মতামত

  • শিক্ষার মানোন্নয়ন কেন জরুরি

    শিক্ষার মানোন্নয়ন কেন জরুরি

    বর্তমানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা উদ্বেগজনক সংকটের আবর্তে নিপতিত। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিশেষত বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনসমূহ আমাদের চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিতেছে এক রূঢ় ও অপ্রিয় সত্য। তাহাদের মতে, বাংলাদেশে শিক্ষার হার কাগজে কলমে বৃদ্ধি পাইলেও গুণমানের দিক হইতে পশ্চাৎপদ। ইহা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, একজন উচ্চমাধ্যমিক উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীর লব্ধ জ্ঞান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে মাত্র সপ্তম শ্রেণির সমতুল্য বলিয়া বিবেচিত হইতেছে। এই যে বিশাল ‘শিক্ষণ ঘাটতি’, ইহাতে জাতির মেরুদণ্ড ভাঙিয়া পড়িবার উপক্রম বলিলে কি অত্যুক্তি হইবে?

    শিক্ষার মানে এই অধোগতির মূলে রহিয়াছে বহুবিধ কারণ। প্রথমত, মানসম্মত শিক্ষার প্রধান অন্তরায় হইল দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষকের অভাব। ইউনেস্কোর এক তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় মাধ্যমিক স্তরে দক্ষ শিক্ষকের হারে বাংলাদেশ অবস্থান করিতেছে সর্বনিম্নে। কারণ এই স্তরে ৫৫ শতাংশ শিক্ষক পূরণ করিতে পারিতেছেন না ন্যূনতম দক্ষতার মান। তাহা ছাড়া শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, দলীয় রাজনৈতিক প্রভাব এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব এই সংকটকে করিয়াছে আরও ঘনীভূত। দ্বিতীয়ত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আজ কেবল ‘সার্টিফিকেট’-সর্বস্ব হইয়া পড়িয়াছে। পরীক্ষার জন্য পড়া নাকি পড়ার জন্য পরীক্ষা-ইহাই হইয়া উঠিয়াছে বড় প্রশ্ন। একমুখী শিক্ষার অভাবে তৈরি হইয়াছে বিশৃঙ্খলা। বেসরকারিকরণের মূল লক্ষ্য-উদ্দেশ্য অনুধাবন করিতে না পারিবার কারণে বৃদ্ধি পাইয়াছে ইহার বাণিজ্যিকীকরণ। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি হইয়াছে অব্যবস্থাপনা। বেসিক শিক্ষা বলিতে গেলে আজ খুবই অবহেলিত। আগের মতো শিক্ষকদের শিখানোর প্রতি আগ্রহ ও আন্তরিকতা তেমন নাই। বেসরকারি শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের উপর চাপ ক্রমবর্ধমান। কোচিং, প্রাইভেট টিউটর দিয়াও কুলানো যায় না; কিন্তু কেন, সেই প্রশ্ন কি কেহ করিতেছেন? শিক্ষাবাণিজ্যের কদর্য রূপ লক্ষণীয়। আদর্শ শিক্ষকের সংকট সর্বত্র। ইহা ছাড়া জীবনমুখী ও বাস্তবধর্মী শিক্ষা অনেকটাই অনুপস্থিত। শিক্ষার্থীরা ঘুরপাক খাইতেছে জিপিএ-৫ লাভের গোলকধাঁধায়। ফলে উচ্চশিক্ষিত বেকারগোষ্ঠী গড়িয়া উঠিলেও কর্মবাজারের চাহিদা অনুযায়ী তৈরি হইতেছে না দক্ষ জনশক্তি।

    শিক্ষাব্যবস্থার এই কাঠামোগত ও দৃষ্টিভঙ্গিগত ব্যর্থতা হইতে উত্তরণ আজ সময়ের দাবি। প্রথমত, নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করিয়া মেধা ও স্বচ্ছতার ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হইবে। নিশ্চিত করিতে হইবে শিক্ষকদের পর্যাপ্ত বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষাব্যবস্থাকে একমুখী ও ৯০ শতাংশ সরকারি করা উচিত। মাত্র ১০ শতাংশ থাকিতে পারে বেসরকারি ও দাতব্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমরা মনে করি, শিক্ষকের মানোন্নয়নই শিক্ষার মানোন্নয়নের সর্বশ্রেষ্ঠ পথ। তাই তাহাদের মানসম্মত বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থাকে রাজনীতির সংকীর্ণ গণ্ডি হইতে মুক্ত করিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় শিক্ষানীতির অধীনে আনিতে হইবে। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যেন শিক্ষানীতি বা পাঠ্যসূচির আমূল পরিবর্তন না ঘটে, তাহা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে পাঠ্যদক্ষতার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করিতে হইবে।

    চতুর্থত, শিক্ষা ও শ্রমবাজারের মধ্যে একটি সুদৃঢ় সংযোগ স্থাপন করিতে হইবে। তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এখন অনিবার্য হইয়া পড়িয়াছে। গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের মান তদারকির মাধ্যমে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে আমাদের অবস্থান সুসংহত করিতে হইবে।সত্যি বলিতে কি-বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়াইয়া আছে। কেবল পাশের হারের ‘সস্তা পরিসংখ্যান’ দিয়া জাতির প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নহে। আমাদের এই কথা অনুধাবন করিতে হইবে যে, একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে গুণগত শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। মূলত আমাদের জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থা হইতে হইবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়সংগত ও জীবনব্যাপী শেখার সুযোগ প্রদানকারী। কারিকুলামকে আউটকাম ও কমপিটেন্সি বেজড করিয়া শিক্ষার্থীদের বাস্তব দক্ষতা অর্জনে সহায়ক করিয়া তুলিতে হইবে।

  • দিবস আসে শ্রমিকদের ভাগ্য খোলে না

    দিবস আসে শ্রমিকদের ভাগ্য খোলে না

    ফিচার ডেস্ক:

    রমজানের ঈদের ঠিক ১০ দিন পর কুড়িগ্রামে যাই। সকালে অনেকের কথাবার্তায় ঘুম ভাঙে। উঠে দেখি পাশের ফ্ল্যাটে কাজ চলছে—নতুন ভবন তৈরি হবে। একই সঙ্গে কয়েকজন নারী ও পুরুষ কাজ করছেন। আমি এগিয়ে গিয়ে কাজ ও মজুরি সম্পর্কে জানতে চাই। দু-তিনজনকে জিজ্ঞেস করলেও তারা এড়িয়ে যান। একজন তো ইশারায় পাশের এক পুরুষকে দেখান। বুঝতে পারি, কথা বললে সমস্যা হতে পারে। আমিও সুযোগের অপেক্ষায় থাকি।

    অতঃপর মাথায় বোঝা নিয়েই একজন নারী চুপিচুপি বললেন, তাদের (নারীদের) দৈনিক মজুরি ৪০০ টাকা আর পুরুষদের ৫০০। তিনি আবার ইশারা করে বোঝালেন, কথা বললে তিনি বিষয়টি জানিয়ে দেবেন। ভাবলাম, পার্থক্যটা মাত্র ১০০ টাকা। অনেক জায়গায় নারীদের আরো কম মজুরি দেওয়া হয়। তাদের ধারণা, নারীরা কম কাজ করেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের কাজের পরিমাণ পুরুষদের চেয়েও বেশি।খালেদা একজন সেবিকা (নার্স)। তিনি কয়েকটি হাসপাতালে ধারাবাহিকভাবে সেবিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করায় তার দুই সন্তান তার কাছেই থাকে। কিছুদিন সন্তানরা গ্রামে নানাবাড়িতে থাকলেও পড়াশোনার কথা চিন্তা করে তিনি তাদের শহরে নিয়ে আসেন।

    খালেদা বর্তমানে একজন সিনিয়র সেবিকা। তিনি একটি নতুন ও নামকরা হাসপাতালে কর্মরত। নতুন হাসপাতাল হওয়ায় সেখানে অনেক সেবিকা নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে নামকরা হাসপাতাল থেকে আসা সেবিকাদের বেতন তার বেতনের চেয়ে দ্বিগুণ। অথচ খালেদার অভিজ্ঞতাও আছে এবং তিনি সিনিয়র।

    অন্যদের বেতনের পরিমাণ শুনে তিনি অবাক হন। এ বিষয়ে অফিসে কথা বললে তাকে বেতন বাড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়। দুই মাস পর তার বেতন বাড়ানো হলেও, সেই নামকরা হাসপাতাল থেকে আসা সেবিকাদের বেতন আরো দ্বিগুণ হারে বৃদ্ধি করা হয়।

    পরে অফিসে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে খালেদা নিজের চাকরি হারান। খালেদার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের কাছে অনেকের সিভি রয়েছে; তাকে যে বেতন দেওয়া হয়, সেই বেতনে তারা নতুন দুজন কর্মী নিয়োগ দিতে পারবে।

    নন-এমপিওভুক্ত একটি স্কুলে চার বছর ধরে চাকরি করেন দিলারা। এরই মধ্যে তার বিয়ে হয়। সন্তান জন্মের সময় ঘনিয়ে এলে তিনি দুশ্চিন্তায় পড়েন—ছুটিতে গেলে চাকরিটি থাকবে তো? পরে তিনি জানতে পারেন, স্কুল থেকে তিনি তিন মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন। তবে ছুটি শেষে কাজে যোগ দিতে পারলেও সেই সময়ের কোনো বেতন পাবেন না; আগের বেতনে চাকরি চালিয়ে যেতে হবে।

    সব দিক বিবেচনা করে তিনি ভাবলেন, খারাপের মধ্যেও কিছুটা ভালো আছে। সেই অনুযায়ী তিনি ছুটিতে যান এবং তিন মাস পর আবার কাজে যোগ দেন। ঘরে মা থাকায় সন্তানের দেখাশোনার দায়িত্ব মায়ের ওপর দিয়ে তিনি চাকরিতে ফিরতে সক্ষম হন।

