ বা চর্বিকে (ফ্যাট) স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর মনে করা হয়। অনেকেই ভাবেন, চর্বির পরিমাণ যত কম হবে, শরীর তত বেশি সুস্থ থাকবে।

অতিরিক্ত ওজন, হৃদরোগ কিংবা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের জন্য অতিরিক্ত চর্বি দায়ী—এ কথা সত্যি হলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, সব চর্বি ক্ষতিকর নয়। বরং সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য শরীরের নির্দিষ্ট কিছু ভালো বা কার্যকর ফ্যাট টিস্যুর অত্যন্ত প্রয়োজন।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন একটি গবেষণায় দেখা গেছে, শরীর থেকে এই ‘উপকারী’ চর্বি কমে গেলে অজান্তেই বৃদ্ধি পেতে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি। গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ডায়াবেটিস শুধু অতিরিক্ত মেদের কারণেই হয় না; বরং কোনো রোগের কারণে উপকারী ফ্যাট টিস্যু ক্ষতিগ্রস্ত বা উধাও হয়ে গেলেও এই রোগ থাবা বসাতে পারে।

নিচে বিষয়টির বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরা হলো। ভালো চর্বি কেন শরীরের জন্য জরুরি?

আমাদের শরীরের ফ্যাট টিস্যু (অ্যাডিপোজ টিস্যু) কেবল অতিরিক্ত ক্যালরি জমিয়ে রাখে না, এটি একটি সক্রিয় অঙ্গের মতো কাজ করে। রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ, হরমোন নিঃসরণ এবং প্রদাহ দূর করতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভালো ফ্যাট সেলগুলো খাবার থেকে আসা অতিরিক্ত মেদ নিরাপদে নিজের মধ্যে জমা রাখে। এর ফলে লিভার, মাংসপেশি বা অগ্ন্যাশয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে ক্ষতিকর চর্বি জমতে পারে না এবং শরীর ইনসুলিনের প্রতি সঠিকভাবে সাড়া দেয়।

সুস্থ চর্বি কমে গেলে শরীরে কী ঘটে?গবেষকেরা ‘ফ্যামিলিয়াল পারশিয়াল লিপোডিস্ট্রোফি টাইপ ২’ নামের একটি বিরল জিনগত রোগ নিয়ে গবেষণা করেন। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শরীর থেকে ধীরে ধীরে ভালো চর্বি উধাও হয়ে যায়। ফলে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজন না থাকা সত্ত্বেও তারা ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার এবং রক্তে অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় উপাদানের সমস্যায় ভোগেন।

রোগীদের ফ্যাট টিস্যু পরীক্ষা করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, চর্বি কোষগুলো বিলুপ্ত হওয়ার অনেক আগেই তা ক্ষতিগ্রস্ত ও অকার্যকর হতে শুরু করে।

ফ্যাট সেল ধ্বংস হওয়ার ৩টি ধাপ

গবেষণায় দেখা গেছে, ফ্যাট সেল ধ্বংস হওয়ার পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:

১. ফ্যাট সংরক্ষণে অক্ষমতা: চর্বি কোষগুলো ধীরে ধীরে চর্বি জমা রাখার স্বাভাবিক ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ২. প্রদাহ সৃষ্টি: ফ্যাট টিস্যুর মধ্যে প্রদাহের সৃষ্টি হয় এবং ইমিউন কোষগুলো অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ফ্যাট সেলগুলোকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।

৩. মাইটোকন্ড্রিয়ার অকার্যকারিতা: কোষের শক্তি উৎপাদনকারী কেন্দ্র ‘মাইটোকন্ড্রিয়া’ কাজ করা বন্ধ করে দেয়। ফলে শক্তির অভাবে ফ্যাট সেলগুলো শুকিয়ে উধাও হয়ে যায়।

কীভাবে এটি ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দেয়?

সুস্থ ফ্যাট সেলগুলো নষ্ট হয়ে গেলে মেদ আর নিরাপদে জমা থাকতে পারে না। তখন এগুলো লিভার ও পেশিতে গিয়ে জমতে শুরু করে, যা ইনসুলিনের স্বাভাবিক কাজে বাধা দেয়। ফলে রক্ত থেকে গ্লুকোজ কোষে প্রবেশ করতে পারে না।

এ ছাড়া, উপকারী ফ্যাট টিস্যু থেকে নিঃসৃত হরমোন কমতে থাকায় ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়—এমনকি ব্যক্তি শারীরিকভাবে মোটা না হলেও।এতদিন মনে করা হতো ডায়াবেটিস মূলত স্থূলতা এবং অগ্ন্যাশয়ের বিটা সেলের সমস্যার কারণে হয়। তবে এই গবেষণা প্রমাণ করল যে, ভালো ফ্যাট সেলের মান ও কার্যকারিতা ডায়াবেটিস প্রতিরোধে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ওজন কমানো কি তবে ঝুঁকিপূর্ণ?

না, সুস্থ উপায়ে ওজন কমানো একদমই ক্ষতিকর নয়। অতিরিক্ত ওজনের ব্যক্তিদের জন্য সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুমের মাধ্যমে বাড়তি মেদ ঝরানো এখনো ডায়াবেটিস ও হৃদরোগ প্রতিরোধের সেরা উপায়।

গবেষণার মূল বার্তা হলো—রোগ বা জিনগত সমস্যার কারণে ফ্যাট সেলের যে ক্ষতি হয় তা প্রতিরোধ করা, সাধারণ স্বাস্থ্যকর ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে নিরুৎসাহিত করা নয়।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