ইউরোপে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বাড়ছে মুসলিমদের

ইউরোপে ইসলামকে ঘিরে আতঙ্ক ক্রমেই বাড়ছে। ইউরোপের কয়েকটি দেশে এখন প্রায় অর্ধেক মানুষ মনে করেন, ইসলাম পশ্চিমা মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ৬ সেপ্টেম্বর জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে পপুলিস্ট ডানপন্থি দল অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি ৪৪ শতাংশ ভোট পায়। দলটি ‘ইসলামায়ন’-এর বিরুদ্ধে সতর্ক করে এবং ব্যাপক হারে অভিবাসী ফেরত পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দেয়। একই সময়ে ব্রিটেনের ডোভারে শত শত মুখোশধারী ব্যক্তি ‘বোট বন্ধ করো’ এবং ‘খ্রিস্ট রাজা’ স্লোগান দেয়। ফ্রান্সে মেরিন লে পেনের প্রকাশ্য স্থানে ইসলামি হিজাব নিষিদ্ধ করার আহ্বানও উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন পেয়েছে।

ইসলাম নিয়ে এই আতঙ্ক শুধু ইউরোপে সীমাবদ্ধ নেই; যুক্তরাষ্ট্রেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। তবে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর যে ধরনের সন্ত্রাসবাদভিত্তিক ভয় প্রধান ছিল, এখন তার জায়গায় একটি নতুন ধারণা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে—ইসলাম নাকি ইউরোপের ভেতর থেকেই ইউরোপকে দখল করে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন সদস্যও ‘সভ্যতার বিলুপ্তি’ বা ‘সিভিলাইজেশনাল ইরেজার’-এর মতো ভাষা ব্যবহার করেছেন। এই ধারণা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

বাস্তবে ইউরোপে ইসলামের কোনো ‘দখল’ বা মুসলমানদের ব্যাপক উগ্রপন্থায় পরিণত হওয়ার ঘটনা ঘটছে না। ইউরোপীয় সংস্কৃতিও মুছে যাচ্ছে না। ইউরোপে ‘নো-গো জোন’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, শরিয়াহ জাতীয় আইনে ঢুকে পড়ছে কিংবা কোনো পরিকল্পিত ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ বা বৃহৎ জনসংখ্যাগত প্রতিস্থাপন চলছে—এমন দাবিরও বাস্তব ভিত্তি নেই।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসলামপন্থিদের কোনো ভুল-ত্রুটি নেই। ইউরোপের প্রকৃত ঝুঁকি দুটি ধরন থেকে আসছে—একদিকে রাষ্ট্রকে ইসলামি নীতির অধীন করার রাজনৈতিক মতাদর্শ, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভর উগ্র ডানপন্থি ইসলামভীতি।ইউরোপের বামপন্থিরা ইসলামিজমের বাস্তব কিন্তু সীমিত হুমকিকে অস্বীকার করে সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে। একইভাবে মধ্যপন্থি রাজনীতিকরা বর্ণবাদের অভিযোগের আশঙ্কায় অনেক সময় নীরব থাকেন।

ইউরোপের জনসংখ্যার হিসাব দিয়ে ‘ইসলামি দখল’-এর ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ । সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশগুলো থেকে অভিবাসন বেড়ে গেলেও ইউরোপের ৫০ কোটির বেশি মানুষের মধ্যে মুসলমানের সংখ্যা প্রায় ৬ শতাংশ। নতুন অভিবাসীদের সন্তানসংখ্যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তুলনায় বেশি হলেও প্রজন্মের সঙ্গে তাদের জন্মহার সাধারণত স্থানীয়দের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে ইউরোপের সভ্যতা বা সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাস্তবসম্মত নয়।

অন্যদিকে অধিকাংশ মুসলিম অভিবাসী তাদের নতুন দেশে নিজেদের জীবন প্রতিষ্ঠা করতে চান, সেই দেশকে তারা পূর্বের সমাজব্যবস্থায় রূপান্তর করতে চান—এমন ধারণারও সমর্থন নেই। তাদের সন্তানরা অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের চেয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে ভালো করছে। উদাহরণ হিসেবে ব্রিটেনের বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২১ সালে ব্রিটেনে মানসম্মত পরীক্ষায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ ১৯ বছর বয়সের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিল; শ্বেতাঙ্গ ব্রিটিশদের ক্ষেত্রে এ হার ছিল ৩৮ শতাংশ। ব্রিটিশ রাজনীতিতেও মুসলিমদের অংশগ্রহণ বেড়েছে—দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও লন্ডনের মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে মুসলিমরা রয়েছেন।

