আসন্ন অভ্যন্তরীণ আমন ধান সংগ্রহ ২০২৬-২৭ মৌসুমে খাদ্যগুদামে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনার সরকারি উদ্যোগ শুরুতেই বড় ধরনের প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় পড়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় থেকে জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষি অফিসে প্রকৃত আবাদকারী কৃষকের তালিকা চাওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে তৈরি হয়েছে প্রবল অসন্তোষ।
একদিকে সরকারের কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি ‘কৃষকের অ্যাপ’ দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। অন্যদিকে, উপজেলা খাদ্য অফিসের বিরুদ্ধে কৃষি কর্মকর্তাদের দেওয়া তালিকা তোয়াক্কা না করে নিজস্ব পছন্দসই লোক দিয়ে ভুয়া লটারির মাধ্যমে ধান সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। ফলে তালিকা প্রণয়নে চরম অনীহা ব্যক্ত করছেন ময়মনসিংহ জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা।জেলা খাদ্য অফিস সূত্রে জানা যায়, গত বছর ময়মনসিংহে আমন ধান সংগ্রহ করা হয়েছিল দুই হাজার ২৫৬ টন। জেলার ১৩টি উপজেলার ১৯টি গুদামে একযোগে চলে ধান সংগ্রহ অভিযান। তবে চলতি বছর আমন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা এখনো ঠিক করেনি সরকার।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সংগ্রহ শাখা থেকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জারি করা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, আগামী নভেম্বর থেকে শুরু হতে যাওয়া আমন সংগ্রহ মৌসুমে ‘অভ্যন্তরীণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা-২০১৭’ অনুযায়ী ইউনিয়নওয়ারি আবাদকারী প্রকৃত কৃষকের তালিকা আগামী ২১ অক্টোবরের মধ্যে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী দুই উপায়ে কৃষক নির্বাচন করার কথা— খাদ্য বিভাগের ডিজিটাল মাধ্যম ‘কৃষকের অ্যাপ’ এবং উপজেলা কৃষি অফিসের প্রণীত আবাদকারী কৃষকের তালিকা। কিন্তু ময়মনসিংহের ময়মনসিংহ সদর, মুক্তাগাছা, ফুলবাড়িয়া, ত্রিশাল, গফরগাঁও, নান্দাইল, ঈশ্বরগঞ্জ, ধোবাউড়া, হালুয়াঘাট, ফুলপুর, তারাকান্দা, নান্দাইল ও হালুয়াঘাট এই ১৩টি উপজেলার কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোবাইলে ‘কৃষকের অ্যাপ’ ইন্সটল করার পর তা খোলেই না। সার্ভার ত্রুটি ও কারিগরি জটিলতায় অ্যাপটি দীর্ঘদিন ধরে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়ে রয়েছে। ফলে সাধারণ চাষিরা অ্যাপের মাধ্যমে নিবন্ধনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অ্যাপ বিকল হওয়ায় খাদ্য সংগ্রহের পুরোটাই নির্ভর করার কথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের তালিকার ওপর। কিন্তু এতেও তৈরি হয়েছে চরম অসন্তোষ। জেলার একাধিক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতিবছর আবাদকারী প্রান্তিক ও প্রকৃত কৃষকদের তথ্য যাচাই-বাছাই করে আমরা কষ্টসাধ্য প্রক্রিয়ায় তালিকা পাঠাই। কিন্তু খাদ্য অফিস সেই তালিকা অনুযায়ী ধান না কিনে নিজেদের সুবিধাজনক লোকজনের তালিকা তৈরি করে লটারির নামে ধান সংগ্রহ দেখায়।