    তবে দিলারার মতো সুযোগ তামান্না পাননি। তিন মাসের সন্তান রেখে কাজে ফেরার মতো পরিস্থিতি তার ছিল না। ফলে তিনি চাকরিতে ফিরতে পারেননি। পরে দুই বছর পর নতুন বেতনে (অর্থাৎ, শুরুতে যে বেতন দেওয়া হয়) তিনি একই স্কুলে আবার যোগ দেন।

    একজন নিয়োগদাতার অধীনে যারা শ্রম দেন, তারা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত। অথচ আমাদের দেশে বেশির ভাগ নিয়োগদাতাই এই শ্রম আইনের অনেক কিছুই মানেন না। শ্রমিকদের একটি বড় অংশও তাদের শ্রম ও মজুরি-সংক্রান্ত অধিকার সম্পর্কে অবগত নন।

    বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, ‘শ্রমিক নিয়োগ, মালিক ও শ্রমিকের সম্পর্ক, সর্বনিম্ন মজুরি নির্ধারণ, মজুরি পরিশোধ, কর্মস্থলে দুর্ঘটনাজনিত কারণে শ্রমিকের আঘাতের জন্য ক্ষতিপূরণ, ট্রেড ইউনিয়ন গঠন, শিল্পবিরোধ সৃষ্টি ও নিষ্পত্তি, শ্রমিকের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, কল্যাণ, চাকরির পরিবেশ এবং শিক্ষানবিসসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়—সবই শ্রম আইনের অন্তর্ভুক্ত।’

    প্রতিবছর মে দিবস পালিত হয়। তিনশ পঁয়ষট্টি-ছেষট্টি দিনের মধ্যে মাত্র এক দিনই মে দিবস, কিন্তু যাদের দাবি আদায় ও অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলতে এই দিবস পালিত হয়, তারা প্রতিদিনই মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। কারখানার মালিক, বিলাসবহুল কোম্পানির শিল্পপতি এবং রাজনৈতিক নেতারা মে দিবসে সমাবেশে দীর্ঘ ভাষণ দিয়ে শ্রমিকদের দাবি পূরণের কথা বলে হাততালি পান; কিন্তু সারা বছর শ্রমিকদের শ্রমের ন্যায্য মূল্য দিতে গিয়ে তারা নানা অজুহাত তুলে ধরেন।

    আইন থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে শ্রমিকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। ১৮০০ শতকে বিশ্বে একটি বড় পরিবর্তন ঘটে। সে সময়ের আগে মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দিয়ে নামমাত্র পারিশ্রমিকে দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা কাজ করাত। এতে শ্রমিকরা প্রতিবাদ করলে মালিকরা বিদ্রোহী শ্রমিকদের ওপর অত্যাচার ও নিপীড়ন শুরু করে। এই শ্রমিক আন্দোলনে অনেক শ্রমিক প্রাণ হারান। তাদের মূল দাবি ছিল—একজন শ্রমিক দিনে সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ করবেন। মালিকরা এই দাবি উপেক্ষা করায় ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকায় শ্রমজীবী মানুষ ধর্মঘটের ডাক দেয়, যার প্রাণকেন্দ্র ছিল শিকাগো শহর।

    ১৮৮৪-৮৫ সালের দিকে মন্দাভাবের কারণে অনেক শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেলে অসংখ্য শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন। শিকাগো শহরের আন্দোলনে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শ্রমিক যোগ দেন। ৩ মে আন্দোলনটি আরো ব্যাপক আকার ধারণ করে। সে সময় পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়, এতে ছয়জন শ্রমিক নিহত হন।

    শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে বিশাল সমাবেশের ডাক দেওয়া হয়। ওইদিন শিকাগো শহরে আরো চার শ্রমিক নিহত হন এবং ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই বছরের ৯ অক্টোবর আরো ছয়জনকে ফাঁসি দেওয়া হয় এবং তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ফলে শ্রমিকদের আন্দোলন আরো তীব্র হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে মালিক পক্ষ নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়।

    ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে সিদ্ধান্ত হয়, শিকাগোর আন্দোলনে প্রাণ দেওয়া শ্রমিকদের স্মরণে প্রতিবছর ১ মে ‘মে দিবস’ হিসেবে পালন করা হবে। এরপর থেকেই দিনটি বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে।

    শ্রমিকদের জন্য বিভিন্ন শ্রম আইন প্রণয়ন করা হলেও, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে; বাস্তবে শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকা তেমনভাবে ঘোরে না।

  • ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: মাঝখানে কেন ‘ইকবাল’?

    ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা: মাঝখানে কেন ‘ইকবাল’?

    ইরানের মূল সমস্যাটা ঠিক কোথায়? দেশটি এখন রীতিমতো ‘ফেরাউনি’ তর্জন-গর্জনের মুখে দাঁড়িয়ে। হুমকি দেওয়া হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা না করলে ইরানকে ধ্বংস করে দেওয়া হবে। কিন্তু ইরানি নেতৃত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোনো হুমকিকেই তোয়াক্কা করছে না। ইরানিরা না মরণকে ভয় পায়, না হার মানাকে। ইরানের সাফ কথা—আগে হরমুজ প্রণালীর অবরোধ তুলে নাও, তারপর আলোচনা; আর তা না হলে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

    ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার এ অনমনীয় অবস্থানে কিছুটা নমনীয়তা আনতে পাকিস্তান অনেক চেষ্টা করেছে। লক্ষ্য ছিল দুই পক্ষকে দ্বিতীয় দফা আলোচনায় মুখোমুখি বসানো। কিন্তু নৌ-অবরোধ বহাল রেখে মার্কিনিদের সঙ্গে বসতে অস্বীকার করেছে তেহরান। ফলে মার্কিন প্রতিনিধি দলের পাকিস্তান সফর পিছিয়ে গেছে। মার্কিনিরা অবাক—একটি সুপারপাওয়ারের সঙ্গে লড়তে ইরান কেন এতটা মরিয়া?

    গত রাতে এক মার্কিন সাংবাদিক এক ইরানি সাংবাদিককে প্রশ্ন করেছিলেন, ‘তোমাদের সমস্যাটা আসলে কী?’ ইরানি সাংবাদিক মুচকি হেসে জবাব দিলেন, ‘আমাদের সমস্যা হলো ইকবাল!’ এ উত্তর মার্কিন সাংবাদিকের মাথার ওপর দিয়ে গেল। তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘এই ইকবাল আবার কে?’ উত্তর এল, ‘ইকবাল পাকিস্তানের জাতীয় কবি।’ মার্কিন সাংবাদিকের বিস্ময় কাটে না, ‘ইকবাল কি তোমাদের মার্কিন প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছেন? দুই সপ্তাহ আগে যখন ইসলামাবাদে আলোচনা হলো, তখন ইকবাল কোথায় ছিলেন?’

    ইরানি সাংবাদিক আর কথা না বাড়িয়ে ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কৌতূহলী মার্কিন সাংবাদিক খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন, পাকিস্তানে তিনি ‘আল্লামা ইকবাল’ আর ইরানে ‘ইকবাল লাহোরি’ নামে বিখ্যাত। এরপর সেই সাংবাদিক আমার (কলামিস্টের) কাছে এসে হাজির। আমি তাকে গুগলে সার্চ করতে বললাম। তিনি ল্যাপটপ খুলে দেখালেন যে, অনেক খুঁজেও তিনি মেলাতে পারছেন না—যে মানুষ ১৯৩৮ সালে মারা গেছেন, তার কারণে ২০২৬ সালে এসে ইরানিরা আমেরিকার সঙ্গে লড়তে চাইছে কেন?

    আমি তাকে বললাম, মার্কিন প্রতিনিধি দল যখন আসবে তখন বুঝিয়ে দেব। কিন্তু তিনি নাছোড়বান্দা। তিনি এখন ইরান ও ইকবালের সম্পর্কের ওপর স্টোরি লিখতে চান। বাধ্য হয়ে তাকে পাঁচ মিনিট সময় দিলাম। তাকে জানালাম, কদিন আগেই লাহোরে ইকবালের মৃত্যুবার্ষিকীতে এক বিশাল সমাবেশ হয়েছে। সেখানে প্রধান অতিথি ছিলেন লাহোরে নিযুক্ত ইরানের কনসাল জেনারেল মেহরান মোয়াহেদ ফার। তিনি তার বক্তৃতায় স্পষ্ট বলেছেন, ‘ইকবাল ইরানিদের যে সাহস ও প্রেরণা দিয়েছেন, তা দিয়েই আমরা আমেরিকাকে পরাজিত করেছি।’

    মার্কিন সাংবাদিক নোট নিচ্ছিলেন। আমি তাকে আরও বললাম, ‘আপনি হয়তো জানেন না, এমনকি ট্রাম্পও জানেন না, কিন্তু ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বহু বছর আগে আল্লামা ইকবালের ওপর একটি আস্ত বই লিখেছিলেন। ইরানের বিপ্লবে ইকবালের কবিতা জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছিল।’

    সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন, ‘ইকবাল যদি পাকিস্তানি ও ইরানিদের যৌথ নায়ক হন, তবে পাকিস্তান কীভাবে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হবে?’ আমি হেসে বললাম, ‘ইকবাল সাধারণ পাকিস্তানিদের নায়ক, কিন্তু সেই শাসকগোষ্ঠীর নয় যারা মরণকে ভয় পায়।’

    আসলে ট্রাম্পকে কে বোঝাবে যে, ইকবাল ফারসিতে লিখেছিলেন:

    ‘আল্লাহ ছাড়া মুসলমান অন্য কারও দাস নয়,

    কোনো ফেরাউনের সামনে তার মাথা নত হয় না।’

    ট্রাম্পকে ‘ফেরাউনি’ ভঙ্গি ছাড়তে হবে, হুমকি বন্ধ করতে হবে। ইরানি হোক বা পাকিস্তানি—খাঁটি মুসলমানদের জন্য দাম্ভিক শাসকের আনুগত্য করা কঠিন। এমনকি ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ লিও-ও এখন ইরানের অবস্থানের সমর্থন দিতে শুরু করেছেন। হয়তো তিনিও ইকবালের দর্শনে প্রভাবিত!

