লেখক: মোঃ সাইফুল ইসলাম সুজন, শিক্ষক ও গবেষক
কোনো রক্তক্ষয়ী রাজনৈতিক ঘটনাকে শুধু ‘ট্র্যাজেডি’ বলে বর্ণনা করলে তার ভেতরের অপরাধ, দায় ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আড়াল হয়ে যেতে পারে। এই নিবন্ধের যুক্তি হলো, ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরের লগি-বৈঠার ঘটনাকে ‘ট্র্যাজেডি’ বলে নরম করে দেখার বদলে তার সহিংসতা, মানবিক ক্ষতি ও রাজনৈতিক বয়ান নিয়ে প্রশ্ন করা দরকার।
ঘটনার নামকরণও রাজনৈতিক
সমসাময়িক প্রতিবেদনে ২৮ অক্টোবর ঢাকার পল্টন এলাকায় আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামী ও পুলিশের সংঘর্ষে নিহত ও আহতের কথা এসেছে। একটি সমসাময়িক প্রতিবেদনে অন্তত চারজন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহতের কথা বলা হয়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২০০৬ সালের পর্যালোচনায় ওই অক্টোবরের রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৮ জন নিহত ও বহু আহতের কথা বলা হয়েছে। সংখ্যার পার্থক্য দেখায়, বিভিন্ন হিসাবকে এক করে ফেলা যায় না।
লেখক মনে করেন, প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষকে পিটিয়ে হত্যা এবং লাশের ওপর উল্লাসের অভিযোগকে সাধারণ বিয়োগান্ত ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করলে অপরাধের মাত্রা কমিয়ে দেখা হয়। তিনি একে রাজনৈতিক সহিংসতা ও অমানবিকীকরণের ভাষার সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এই মূল্যায়নটি লেখকের মতামত, আদালতের রায় নয়।
রুয়ান্ডার তুলনা
রুয়ান্ডার ১৯৯৪ সালের গণহত্যায় তুতসিদের অমানবিক করে দেখাতে ‘তেলাপোকা’ ও ‘সাপ’-এর মতো ঘৃণাসূচক শব্দ ব্যবহারের ইতিহাস রয়েছে। জাতিসংঘের রুয়ান্ডা-বিষয়ক উপকরণে ৭ এপ্রিলকে তুতসি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালের গণহত্যার স্মরণ দিবস বলা হয়েছে।
লেখক এই ইতিহাসের সঙ্গে ২৮ অক্টোবরের ঘটনায় প্রতিপক্ষকে ‘সাপের মতো’ পেটানোর ভাষা ও দৃশ্যের তুলনা করেছেন। এটি একটি রাজনৈতিক-মনস্তাত্ত্বিক তুলনা; ২৮ অক্টোবরকে রুয়ান্ডার গণহত্যার সমতুল্য বলে কোনো আদালতের সিদ্ধান্ত নয়।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডার মিডিয়া কেসে ঘৃণাত্মক বক্তব্য ও গণহত্যায় উসকানির ভূমিকা নিয়ে বিচার করেছে। সেই আইনি নজির বাংলাদেশের ২৮ অক্টোবরের ওপর সরাসরি প্রযোজ্য—এমন দাবি করতে হলে আলাদা আইনি বিশ্লেষণ দরকার।
ট্র্যাজেডি, কারবালা ও হ্যামলেট
লেখকের মতে, ২৮ অক্টোবরের প্রকাশ্য সহিংসতার দৃশ্য করুণার পাশাপাশি ট্রমা, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। তাই তিনি ‘ট্র্যাজেডি’ শব্দের পরিবর্তে রাজনৈতিক সহিংসতার ভাষা ব্যবহার করতে চান। কারবালা, বিষাদ-সিন্ধু ও হ্যামলেটের উদাহরণ দিয়ে তিনি শোক, মর্যাদা, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং প্রতিপক্ষকে অমানবিক করার পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছেন।
ইতিহাসের দায়
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২০১৮ সালের সিদ্ধান্ত A/DEC/72/550 ৭ এপ্রিলকে ‘তুতসিদের বিরুদ্ধে ১৯৯৪ সালের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্মরণ দিবস’ হিসেবে নির্ধারণ করে। মূল খসড়ায় এই সিদ্ধান্তের নম্বর ভুল ছিল; এখানে তা সংশোধন করা হয়েছে।
লেখকের মতে, ২৮ অক্টোবরকে এমনভাবে ইতিহাসে রাখা উচিত নয় যাতে পরিকল্পনা, সহিংসতা ও দায়ের প্রশ্ন হারিয়ে যায়। তিনি একে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায় হিসেবে দেখেছেন। এই ভাষা তাঁর মতামতের অংশ। কোনো ঘটনার নামকরণ একা বিচার নয়; বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নথি, সাক্ষ্য, তদন্ত ও আদালতের প্রক্রিয়া দরকার।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