মুসলিমদের অনেক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি অন্যান্য ইউরোপীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে বেশ মিল রয়েছে। ব্রিটিশ মুসলমানদের ওপর পরিচালিত একটি জরিপে নারীদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণের বিষয়ে বড় ধরনের বিরোধিতা পাওয়া যায়নি বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম পরিচয় থাকা মানেই ইউরোপীয় সমাজের মূলধারার মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘাত—এমন সরলীকরণ যথার্থ নয়।

তাহলে কেন ইউরোপের এত মানুষ ইসলামের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে— এই প্রশ্নও ওঠেছে। এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকার কথা এসেছে। বিশেষ করে ইলন মাস্ক তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করেছেন এবং ইউরোপের ইসলামবিরোধী ডানপন্থী শক্তিগুলোকে উত্সাহিত করেছেন। ব্রিটিশ ইসলামবিরোধী কর্মী টমি রবিনসনের প্রসঙ্গও এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

পপুলিস্ট ডানপন্থীদের প্রস্তাবিত সমাধানগুলো নিজেরাই সমস্যাকে আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। ব্যাপক অভিবাসী বহিষ্কার, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পোশাক নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ মুসলমানদের মধ্যে ভয় সৃষ্টি করতে পারে, তাদের সমাজের মূলধারা থেকে আরো দূরে সরিয়ে দিতে পারে এবং উগ্রপন্থীদের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অর্থাৎ ইসলামিজমের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে এমন নীতি গ্রহণ করা উচিত নয়, যা শেষ পর্যন্ত একই ধরনের বিভাজনকে আরো গভীর করে।

এ কারণে ইউরোপের মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য পরামর্শ হলো—সহিংসতা ও সহিংসতার হুমকির বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার নামে কোনো বিষয়কে আলোচনার বাইরে রাখা যাবে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সহনশীলতার শত্রু নয়; বরং সেটিই সহনশীলতার পূর্বশর্ত। একই সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক গোষ্ঠীর গোপন অনুপ্রবেশ বা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা থাকলে তা প্রকাশ্যে আনতে হবে, আবার একইভাবে ধর্মীয় বা জাতিগত বিদ্বেষকেও মোকাবিলা করতে হবে।

তথ্যের গুরুত্বের ওপরও জোর দিয়েছে। সরকারের কাছে অভিবাসন, জনসংখ্যা ও সামাজিক পরিবর্তন সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য থাকা এবং তা প্রকাশ করা জরুরি। কারণ সরকার তথ্য সংগ্রহ বা প্রকাশে অনীহা দেখালে সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয় অনুমান, অতিরঞ্জন ও ষড়যন্ত্রের নানা তত্ত্ব।

ইউরোপের মুসলমানরা ধীরে ধীরে সমাজের সঙ্গে একীভূত হচ্ছে। অতীতে ইউরোপে ক্যাথলিক, ইহুদি ও ক্যারিবীয় অভিবাসীদের নিয়েও একই ধরনের সামাজিক আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল—তারা আদৌ নতুন সমাজে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সময়ের সঙ্গে এসব জনগোষ্ঠী ইউরোপীয় সমাজের অংশ হয়ে উঠেছে। মুসলমানদের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া ঘটতে পারে—যদি বিভাজন, চরমপন্থা ও অযৌক্তিক আতঙ্ক সেই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত না করে।

ইসলাম নিজে ইউরোপের জন্য কোনো অস্তিত্বগত হুমকি নয়; কিন্তু ইসলামিজমের উগ্র রাজনৈতিক রূপ এবং ইসলামভিত্তিক অযৌক্তিক ভয়—দুটিই ইউরোপের উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে ইসলামকে ঘিরে অতিরঞ্জিত ‘ইউরোপ দখল’, ‘গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ বা ‘শরিয়াহর মাধ্যমে ইউরোপের পতন’-এর মতো ধারণাগুলোকেও তথ্যের ভিত্তিতে প্রত্যাখ্যান করা প্রয়োজন।