    আসল কথা হলো, ইরানিরা ইকবালের চিন্তা দ্বারা অনুপ্রাণিত। আর ইকবালের চিন্তা মানেই ফেরাউন ও ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। ট্রাম্পের পক্ষে এটা বোঝা কঠিন যে— ‘প্রকৃতপক্ষে হোসেনের (রা.) শাহাদাতই হলো ইয়াজিদের মৃত্যু।’ ইয়াজিদ জিতেও আসলে চিরকাল হেরে যায়।

  • বিশ্বমঞ্চে ভারতকে ধরাশায়ী করছে পাকিস্তান

    বিশ্বমঞ্চে ভারতকে ধরাশায়ী করছে পাকিস্তান

    বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের খেলায় কেবল অর্থনৈতিক শক্তি বা সামরিক সক্ষমতাই শেষ কথা নয়; বরং কোন রাষ্ট্র নিজেকে কতটা “অপরিহার্য” করে তুলতে পারে, সেটিই নির্ধারণ করে তার প্রকৃত কৌশলগত অবস্থান। এই বাস্তবতায় পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে এক ধরনের ভিন্ন কৌশল অনুসরণ করে আসছে—যেখানে সীমাবদ্ধতাকেই সম্পদে রূপান্তর করা হয়। বিপরীতে ভারত, বৃহৎ অর্থনীতি ও বৈশ্বিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও, অনেক ক্ষেত্রে সেই অপরিহার্যতা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক ঘটনাগুলো এই বৈপরীত্যকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।

    ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান ও সৌদি আরব-এর মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এই ধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বহু দশকের নীরব সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই চুক্তি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গভীরতা নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোতে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় অবস্থানকেও নিশ্চিত করে। এই অঞ্চলে ভারতের বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থ—প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিটেন্স, জ্বালানি নির্ভরতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক—থাকা সত্ত্বেও, নয়াদিল্লি কোনো প্রতিরক্ষা চুক্তি, স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি বা যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে পারেনি। ফলে অর্থনৈতিক প্রভাব থাকলেও নিরাপত্তা স্থাপত্যে ভারত প্রান্তিকই থেকে গেছে।

    এই কৌশলগত অবস্থানের সরাসরি প্রতিফলন দেখা যায় চলমান পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-এর মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের প্রচেষ্টায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এমন ভূমিকা সাধারণত সেই রাষ্ট্রগুলিই পায়, যাদের ছাড়া সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিকল্প কম থাকে। পাকিস্তান সেই অবস্থান তৈরি করেছে তার সামরিক যোগাযোগ, আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতা এবং বহুমুখী সম্পর্কের মাধ্যমে—যেখানে একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ বজায় রাখা হয়।

    ঐতিহাসিকভাবে এই ধারা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জার-এর গোপন চীন সফরের পেছনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতাই ছিল মূল চালিকা শক্তি, যার মাধ্যমে রিচার্ড নিক্সন প্রশাসন চীন-এর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের পথ পায়। ১৯৮০-এর দশকে আফগান যুদ্ধে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সমর্থন আফগান মুজাহিদদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে। এমনকি ২০০১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধেও পাকিস্তান একসঙ্গে সহযোগী ও চ্যালেঞ্জ—দুই ভূমিকাতেই থেকে আন্তর্জাতিক আলোচনায় নিজের প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখে। এই ধারাবাহিকতা দেখায়, পাকিস্তানের কৌশল কোনো একক সরকারের নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদি নীতি।

    পাকিস্তানের এই অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে তার পারমাণবিক সক্ষমতা। ১৯৯৮ সালে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার পর থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় শক্তির ভারসাম্য আমূল বদলে যায়। ভারতের প্রচলিত সামরিক আধিপত্য কার্যত সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, কারণ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি উভয় পক্ষের জন্যই বিপর্যয়কর হয়ে ওঠে। ২০২৫ সালের ভারতের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই বাস্তবতা আরও স্পষ্ট হয়, যেখানে পাকিস্তান সামরিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েও সংঘাতকে একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ফলে পারমাণবিক প্রতিরোধ শুধু নিরাপত্তা নয়, কূটনৈতিক দরকষাকষিরও একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

    সৌদি-পাকিস্তান প্রতিরক্ষা চুক্তির একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্ভাব্য “পারমাণবিক ছাতা”। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মোহাম্মদ আসিফ প্রথমে এ বিষয়ে ইঙ্গিত দিলেও দ্রুত তা প্রত্যাহার করেন। তবে এই ঘটনাই দেখায়, পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে একটি কৌশলগত অস্পষ্টতা বজায় রাখছে—যেখানে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি না দিয়েও সম্ভাব্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ইঙ্গিত রাখা হয়। এই ধরনের অস্পষ্টতা সৌদি আরবের মতো রাষ্ট্রগুলোর কাছে পাকিস্তানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে, বিশেষত এমন সময়ে যখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিবেশ অনিশ্চিত।

    ভৌগোলিক অবস্থান পাকিস্তানের এই কৌশলকে আরও শক্তিশালী করে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং চীন-এর সংযোগস্থলে অবস্থান করায় এটি একটি প্রাকৃতিক করিডোরে পরিণত হয়েছে। চীনের জন্য এটি অর্থনৈতিক করিডোরের শেষ প্রান্ত, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ঐতিহাসিক নিরাপত্তা অংশীদার, আর সৌদি আরবের জন্য নির্ভরযোগ্য সামরিক সহযোগী। ফলে বিভিন্ন শক্তির স্বার্থ এক জায়গায় এসে মিলে যায়—আর সেই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পাকিস্তান।

    অন্যদিকে ভারতের শক্তিই অনেক ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। বৃহৎ অর্থনীতি, শক্তিশালী সামরিক বাহিনী এবং “কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন”-এর নীতি ভারতকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিলেও, তা তাকে ঝুঁকিপূর্ণ বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ নিরাপত্তা ভূমিকায় যেতে নিরুৎসাহিত করে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-এর নেতৃত্বে ভারত বিশ্বজুড়ে সম্পর্ক বিস্তার করলেও, সেই সম্পর্কগুলোকে নিরাপত্তা নির্ভরতায় রূপান্তর করতে পারেনি। ফলে ভারত অনেক ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, কিন্তু অপরিহার্য নয়।

    সবশেষে দেখা যায়, পাকিস্তান তার অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, নিরাপত্তা নির্ভরতা এবং ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত সম্পদে পরিণত করেছে। অন্যদিকে ভারত তার শক্তির কারণে অপেক্ষাকৃত সতর্ক ও নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখেছে। বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায়, যেখানে আঞ্চলিক সংঘাত, শক্তির প্রতিযোগিতা এবং জোট রাজনীতি নতুনভাবে গড়ে উঠছে, পাকিস্তান সেই শূন্যস্থানগুলো কাজে লাগিয়ে নিজেকে এমন এক অবস্থানে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে তাকে উপেক্ষা করা যায় না—এবং সেখানেই কৌশলগতভাবে ভারতকে ছাপিয়ে যাচ্ছে।

  • ইরান: নতুন পরাশক্তি ?

    ইরান: নতুন পরাশক্তি ?

    বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনীকে মোকাবিলা করেছে, সবচেয়ে ধুরন্ধর গোয়েন্দা সংস্থার ষড়যন্ত্র সামাল দিয়েছে; রক্তাক্ত হয়েছে, হারিয়েছে বেশিরভাগ শীর্ষ নেতৃত্বকে- তবু ভেঙে পড়েনি। দিনের পর দিন বীরের মতো মাথা উচু করে লড়েছে, শেষ পর্যন্ত শত্রুপক্ষকে বাধ্য করেছে আলোচনার টেবিলে আসতে। ৪০ দিন আগেও যা পুরোপুরি অসম্ভব মনে হচ্ছিল, আজ সেটাই বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের অহং মাটিতে মিশিয়ে কার্যত যুদ্ধজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে ইরান। ফলে চারদিকে আজ একটাই প্রশ্ন- বিশ্বের বুকে কি নতুন পরাশক্তির উত্থান ঘটেছে?

    রাজনীতি, জোট বা প্রোপাগান্ডা—সব কিছু সরিয়ে রেখে যদি কেবল বাস্তবতার দিকে তাকানো হয়, তবে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই: ইরান এমন একটি দেশ যা মাথা নত করতে রাজি নয়। একে কেউ হয়তো কৌশল বলবেন, কেউ বলবেন টিকে থাকার লড়াই, কিংবা একরোখা জেদ—তবে একে উপেক্ষা করা অসম্ভব।

    ইরান কোনো ছোটোখাটো শক্তির বিরুদ্ধে লড়েনি, তারা সরাসরি টক্কর দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে, যারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে অন্য যে কোনো দেশ পিছিয়ে আসতো বা চুপচাপ আপস করে নিতো। কিন্তু ইরান তা করেনি। তারা সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত টিকে থেকেছে।

    এরপর আসে ইসরায়েলের কথা—যাদের কাছে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম আধুনিক প্রযুক্তি এবং গোয়েন্দা ব্যবস্থা। কিন্তু ইরান অনবরত তাদের সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে, চাপ সহ্য করছে এবং পাল্টা জবাব দিচ্ছে। এটি কেবল লোকদেখানো প্রতিরোধ নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম অশান্ত একটি অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি সক্রিয় লড়াই।

    সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ইরানের পেছনে শক্ত কোনো ‘নিরাপত্তা ঢাল’ নেই। এই মুহূর্তে চীন বা রাশিয়ার মতো বড় শক্তিগুলোর কাছ থেকে কোনো সরাসরি সামরিক সহায়তা বা গ্যারান্টি ছাড়াই তারা এগিয়েছে। এটি কেবল একটি সুচিন্তিত ঝুঁকি এবং সেই ঝুঁকি নেওয়ার অসীম সাহস মাত্র।

    হামলা, ক্ষয়ক্ষতি বা শীর্ষ নেতাদের হারানো—এসব ইরানের জন্য কোনো কল্পনা নয়, বরং বাস্তবতা। ইরান বড় বড় ধাক্কা খেয়েছে, তাদের অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবুও দেশটির প্রশাসনিক বা সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি। তারা প্রতিবার নিজেকে সামলে নিয়েছে এবং লড়াই চালিয়ে গেছে। এই ধরনের ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা সহজে আসে না।