পরবর্তীতে অভিযোগ উঠলে বলা হয়, লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করা হয়েছে। কৃষি বিভাগের অভিযোগ, তাদের পাঠানো হাজার হাজার কৃষকের তালিকা থেকে ৭০-৮০ শতাংশের বেশি নাম বাদ দিয়ে নামমাত্র কয়েকজন কৃষকের নাম চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়। বাকি জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী ও খাদ্য অফিসের সিন্ডিকেটের লোকজনকে জায়গা দেওয়া হয়। এ কারণে প্রতিবছর কৃষি কর্মকর্তারা মাঠপর্যায়ে প্রকৃত কৃষকদের অসন্তোষের মুখে পড়েন। এই পরিস্থিতিতে এবার নতুন করে পুনরায় কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনীহা দেখাচ্ছেন উপজেলার কৃষি কর্মকর্তারা।
ময়মনসিংহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি আমন মৌসুমে জেলায় দুই লাখ ৭০ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে রোপা আমন ধান আবাদ হয়েছে। জেলার ১৩টি উপজেলায় প্রায় ১০ লাখ কৃষক রয়েছেন। কিন্তু খাদ্য গুদামে ধান বিক্রির তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও হয়রানির কারণে সাধারণ কৃষকরাও খাদ্য গুদামে ধান দিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
এ বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলার কয়েকজন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা কষ্ট করে মাঠপর্যায় থেকে প্রকৃত আবাদকারী কৃষকদের এনআইডি, মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নম্বর মিলিয়ে নিখুঁত তালিকা পাঠাই। কিন্তু খাদ্য গুদামে ধান জমা নেওয়ার সময় আমাদের সেই তালিকার কোনো প্রতিফলন থাকে না। খাদ্য অফিস নিজেদের মতো করে তালিকা বানিয়ে লটারির অজুহাত দেয়। কৃষকরা এসে আমাদের ওপর চড়াও হয়। যদি আমাদের তালিকাই মূল্যায়ন না করা হয়, তবে প্রতিবছর এমন নিষ্ফল তালিকা পাঠানোর কোনো মানে হয় না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন উপজেলা কৃষি অফিসার বলেন, প্রতিবছর আমরা যে তালিকা দেই; সে অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ধান নেওয়া হয় না। অনেক কৃষক আমাদের কাছে এসে অভিযোগ করে তাদের কাছ থেকে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা তুলে মাত্র ৫০০-১০০০ টাকা দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়। আর ধান দিতে গেলে তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করা হয়।
অন্যদিকে, অ্যাপ সচল না থাকা ও কৃষি কর্মকর্তাদের অভিযোগের বিষয়ে জেলা খাদ্যনিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাসান জানান, অ্যাপের কারিগরি দিকটি কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। আর সংগ্রহ নীতিমালার আলোকেই উন্মুক্ত লটারির মাধ্যমেই কৃষক চূড়ান্ত করা হয়। এখানে কোনো অনিয়মের সুযোগ নেই। অ্যাপ-এর কার্যক্রম সারা বছর বন্ধ থাকে, নির্দিষ্ট সময়ে এটি খুলে দেয় সরকার।
স্থানীয় নাগরিক নেতা ইমতিয়াজ আহমেদের ভাষ্য, ডিজিটাল ‘কৃষকের অ্যাপ’ সচল না থাকা এবং কৃষি ও খাদ্য বিভাগের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে মধ্যস্বত্বভোগী ও ফড়িয়া ব্যবসায়ীরাই লাভবান হচ্ছে। আর সরকারের আসল উদ্দেশ্য কৃষককে ধানের ন্যায্য মূল্য দেওয়া—তা ভেস্তে যেতে বসেছে। অবিলম্বে অ্যাপটি সচল করা এবং কৃষি অফিসের প্রেরিত প্রকৃত কৃষকদের শতভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতে তালিকাভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
আঞ্চলিক খাদ্যনিয়ন্ত্রক আশরাফুল আলম জানান, আমরা কৃষকের কাছ থেকে ধার নিলেও এসব তাদেরকে আমরা চিনি না। এজন্য কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের তালিকা নিতে হয়।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