    রাজনীতি বা যুদ্ধের শেষ পরিণতি নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু কেউ যদি একটু দূর থেকে নিরপেক্ষভাবে দেখে, তবে একটি বিষয় পরিষ্কার: সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কম দেশই এত চাপের মুখে এমন অটুট মনোবল দেখাতে পেরেছে। ফলে, ইরান এখনই পরাশক্তি—এমন দাবি নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে দেশটির ভূমিকা দ্রুত বাড়ছে, এ বিষয়ে অনেকেই একমত।

  • রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হবে

    রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় রোধ করতে হবে

    রাষ্ট্রীয় সম্পদ বলতে আমরা সচরাচর যেটা বুঝি তা হলো সরকার কর্তৃক সরাসরি নিয়ন্ত্রিত এবং মালিকানাধীন সম্পদ। যেমন বিভিন্ন সরকারি অফিস, রাস্তাঘাট, কালভার্ট, ব্রিজ, নদী, খাল, জলাশয়, সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, প্রতিরক্ষাবাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, কোর্ট-কাচারীসহ এ ধরনের প্রতিষ্ঠান এবং তাদের স্থাপনাসমূহ।

    একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাজ সম্পাদন করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ কর নেয়া হয়, যা তাদের আয়ের ওপর নির্ভর করে। সেই করের অর্থ দেশের উন্নয়নের জন্যই সরকার বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ প্রদান করেন। কিন্তু সেই অর্থের যথাযথ ব্যবহার না হওয়ার ফলে উন্নয়ন প্রতিনিয়তই বাধাগ্রস্ত হয়। অনেক সময় দেখা যায় বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক কাজে বিপুল পরিমাণ অপচয় হয়।

    প্রতিটি দেশ ও জাতির সামগ্রিক উন্নয়ন নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টন ও যথাযথ ব্যবহারের ওপর। তাই রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষা করা দেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব। কেননা এটি মানুষের কাছে আমানত স্বরূপ। প্রতিটি নাগরিকের এ আমানত রক্ষা করা উচিৎ। রাষ্ট্রীয় সম্পদের ভিতর সবথেকে বেশি অপচয় হয় বিদ্যুৎ। লোডশেডিংয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে বিদ্যুতের অপচয়। বিশেষ করে অতিমাত্রায় বিদ্যুতের অপচয় লক্ষ্য করা যায় বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে। যেখানে অযথা লাইট, ফ্যান, এসিসহ বিভিন্ন ভারী বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার হয়ে থাকে।

    বর্তমানে দেখা যায় বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিভিন্ন আলোকসজ্জা করা হয়, যেটা অতিমাত্রায় বিদ্যুৎ অপচয়ের জন্য দায়ী। তাছাড়া অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগের কারণে প্রতিবছর সরকার কোটিকোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। বিদ্যুতের পরেই আসে গ্যাসের অপচয়। শহর এলকার একশ্রেণির মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত সময় চুলা জ্বালিয়ে রাখে, এতে করে গ্যাসের অনেক বড়ো একটি অংশ অপচয় হয়ে যায়।

    রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। রাষ্ট্র যেমন নাগরিক হিসেবে আমাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয়, তেমনি নাগরিক হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রাষ্ট্রের সম্পদের সুরক্ষা করা। সরকারের একার পক্ষে জাতীয় সম্পদ রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই জাতীয় সম্পদ ব্যবহারে প্রত্যেকের সচেতন হতে হবে। সবাইকে পাওয়ার সেভিং বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার, দিনের বেলায় লাইট, ফ্যান কিংবা এসি কম ব্যবহার করতে হবে। প্রয়োজনের অধিক জ্বালানি গ্যাস ব্যবহার করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যাবহারে সবাইকে মিতব্যয়ী হতে হবে। যার যার অবস্থান থেকে সবার দায়িত্ব পালন করতে হবে। আর তাহলেই জাতীয় সম্পদের অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে।

  • ইসলামী সংস্কৃতি ও আলোকিত মানুষ

    ইসলামী সংস্কৃতি ও আলোকিত মানুষ

    সংস্কৃতি সাধারণত তাহজিব, তমদ্দুন বা ইংরেজি কালচারের প্রতিশব্দ রূপে ব্যবহৃত হয়। এ সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করা। এ হচ্ছে একটি ব্যাপক জীবনব্যবস্থা যা মানুষের চিন্তা-কল্পনা, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, পারিবারিক কাজকর্ম, সামাজিক ক্রিয়াকলাপ, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর ওপরই পরিব্যাপ্ত। এ সংস্কৃতি কোন জাতীয়, বংশীয় বা গোত্রীয় সংস্কৃতি নয়। বরং সঠিক অর্থে এটি হচ্ছে মানবীয় সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি এক বিশ্বব্যাপী উদার- গোত্র, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষই প্রবেশ করতে পারে। পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে এ সংস্কৃতি এক নির্ভুল সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে এবং এক সৎ ও পবিত্র জনসমাজ গড়ে তুলতে চায়। ইসলামী সংস্কৃতির ব্যবস্থাপনা একটি রাজ্যের ব্যবস্থাপনার মতো। এতে আল্লাহর মর্যাদা সাধারণ ধর্মীয় মত অনুসারে নিছক একজন উপাস্যের মত নয়। বরং দুনিয়াবি মত অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ শাসক ও রাসূল সা. তার প্রতিনিধি। কুরআন তাঁর আইনগ্রন্থ। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার এই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা বজায় রাখা ও এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তার প্রয়োজন সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষের আছে, অন্য জীবের সংস্কৃতি বলে কিছুই নেই। মানুষ হিসেবে মানুষের আসল পরিচয়ই তার সংস্কৃতি। জীবন ধারণের জন্য মানুষ খাবার খেয়ে থাকে, এই খাবার ভাত-রুটি হতে পারে, আবার মাছ-গোশতও হতে পারে। এই খাবার খেয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়; কিন্তু এই ভাত-রুটি বা মাছ-গোশত খাওয়াটাই সংস্কৃতি নয়, সংস্কৃতি হচ্ছে খাবারের পদ্ধতি। আমরা যে পদ্ধতিতে খাবার গ্রহণ করব, সে পদ্ধতিটাই হচ্ছে সংস্কৃতি। অর্থাৎ সংস্কৃতি হচ্ছে জীবন পরিচালনার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার নাম।

    সংস্কৃতির সংজ্ঞা

    এক কথায় সংস্কৃতির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিশ্লেষণের। সংস্কৃতি সম্পর্কিত এমন কতকগুলো উদ্ধৃতি পেশ করা হলো যাতে সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সুষ্ঠু ধারণা অর্জন সহজ হতে পারে। আবুল মনসুর আহমেদ বলেন: “ইংরেজিতে যাকে বলা হয় (Culture/Refinement), আরবিতে যাকে তাহজিব বলা হয়, সংস্কৃতি শব্দটা সেই অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে।” আবুল ফজল বলেন: “ Culture শব্দের ধাতুগত অর্থ কর্ষণ অর্থাৎ সোজা কথায় চাষ করা। জমি রীতিমতো কর্ষিত না হলে যত ভালো বীজই বপন করা হোক না কেন তাতে ভালো ফসল কিছুতেই আশা করা যায় না। মন জিনিসটাও প্রায় জমির মতই। মনের ফসল পেতে হলে তার রীতিমত কর্ষণের প্রয়োজন।” ওয়াকিল আহমেদের ভাষায়: “জীবন ছাড়া সংস্কৃতি নেই।” বদরুদ্দীন উমর বলেন: “জীবন চর্চারই অন্য নাম সংস্কৃতি।” প্রচলিত অর্থে আমরা যাকে সংস্কৃতি বলে থাকি তারও লক্ষ্য মন আর চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন। মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য সাধনার উপর, এক কথায় মনুষ্যত্বের উপর যে সংস্কৃতির ভিত্তি, একমাত্র সে সংস্কৃতিই মানবজীবনে বিকিরণ করতে পারে আলো। যে আলোর নেই কোনো দেশ, কোনো কাল ও জাত। তাই সংক্ষেপে বলা যায় যে, মানুষের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে চরিত্র আর চরিত্রের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে সংস্কৃতি।

    সংস্কৃতির ভুল ধারণা

    আমরা সাধারণ গান, সিনেমা, নাটক, বাদ্যযন্ত্র, শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়কে সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করে থাকি। আসলে এইগুলো ঠিক সংস্কৃতি নয়; বরং সংস্কৃতির বাহন মাত্র। সংস্কৃতি বিকাশের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয় উপকরণ বা বাহন হিসাবে। তাই আমরা ভুলবশত তা অজ্ঞতার কারণে এ উপকরণ বা বাহনকে সংস্কৃতি বলে থাকি। সংস্কৃতিকে শুধু রীতিনীতি কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। মানব মনের অন্তর্নিহিত শক্তি, কৌতূহল ও প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ লাভ করে সংস্কৃতির মাধ্যমে। এ জন্যই সংস্কৃতির মাধ্যমে মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে। খণ্ড খণ্ড কিংবা আংশিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কখনও মানুষকে তার মনুষ্যত্ব বিকাশের সহায়তা করতে পারে না।

    অপসংস্কৃতি

    অপসংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বভাবের বিপরীত অথবা সাংস্কৃতিক আদর্শের বিরুদ্ধে যা মানুষের সুস্থ ও সুপ্ত প্রতিভাকে বিকৃতি ও বিধবস্ত করে তাই হচ্ছে অপসংস্কৃতি। বর্তমান সমাজে অপসংস্কৃতি বলে থাকে চিহ্নিত করতে পারি তা নিম্নবরূপ:

    ১. বিদেশি প্রাচুর্য থেকে সৃষ্ট এক ধরনের অশ্লীল নৃত্যগীত, নাটক ও সিনেমা ইত্যাদি।

    ২. বিদেশি মিডিয়ার কু-প্রভাব।

    ৩. ডিশ এন্টিনার বদৌলতে প্রাইম, স্টার টিভি, জিটিভি, এমটিভি আগ্রাসন।

    ৪. যৌন উত্তেজনামূলক সাহিত্য, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, কমিক বই ইত্যাদির মাধ্যমে চরিত্র হরণ করা।

    ৫. ছায়াছবির মাধ্যমে ভায়োলেন্সের চিত্র প্রদর্শন।

    ৬. বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ক্লাবের নামে মাদকের ছড়াছড়ি।

    ৭. পুরুষ ও মহিলাদের বিকৃত রুচির পোশাক পরিধান।

    ৮. অতি আধুনিকতার নামে বিদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও অনুশীলন।

    ১০. বিকৃত রুচি ও যৌন সুড়সুড়িমূলক বিজ্ঞাপন, পোস্টার, ফেস্টুন আলোকচিত্র ইত্যাদির ব্যাপক প্রচলন।

    ১১. ধর্মের নামে মাজার পূজা, কবর পূজা, শিরক ও বিদাতের ব্যাপক সয়লাব।

    সুতরাং অপসংস্কৃতি চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে একটি জাতি বা দেশের ঐতিহ্যকে বিবেচনার আয়ত্তে আনতেই হবে।

    সংস্কৃতি ও ধর্ম

    ধর্ম হচ্ছে সংস্কৃতির একটি উপাদান। ধর্মবিশ্বাসের কারণে সাংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা লক্ষ্য করছি যে, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রেরণা সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান সকলের ক্ষেত্রেই ধর্মবিশ্বাসটি জীবনের প্রেরণার উৎস। এ দেশের বিভিন্ন উৎসবের উৎস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, সেগুলোর প্রায় সব কয়টিই ধর্মভিত্তিক। ধর্মভিত্তিক হয়েও সকল উৎসব আয়োজনের মধ্যে একটি উদারতা, সহনশীলতা এবং সকল শ্রেণির এক সঙ্গে গ্রহণ করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আর এ কথা বলাই বাহুল্য যে, কোন জিনিস ব্যবহারের ব্যাপারে তার ¯্রষ্টা যে পদ্ধতি নির্দেশ করেন, সেই জিনিস ব্যবহারের সেটাই সর্বোত্তম ও নির্ভুল পন্থা। শুদ্ধ সংস্কৃতি পেতে হলে আমাদের যেতে হবে খোদায়ী দর্শনের কাছে। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন, আহার জোগাচ্ছেন এবং একদিন তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।

    ইসলাম ও সংস্কৃতি

    ইসলাম পৃথিবীতে নিছক রাজনৈতিক তা অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধনের জন্য আসেনি। ইসলাম এসেছে মানুষের চিন্তা ও কর্মকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। মানুষের চিন্তা ও কর্মের এ পরিশুদ্ধির প্রচেষ্টাকেই বলা হয় সামগ্রিক অর্থে সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ইসলাম একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। ফলে ইসলাম ছাড়া জীবন পরিচালনা মানেই হচ্ছে, অপূর্ণাঙ্গ বিধান দ্বারা পরিচালিত হওয়া। আর অপূর্ণাঙ্গ বিধান দ্বারা জীবন পরিচালনার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে অসঙ্গতি ও ত্রুটিপূর্ণ জীবন যাপন করা। স্বাভাবিকভাবেই এ জীবন অসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি শিকার হতে বাধ্য। এ জন্যই বলা যায়, পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়া ছাড়া পরিপূর্ণ সংস্কৃতিবান হওয়া সম্ভব নয়। তাই হযরত মোহাম্মদ সা.-এর জীবনে ও বাণীতে, যে সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটেছে তাই ইসলামী বা মুসলিম সংস্কৃতি বলে পরিচিত।

    নীরব ঘাতক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

    মুসলমানদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বিনষ্ট করার লক্ষ্যে বাতিল শক্তি তার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। তারা মনে করে দৃশ্যমান এ পৃথিবীর বাইরে আর কোনো জগৎ নেই, নেই কোনো জবাবদিহিতার অবকাশ। তাদের ভোগবাদী দৃষ্টির বিস্তার ঘটিয়ে মুসলমানদের চিরায়ত মূল্যবোধ বিনষ্ট করে দিচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। এর মাধ্যমে অন্যান্য মূল্যবোধের সাথে বিনষ্ট হচ্ছে:

    ১. আখেরাতের চেতনা। যে চেতনা মানুষকে পাপ ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত করে সমাজে পূত পবিত্রতার বিস্তার ঘটায়।

    ২. নেতৃত্বের চেতনা। যে চেতনা সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

    ৩. তাওহিদের চেতনা। মানুষ একমাত্র আল্লাহর বান্দা এবং পরস্পর ভাই এ ধারণার বিলুপ্তি ঘটার ফলে সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। এর ফলে ¯্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব, মানুষের মর্যাদা, মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্য এসব ধারণার অবলুপ্তি ঘটে এবং মানুষ পশুর স্তরে নেমে আসে। বস্তুত এর ফলে একজন মুসলমান তার ঈমানী চেতনা হারিয়ে ফেলে এবং সে এমন সব কাজ করতে থাকে যা একজন মুসলমান তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না থাকার কারণে করে বসে। আর এ অবস্থা সৃষ্টি হলে মাথা গুনতিতে সে মুসলিম দলভুক্ত হলেও কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে সে আর মুসলিম থাকে না। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা হামলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে সত্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। তার মধ্যে শয়তানি গুণ সৃষ্টি করা এবং জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়া। যুগে যুগে মুসলমানরা বাতিলের যত রকম হামলার শিকার হচ্ছে তার মধ্যে এ সাংস্কৃতিক হামলাই সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ও ক্ষতিকারক।

    সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পরিণতি

    বাতিলের সর্বগ্রাসী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে মুসলমানরা যে একটি মর্যাদাবান জাতি, তাদের রয়েছে আলাদা কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিশ্ব মানবতার নেতৃত্বদানের জন্য এবং মহত্ত্ব ও মানবতার বিজয় ঘোষণার জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, এ কথা অধিকাংশ মুসলমান আজ বিস্মৃত। অপসংস্কৃতির সয়লাবে আজ মুসলমান দ্বিধা-বিভক্ত। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং অনৈক্য দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিকতার নামে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলছে। শিক্ষার নামে কু-শিক্ষা, সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি বিনোদনের নামে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা এবং সর্বনাশা মাদক মুসলিম সমাজকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে দিকে ধাবিত করছে। অন্যদিকে ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ককে পারস্পরিক কাদা ছুড়াছুড়িতে ব্যস্ত রেখেছে। যা বাতিলের তীক্ষè দূরদৃষ্টি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বাতিলের সাংস্কৃতিক ঘুমপাড়ানি গান মুসলমানদের এতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, তাদের ঘরজুড়ে দাউ দাউ আগুন দেখেও সে আগুন নেভাতে যে তাদের উঠে দাঁড়াতে হবে সে কথা বুঝতে পারছে না মুসলিম। এটাই মুসলমানের দুর্ভাগ্য। বাতিলের সাংস্কৃতিক হামলার কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মুসলিম তার মুসলমানিত্ব হারাচ্ছে মৃত্যু ঘটেছে তাদের ঈমানী চেতনার। দুনিয়ার আদম শুমারিতে তাদেরকে মুসলিম হিসাবে উল্লেখ করা হলেও আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য হারাচ্ছে তারা। হালাল হারামের কোন নিয়ম তাদেরকে পরিচালিত করতে পারে না। পাপ পুণ্যের ধার ধারে না বাস্তব কর্মজীবনে এ সকল মুসলমান। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। অথচ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার ঈমানদারদের মৃত্যু ঘটে মুসলমানিত্বহীন অবস্থায়।

    সংস্কৃতি চর্চার গুরুত্ব

    আধুনিক বিশ্বে মুসলিম মিল্লাতের অনগ্রসর তার মূল কারণ ইমলামী সংস্কৃতির চর্চার অভাব। ইসলামের যে মূল দাবি মানুষের চিন্তা ও কর্মের সংস্কার ও পরিশুদ্ধি, সে সংস্কার ও পরিশুদ্ধি ছাড়া প্রকৃত অর্থে মুসলমান হওয়া যায় না, সংস্কৃতিবানও হওয়া যায় না। তাই সংস্কৃতিবান হতে হবে প্রথম মুসলিম হতে হবে আর মুসলিম হতে হলে সংস্কৃতিবান হতে হবে। কারণ সংস্কৃতির নিজস্ব কোনো আদর্শ নেই। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের আচরিত কর্মপ্রবাহের নাম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের ভিত্তিতে এ কর্মধারা পরিচালিত হলে তা হবে সংকীর্ণ ও অসম্পূর্ণ। তাই ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। এক কথায় বলা যায়, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী সংস্কৃতির লালন ও চর্চা অপরিহার্য।

    ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি

    ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। যে বিশ্বাস ও আচরণ ইসলাম একজন মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিত হতে পারে এমন কোন কিছুই ইসলামী সংস্কৃতির মধ্যে শামিল হতে পারে না। এ সীমারেখাকে অবহেলা করে বা কৌশলের নামে তাকে অবজ্ঞা করে যা করা হবে তা আর যাই হোক ইসলামী সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাসাদ নির্মিত হয়। বিষয়গুলো হচ্ছে: (১) তাওহিদ, (২) রিসালাত, (৩) আখেরাত ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার ভিত্তি হচ্ছে এ তাওহিদ, রিসালাত, আখেরাত। যে সকল কর্মকাণ্ড মানুষকে এ মৌলিক চেতনার স্মরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে তাই অনৈসলামিক সংস্কৃতি, আর যে সব তৎপরতার মধ্য দিয়ে এ সকল চেতনা জাগ্রত, শাণিত ও মজবুত হয় তাই ইসলামী সংস্কৃতি।

    ১. তাওহিদ : তাওহিদ হচ্ছে ঈমানের বুনিয়াদ। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এটুকু বিশ্বাস করাই তাওহিদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। রাসূলের জামানায় তৎকালীন আরব মুশরিক এবং কাফেররাও এটুকু বিশ্বাস করতো। তাওহিদের বিশ্বাসের অর্থ হচ্ছে আল্লাহই একমাত্র সর্বভৌম ক্ষমতার মালিক, তিনিই মানুষের রিজিকদাতা, পালনকর্তা এবং একমাত্র অভিভাবক। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তারই ইবাদতের জন্য আর দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। ভয় একমাত্র তাকেই করতে হবে সাহায্য চাইতে হবে তারই কাছে। মানুষের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ সব তার হাতে। ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের মনে এ তাওহিদ বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে হবে।

    ২. রিসালাত : মানবজাতির পথ প্রদর্শদনের জন্য আল্লাহ রাসূলকে সত্য দ্বীন ও হিদায়াতসহ পাঠিয়েছেন। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হলো মানুষের মনে রাসূলের নেতৃত্বের বিপরীত পৃথিবীর জন্য পাঠিয়েছেন। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হলো মানুষের মনে রাসূলের নেতৃত্বের বিপরীত পৃথিবীর জন্য কোনো নেতৃত্বের প্রতি যেন কারো মোহ সৃষ্টি না হয় মানুষের মনকে সেই উপলব্ধিতে উজ্জীবিত রাখা।

    ৩. আখিরাত : মানুষকে এ দুনিয়ায় আল্লাহ পাঠিয়েছেন তার ইবাদত করার জন্য। একদিন এ দুনিয়ার জিন্দেগি শেষ হয়ে যাবে। মানুষকে পুনরায় ফিরে যেতে হবে আল্লাহর দরবারে। যিনি আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করবে না তার জন্য রয়েছে অনন্ত আজাব। জীবনের প্রতিটি কাজে মানুষকে তাই ভাবতে হবে যে কাজটি আমি করছি তা কি পরকালে আমার নাজাতের উসিলা হবে, নাকি তা আমার জন্য বয়ে আনবে জাহান্নামের কঠিন আজাব। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হচ্ছে মানুষের দিলকে সর্বদা আখিরাতমুখী করা। সংস্কৃতির বিভিন্ন তৎপরতার মধ্যে দিয়ে বারবার আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই কেবল একটি কল্যাণময় ইসলামী সমাজের আশা করা যেতে পারে।

    ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রচার, প্রসার ও

    লালন অপরিহার্য

    ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ এর প্রচার, প্রচার ও লালন করা ঈমানের দাবি। ঈমানের বিষয়ে কোন দুর্বলতা থাকলে যেমন পুরোপুরি ঈমানদার হওয়া যায় না। তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ও পালন না করে পুরোপুরি মুসলিম হওয়া যায় না। কারণ বিজাতীয় সাংস্কৃতির গোলামির শিকল একবার কোন জাতির গলায় আটকে গেলে তা ছিন্ন করা যেমন দুঃসাধ্য তেমনি ছিন্ন করতে না পারলে তার পরিণামও ভয়াবহ। তাই সাংস্কৃতিক বিকাশ ও লালনের জন্য করণীয় বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো-

    (ক) পরিবার প্রথা : পরিবার মানব সভ্যতার মৌল ভিত্তি, সমাজের শান্তি-শৃংখলা, স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি ইত্যাদি পারিবারিক সুস্থতা ও দৃঢ়তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু পাশ্চাত্যের দর্শন শিক্ষা ও অপসংস্কৃতি এই পরিবার প্রথার উপর আঘাত হেনে সভ্যতার মূল ভিত্তিকেই বির্পযস্ত করে তুলছে। তাই এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ইসলাম পরিবারকে সংস্কৃতি চর্চার নিয়ামকে পরিণত করে অতুলনীয় বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলছে তার কোনো বিকল্প নেই। পারিবারিক ক্ষেত্রে যদি আমরা ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ সাধন ও লালন করতে না পারি তাহলে পাশ্চাত্যের অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছছে যে, সেখানকার নারী পুরুষ এখন “লিভটুগেদার সিস্টেমে” জীবন নির্বাহ করতেই ক্রমাগত অভ্যস্ত হচ্ছে। ফলে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে প্রতিনিয়ত। তাই এই প্রেক্ষিতে মানবসমাজে পরিবার প্রথা, পারিবারিক শিক্ষা, জীবন ধারার প্রচলন ও কল্যাণকর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার জন্য এই পরিবারপদ্ধতি সব সময়ই অতিশয় কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।

    (খ) মসজিদভিত্তিক সংস্কৃতি চর্চা : ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার দ্বিতীয় প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে মসজিদ। মসজিদকে আমরা শুধুমাত্র নামাজের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছি। অথচ রাসূলের সময় থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মসজিদকে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। মসজিদ যেমন ইসলামী সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্প চর্চার কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি মসজিদ মুসলমানদের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রভূমি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা যে অভিন্ন সাংস্কৃতিক বোধে উজ্জীবিত হয় মুসলমানদের জীবনধারা যে বোধের দ্বারাই পরিচালিত হয়। আমাদের সমাজে মসজিদকে এখনো যথার্থ মর্যাদায় ব্যবহার করার মানসিকতা তৈরি হয়নি। এ মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মসজিদকে ব্যবহার করতে হবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার কেন্দ্র রূপে। এ জন্য যথাযথ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    ১. ইসলামী সংস্কৃতির সুষ্ঠু আঞ্জামের জন্য মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনের বেতনভাতা বৃদ্ধি করে এ কাজে ফুলটাইম নিয়োজিত করতে হবে।

    ২. নিয়মিত কুরআন হাদিসের পাঠ ও আলোচনা করা।

    ৩. বিভিন্ন জাতীয় ও ইসলামী দিবসের ওপর আলোচনা করা।

    ৪. শিশু-কিশোর, যুবক ও বয়স্কদের জন্য পৃথক পাঠ ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৫. বিশেষ বিশেষ সময় বা উপলক্ষে হামদ, নাত, ইসলামী সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, আযান, কেরাত এর প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৬. পাঠাগার ও ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার চালু করা এবং পাঠ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৭. মাঝে মাঝে বই, চিত্র ও শিল্পকলার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা।

    ৮. প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা।

    ৯. আত্মকল্যাণমূলক কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

    ১০. রমাদাান মাসকে সাংস্কৃতিক মাস হিসেবে উদযাপন করা।

    ১১. ইসলামী দিবসে বিশেষ প্রীতিভোজ, প্রীতি …… ব্যবস্থা করা।

    ১২. সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্ন সম্পদ পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কলহ, মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদির মীমাংসা করা।

    ১৩. বাৎসরিক সম্মেলন ও তাফসির মাহফিলের ব্যবস্থা করা।

    ১৪. সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য সনদ ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা।

    ১৫. নামাজ পড়া সহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে মহিলাদের সম্পৃক্ত করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা।

    ১৬. বয়স্কদের জন্য নৈশ পাঠ/ নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা।

    ১৭. ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বা ব্যক্তির দ্বারা প্রতিদিন বাড়ি/বাসায় বই সরবরাহের ব্যবস্থা করা।

    ১৮. সকল কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে বাৎসরিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

    এভাবে উপরোক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু, কিশোর, যুবক ও বয়স্কদেরকে ব্যাপকভাবে মসজিদমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে। মসজিদ কেবল নামাজ পড়ার জায়গা হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে মানুষের অবসর, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও বিনোদনের কেন্দ্র রূপেও মসজিদকে গড়ে তুলতে পারলে ইসলামী সংস্কৃতি বিকশিত হবে।

    (গ) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তোলা: আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোকে অধিকতর সক্রিয় করে তুলতে হবে। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সাংস্কৃতিক মন্ত্রালয়ের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা অব্যশই এ দেশের অধিকাংশ জনগণের বিশ্বাস ও চেতনার সপক্ষে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এসব প্রতিষ্ঠান ভিনদেশী সংস্কৃতি নিয়ে যতটা সক্রিয় ইসলামী সংস্কৃতি বিষয়ে ততটা উদাসীন। জনগণের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানকে জনকল্যাণমুখী ও ইসলামী সাংস্কৃতিক বিষয়কে লালন করার জন্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (ঘ) মিডিয়ার ভূমিকা পালন : ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের জন্য মিডিয়া একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়া সংস্কৃতি বিকশিত হওয়া সম্ভব নয়। সরকারি মিডিয়া বিশেষ করে রেডিও, টিভি, পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি বেসরকারি মিডিয়া গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া সুবাদে অপসংস্কৃতি যে ভাবে মুসলমানদের ঈমান আকিদাকে ধ্বংস করছে তার মোকাবেলায় ইসলামী অনুষ্ঠান মানা অর্থাৎ সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে বেসরকারি চ্যানেলের কোনো বিকল্প নেই।

    (ঙ) চলচ্চিত্র নির্মাণ : চলচ্চিত্র দেশের একটি উল্লেখযোগ্য গণমাধ্যম। এ মাধ্যমটি বর্তমানে এতটা অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় ভরপুর যার নাম শুনলে মানুষ মনে করে ইসলামে আবার সিনেমা তা কি করে সম্ভব। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সিনেমা বা ফিল্মে মূলত ও স্বতঃই কোনো দোষ বা খারাবি নেই। তা কি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে কি উদ্দেশ্য সাধন করতে চাওয়া হচ্ছে সেটাই আসল প্রশ্ন। এ কারণে কতিপয় শর্তসমূহ সহকারে কাজে লাগালে তা খুবই ভালো, উত্তম ও কল্যাণকর হতে পারে।

    ১. শিরক থাকতে পারবে না।

    ২. নগ্নতা ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. শিক্ষামূলক ও জ্ঞানমূলক হতে হবে।

    ৪. দেশ ও জাতি বিদ্বেষী হতে পারবে না।

    ৫. মৌলিক উভয় ক্ষেত্রে (অভিনয় ও দর্শক) নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা করা যাবে না।

    উপরোক্ত শর্তের আলোকে সিনেমা নির্মাণ করা হলে সংস্কৃতি ও ইসলামের বাণী পৌঁছানোর জন্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমটি অধিক ফলপ্রসূ হবে। তাই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ছবি নির্মাণের জন্য প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ব্যবসায়িক মনোভাব ও ইসলামের স্বার্থে মুসলিম ব্যবসায়ীদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ইসলামী ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ প্রধানে এগিয়ে আসলে এ খাত দ্রুত বিকশিত হবে। এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ফলে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ অধিকতর বেগবান হবে।

    (চ) নাটক তৈরি করা : নাটক আরেকটি জনপ্রিয় গণমাধ্যম। নাটকের মাধ্যমেও সংস্কৃতি জনপ্রিয় করা সম্ভব। প্রধানত উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এর দর্শক। সমাজ পরিবর্তনের মুখ্য নিয়ামক শক্তি মধ্যবিত্ত সমাজ, তাদের মানসিক পরিবর্তনের জন্য নাটক খুবই জরুরি, এ জন্য ইসলামী সমাজ নির্মাণের স্বপ্নে যারা বিভোর নাটকের বিষয়টিও তাদের গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে। তাই ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে নাটক রচনা ও সঞ্চায়নের ব্যাপারেও তাদের উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।

    (ছ) সঙ্গীতচর্চা : মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোধ জাগাতে ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য। হাম্দ, নাত, দেশাত্মবোধক ও ইসলামী সঙ্গীতের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং অডিও, ভিডিও, সিডি, ক্যাসেট এ ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে। তাই যারা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের কাজে নিয়োজিত ইসলামী সঙ্গীতের প্রসারেও তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (জ) চারু ও কারুকলার বিস্তার : মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যপ্রিয়। মানুষের এই শিল্প চেতনা যেন কল্যাণের পথে অগ্রসর হয় সে জন্যই ইসলামী চারু ও কারুকলার বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন। একজন মানুষের ঘরে প্রবেশ করলে বুঝা যায় লোকটি কোন প্রকৃতির। কেউ বা মূর্তি দিয়ে, আবার কেউবা সাজায় ফুল শোভায় বা ক্যালিগ্রাফিতে। এ জন্য চারু ও কারুকলা শিল্পে ইসলামের ছোঁয়া থাকলে মানুষ অশ্লীলতা থেকে এবং এমনকি প্রচ্ছন্ন শিরক থেকে রক্ষা পেতে পারে। সামাজিকভাবে ইসলামী আবহ সৃষ্টির জন্য। তাই চারু ও কারু শিল্পের ব্যাপক চর্চা হওয়া প্রয়োজন।

    (ঝ) সাহিত্য রচনা করা : আধুনিক বিশ্বে মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোধ সৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে যে মাধ্যমটি তা হচ্ছে সাহিত্য, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ছড়া, এসব নান রকম ফর্মে সাহিত্যচর্চা চলে। শিক্ষিত মানুষ মাত্রই সাহিত্যের কোনো না কোনো ফর্মের প্রতি আগ্রহ পোষণ করবে এবং সাহিত্য পড়বে এটাই স্বাভাবিক। এভাবে পড়ার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান দ্বারাই তার জীবনবোধ গড়ে ওঠে। ফলে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হলে ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামী সাহিত্যের চাহিদা যত বাড়বে ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টিতে লেখকরা ততবেশি আগ্রহী ও সচেষ্ট হবে। তাই আমাদের মাসিক বাজেটে চাল-ডালের মত বই ক্রয়েরও একটি পরিকল্পনা করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ চাল-ডাল আমাদের দেহের ক্ষুধা মেটায় আর বই মেটায় আমাদের মনের ক্ষুধা।

    (ঞ) গান ও বাদ্যযন্ত্র : যে কাজে সাধারণত মানুষের মন আকৃষ্ট হয় ও অন্তর পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করে এবং কর্ণকুহরে মধু বর্ষিত হয় তা হচ্ছে। নির্লজ্জতা, কুৎসিত-অশ্লীল ভাষা কিংবা পাপ কাজে উৎসাহ উত্তেজনা দানের সংমিশ্রণ না থাকলে তা মুবাহ্। উপরন্তু যৌন আবেগ উত্তেজনাকর বাদ্য সংমিশ্রণ না হলে সেই সাথে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারেরও কোন দোষ নেই। এ জন্য শরিয়তের দৃষ্টিতে কতিপয় শর্ত অপরিহার্য।

    ১. গানের কথা শিরকমুক্ত হতে হবে।

    ২. নগ্নতা ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. যৌন আবেগ ও উত্তেজনাকর বাদ্য সংমিশ্রণ থাকতে পারবে না।

    ৪. শিক্ষা ও গঠনমূলক হতে হবে।

    ৫. গান ও বাদ্য মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হতে হবে।

    উল্লিখিত শর্তসাপেক্ষে আনন্দ উৎসবের ক্ষেত্রে খুশি ও সন্তোষ প্রকাশের জন্য এসব জিনিস শুধু জায়েজই নয়, পছন্দনীয়ও বটে। যেমন: ঈদ, বিয়ে, শুভসংবাদ, ওয়ালিমা, ইসলামী বিশেষ দিবস উদযাপন, আকিকা অনুষ্ঠান ও সন্তান জন্ম হওয়া কালে এসব ব্যবহার করা যেতে পারে দ্বিধাহীনচিত্তে। হযরত আয়িশা রা. বলেছেন, আনসার বংশের এক ব্যক্তির সাথে একটি মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তখন নবী করীম সা. বললেন: হে আয়িশা! ওদের সঙ্গে আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থা কিছু নেই? কেননা আনসাররা তো এগুলো বেশ পছন্দ করে। (বুখারি) তাই ইসলামী সংস্কৃতির বাহন হিসেবে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে সার্বজনীন করার জন্য ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের কাজে যারা নিয়োজিত তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (ট) ক্রীড়া, আনন্দ ও প্রতিযোগিতা : ইসলাম বাস্তববাদী জীবনবিধান। তা মানুষকে অবাস্তব কল্পনা বিলাস ও নানা চিন্তা ভাবনার কুঞ্ঝটিকার পরিবেষ্টনে আবদ্ধ করে রাখতে ইচ্ছুক নয়। বরং এ বাস্তবতার পৃথিবীতে ঘটনাপ্রবাহের আবর্তনের মধ্যে সুষ্ঠু রূপে বসবাস করার রীতি ও পদ্ধতিই ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয়। তা মানুষকে নভোমণ্ডলে বিচরণকারী ফেরেশতা মনে করে কর্মবিধান তৈরি করেনি। খাদ্য-পানীয় গ্রহণকারী ও হাটে বাজারে বিচরণকারী মানুষ মনে করেই তার জন্য বিধান দেওয়া হয়েছে। ইসলাম মানুষকে প্রকৃতি ও স্বভাবগত ভাবধারার উপর পুরো মাত্রায় লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এভাবে যে, পানাহার যেমন তার প্রকৃতির চাহিদা তেমনি আনন্দ-স্ফূর্তি ও সন্তুষ্টি-উৎফুল্লচিত্ত হয়ে থাকা এবং হাসি-তামাশা-খেলা ইত্যাদিও তার প্রকৃতিগত ভাবধারা হয়ে রয়েছে। এ সত্য কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। আনন্দ-স্ফূর্তি ও ক্রীড়ার বহু প্রকার ধরন ও পদ্ধতি এমন রয়েছে যা নবী করীম সা. মুসলমানদের জন্য জায়েজ করেছেন। মুসলমানরা এ গুলোর সাহায্যে মনের বোঝা হালকা করতে পারে, স্ফূর্তি লাভ করতে পারে। এসব ক্রীড়া মানুষকে ইবাদত ও কর্তব্য পালনে- এসব কাজে তৎপরতা সহকারে অংশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। এসব শরীর চর্চামূলক ক্রীড়ার সাহায্যে শক্তিবর্ধক ট্রেনিং লাভ করতে পারে। তার দরুন মানুষ জিহাদে অংশগ্রহণের জন্যও প্রস্তুত হতে পারে। খেলাধুলা বিষয়ে শরিয়তের কতিপয় শর্ত রয়েছে তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:

    ১. খেলাধুলার কারণে নামাজ থেকে বিরত হওয়া বা বিলম্ব করা যাবে না।

    ২. তাতে জুয়া মদ্যপান ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. খেলার সময় খেলোয়াড় ও দর্শক নিজেদের মুখকে গালাগাল, কুৎসিত-অশ্লীল কথাবার্তা থেকে মুক্ত ও পবিত্র রাখবে।

    ৪. পোশাক পরিচ্ছদ শালীন ও শরিয়াহ্ সীমারেখার মধ্যে হতে হবে।

    ৫. খেলাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীল নৃত্য ও দেহের বিশেষ অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ করা যাবে না।

    ৬. পুরুষ ও মহিলা একত্রে খেলা করা যাবে না।

    ৭. খেলা শরীর চর্চামূলক, গঠনমূলক, শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক হতে হবে।

    সুতরাং উল্লিখিত শর্ত পরিপালন করে খেলাধুলা করতে বিধিনিষেধ নেই। তবে এসব শর্ত লংঘিত হলে কিংবা তার অংশবিশেষও ভঙ্গ করা হলে সে খেলা হারাম হয়ে যাবে যা কাম্য হওয়া উচিত নয়।

    (ঠ) সাংস্কৃতিক কর্মী/শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান : ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্ব এত বেশি যে, ইসলামী বিপ্লবের জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লব অপরিহার্য। কোনো জনপদে যদি কখনও জনমতের কারণে ইসলাম বিজয় লাভ করে আর সেখানে যদি পূর্ব থেকে সাংস্কৃতিক চর্চা না থাকে তবে সে জনপদে ইসলাম বিজয়ী হিসেবে বেশিদিন টেকসই হবে না। কারণ সংস্কৃতি মানুষের মনের লালিত স্বপ্নকে বিকশিত করে। আর বিকশিত যখন সঠিকভাবে হবে না তখন মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে বিপথে ধাবিত হবে। এজন্য কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীরা হচ্ছেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারিগর। তারা হচ্ছেন সমাজদেহের চক্ষু এবং সভ্যতার বাগান। আর সমাজ পরিচালকরা হচ্ছেন সে বাগানের মালী। তারা যত বেশি এ বাগানের পরিচর্যা করবে সমাজে তত বেশি হৃদয়ের পুষ্প ফুটবে। যে জনগোষ্ঠী এ বাগানের পরিচর্যায় অমনোযোগী হবে তারা বঞ্চিত হবে মানবতার পুষ্প সৌরভ থেকে। সে একটি কল্যাণকর ইসলামী সমাজ যাদের কাম্য তাদের উচিত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা দান করা। এ পৃষ্ঠ-পোষকতা তারা যতবেশি দিতে পারবে ততই বৈচিত্র্যের বিকাশ ঘটবে। তাই শিল্পীদের সার্বিক সহায়তা দানের জন্য ব্যাপকভিত্তিক কিছু সৃস্পষ্ট ও সুষম পরিকল্পনা দরকার যা নি¤েœ আলোচনা করা হলো:

    ১. ইসলামী সংগঠনের উচিত তাদের পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।

    ২. সাংগঠনিক সকল কার্যক্রমে বেশি বেশি সাংস্কৃতিক চর্চা করা।

    ৩. সাংস্কৃতিক বিষয়ে জনমত সৃষ্টি করা।

    ৪. সাংগঠনিক প্রতিটি স্তরে পৃথক সাংস্কৃতিক বিভাগ চালু করা।

    ৫. সাংস্কৃতিক বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা।

    ৬. অসহায় শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখা।

    ৭. তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা।

    ৮. সাংস্কৃতিক চর্চা ও গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশের ব্যবস্থা করা।

    ৯. বছরে একবার সারা দেশের সাংস্কৃতিমনা শিল্পীদের নিয়ে সম্মিলন বা পারস্পরিক মত বিনিময়ের ব্যবস্থা করা।

    ১০. বছরের শুরুতে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

    ১১. এ খাতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এগিয়ে আসার জন্য ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করণ ও আগ্রহ সৃষ্টি করা।

    ১২. এ খাতকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার জন্য জনমত গঠন এবং প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা।

    পৃথিবীর প্রতিটি মানস পরিবর্তনে এ সত্যটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, মুখ্যত পরিবর্তন ঘটিয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিন্তু তার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে সংস্কৃতি কর্মীরা। সাংস্কৃতিক কর্মীরা হচ্ছে যুগের মুয়াজ্জিন আর রাজনৈতিক নেতা হচ্ছেন ইমাম। তাই আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মীদের ময়দানে নামাতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত লাব্বাইক লাব্বাইক বলে ঘর থেকে ছুটে আসবে না জনগণ। জনগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াবে না কোনো নেতার পিছনে ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য এ জন্যই সাংস্কৃতিক কর্মীদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে ব্যাপকভাবে ইসলামী বিপ্লবের উপযোগী পরিবেশ ও জনমত সৃষ্টির জন্য ময়দানে নামানো আজ সময়ের দাবি।

    সাংস্কৃতিক বিষয়টি মুসলমানদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এ জন্য প্রতিটি সচেতন মুসলমানের উচিত নিয়মিত সাংস্কৃতিক তৎপরতা বৃদ্ধি ব্যাপারে উৎসাহী ভূমিকা পালন করা। এ ভূমিকা অব্যাহত না থাকলে অপসংস্কৃতি ইসলামী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করবে। এ ধ্বংস মুসলমান তো দূরের কথা ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাও কর্মীর কাছে সুস্পষ্ট নয়। তাই এ জন্য ইসলামী আন্দোলনে সংস্কৃতির চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা না করলে তা জাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ও ক্ষতি ডেকে আনবে। এই ভয়াবহ ক্ষতির থেকে মুক্তির জন্য ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রচার, প্রসার করা সময় ও ঈমানের দাবি।

    লেখক : কলামিস্ট ও ব্যাংকার

    রফিকুল ইসলাম

  • ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধ করুন

    ফসলি জমির মাটি কাটা বন্ধ করুন

    অবৈধভাবে ফসলি জমির মাটি কাটা একটি দেশের জন্য চরম ক্ষতিকর। জমির মাটি কাটার ফলে একদিকে যেমন গভীর খাদ ও গর্তের সৃষ্টি করে, তেমনি অপরদিকে চাষযোগ্য জমিগুলোর হ্রাস ঘটে। দিনদিন চাষযোগ্য জমি হ্রাস পেতে থাকলে খাদ্যের সংকট বেড়ে যাবে। চাষাবাদের জন্য মাটির উপরিভাগ হল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা ‘টপ সয়েল’ নামে পরিচিত। এটা নষ্ট হয় কেবল মাটি খননের ফলে। এই স্তরটি পুনরায় গঠিত হতে প্রায় ২০-২৫ বছর সময় লাগে। সুতরাং মাটি খনন অত্যন্ত ক্ষতিকর। অপরদিকে মাটির স্তরের ভারসাম্যও দূর্বল হতে শুরু করে। এভাবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের সৃষ্টি হতে থাকে। অবৈধ মাটি খননকারীরা দেশের গঠন-কাঠামোর ক্ষতিসাধনের মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করে, যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া এ কাজে বাধা দিতে আসলে স্থানীয়দের পড়তে হয় হুমকির মুখে। অতএব, অবৈধ মাটি কাটা সিন্ডিকেট প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে সরকারের প্রতি বিনীত অনুরোধ জানাচ্ছি।

  • মামদানির বিজয়: গাজায় নীরবতার বিরুদ্ধে সত্যের জয়

    মামদানির বিজয়: গাজায় নীরবতার বিরুদ্ধে সত্যের জয়

    নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জোহরান মামদানির ঐতিহাসিক বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায় লিখেছে। এই জয় কেবল একটি নির্বাচনী সাফল্য নয়, বরং ‘গাজায় নীরবতার উপর সত্যের বিজয়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

    ইসরাইলি নীতির সমালোচনা করায় তাকে ইহুদি-বিরোধী বলে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। ভোটাররা বুঝেছেন, গাজার গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া কোনো বিদ্বেষ নয়, বরং ন্যায়বিচারের আহ্বান। মামদানি বলেছেন, “ন্যায়বিচার কখনো নির্বাচনী হতে পারে না।”

    এর বিপরীতে, তার প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্ড্রু কুওমো ইসরাইলের প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখিয়েছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, যদি গণহত্যার অভিযোগে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে বিচার করা হয়, তবে তিনি তার পক্ষে সাক্ষ্য দেবেন। তার এই অবস্থান যে নৈতিক অন্ধত্বকে প্রকাশ করছে, নাগরিকরা তা বুঝতে পেরেছেন।

    হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক জিয়াদ মোতালা আল জাজিরায় এক মন্তব্যে বলেন, “মামদানিকে বেছে নিয়ে ভোটাররা, দাতাদের আনুগত্যের উপর জনস্বার্থ এবং গাজায় নীরবতার উপর সত্যকে সমর্থন করেছেন।”

    মামদানি তার প্রচারণায় সাহসিকতার সঙ্গে প্রচলিত রাজনীতির দ্বন্দ্ব তুলে ধরেছেন। তিনি শহরের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক প্রশ্নগুলোর সমাধান দিতে চেয়েছেন। কে এই শহরে টিকে থাকতে পারবে? এই প্রশ্নের জবাবে তার নীতিনিষ্ঠ স্পষ্টতা ফুটে উঠেছে। তিনি জনসাধারণের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন, ভাড়াটেদের অধিকার, সর্বজনীন শিশু যত্ন ও বিনামূল্যে গণপরিবহন পাশাপাশি, ধনীদের ন্যায্য কর প্রদানের প্রতিশ্রুতি ও জনস্বার্থে মুদি দোকানের সরকারি মালিকানা প্রস্তাব করেছেন।

    মামদানির বিরোধীরা তাকে ‘সমাজতান্ত্রিক’ বলে আক্রমণ করলেও, ভোটাররা এই পুরনো ভয় দেখানোর কৌশল প্রত্যাখ্যান করেছেন। মামদানি ট্রাম্পের মতো বিভাজনের রাজনীতির নয়, বরং জনসাধারণের কল্যাণকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন।

    নিউইয়র্কের তরুণ ভোটাররা এবার একটু অন্যরকম ছিলেন। তারা সামাজিক মাধ্যমগুলোতে গাজার বাস্তব চিত্র দেখেছেন। আর তাই ‘ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যের একমাত্র গণতন্ত্র’ এই তত্ত্বকে তারা গ্রহণ করেননি। এমনকি অনেকেই প্রকাশ্যে ইসরাইলকে ‘বর্ণবাদী রাষ্ট্র’ বলতেও ভয় পাননি।

    অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির শীর্ষ নেতৃত্বের নীরবতাও ভোটারদেরকে চরম হতাশ করেছে। সিনেটর চাক শুমার ও প্রতিনিধি হাকিম জেফ্রিস শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাদের সমর্থন দেননি। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের এই দ্বিধা-দ্বন্দ ‍ছিল দাতা শ্রেণীর প্রতি নির্ভরতার প্রতিফলন।

    জোহরান মামদানির বিজয় আজ এক প্রজন্মের ক্ষোভ ও আশার প্রতীক। তরুণরা আর ‘ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ হলেও মেনে নিতে হবে’ এই তত্ত্বে বিশ্বাসী নয়। তারা এমন রাজনীতি চায় যা সত্য বলে এবং তার ওপর কাজ করে।

  • এত এত বৈঠকের পরও হয়নি ঐকমত্য, আলোচনা কি গড়াবে মাঠেই?

    এত এত বৈঠকের পরও হয়নি ঐকমত্য, আলোচনা কি গড়াবে মাঠেই?

    Despite repeated meetings and discussions, differences of opinion remain between the parties on some fundamental issues of reform.

    Even some religiously-based political parties have now called for simultaneous programs on the streets to address the issue of implementation.

    Finally, the commission’s term is being extended again.

    So is the issue now on the negotiating table or on the streets? Where is the solution?

    Tanha Tasnim’s report…