ভারত–তুরস্ক সম্পর্ক বুঝতে হলে শুধু কাশ্মীর, পাকিস্তান কিংবা রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সাম্প্রতিক অবস্থানের দিকে তাকালে হবে না। এর পেছনে কাজ করে ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, তুরস্কের নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতির আকাঙ্ক্ষা এবং বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা।
তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মুদাসসির কামারের তুর্কিয়ের ফরেন পলিসি আন্ডার দ্য একেপি: ইমপ্লিকেশনস অ্যান্ড চ্যালেঞ্জেস ফর ইন্ডিয়া এই জটিলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দেয়। ভারতীয় গবেষক ও জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম এশিয়া অধ্যয়ন কেন্দ্রের সহযোগী অধ্যাপক মুদাসসির কামারের সম্প্রতি প্রকাশিত এই বইটিতে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতির কাঠামোগত ভিত্তির পাশাপাশি কয়েকটি বিশেষ প্রবণতার কথা বলা হয়েছে।
এই আকাঙ্ক্ষার অবশ্য সীমাবদ্ধতাও আছে। তুরস্কের অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপোড়েন তার পররাষ্ট্রনীতির পরিসরকে প্রভাবিত করে। ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা পাকিস্তান।
এই জায়গাতেই বর্তমান ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের মূল দ্বন্দ্বটি ধরা পড়ে। দুই দেশের মধ্যে গভীর মতপার্থক্য আছে। আবার একে অপরকে উপেক্ষা করার মতো বাস্তবতাও নেই।
পুরোনো সম্পর্কের গল্প
ভারত ও তুরস্কের সম্পর্ক আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার চেয়েও পুরোনো। ভারতীয় উপমহাদেশের সঙ্গে উসমানীয় সাম্রাজ্যের যোগাযোগ ছিল বাণিজ্য, ধর্ম, সংস্কৃতি ও কূটনীতির নানা স্তরে। বিংশ শতকের গোড়ায় এই যোগাযোগ নতুন রাজনৈতিক অর্থ পায়।
১৯১২ সালের প্রথম বলকান যুদ্ধের সময় ভারতীয় মুসলিম সমাজের উদ্যোগে ডা. মুখতার আহমেদ আনসারির (এম এ আনসারি) নেতৃত্বাধীন একটি চিকিৎসা মিশন তুরস্কে যায়। এটি মূলত আহত উসমানীয় সেনাদের চিকিৎসায় সহায়তা করার জন্য পাঠানো হয়েছিল। খিলাফত আন্দোলনের আগের এই সময়ের ঘটনাটি ভারতীয় উপমহাদেশে তুরস্কের প্রতি সহমর্মিতার গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর তুরস্কের প্রতি ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা করেছিল ভারতীয় মুসলিম সমাজের বড় একটি অংশ। খিলাফত আন্দোলনের সঙ্গেও তুরস্কের প্রশ্নটি গভীরভাবে যুক্ত ছিল। মহাত্মা গান্ধীও তুরস্কের প্রতি ব্রিটিশ নীতির বিরোধিতা করেছিলেন। ভারতে গড়ে ওঠা খিলাফত আন্দোলনের প্রতিও তিনি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
অর্থাৎ ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের শুরুতেই ছিল একধরনের ঐতিহাসিক সহমর্মিতা; কিন্তু ১৯৪৭ সালের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতির হিসাব বদলে যায়।
হিসাব বদলে গেল
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে, ভারত ও পাকিস্তান দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শীতল যুদ্ধের সময় পাকিস্তান পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশ হয়ে ওঠে। তুরস্কও ন্যাটোর সদস্য হিসেবে পশ্চিমা বলয়ের গুরুত্বপূর্ণ দেশ ছিল। ফলে ভারত ও তুরস্কের সম্পর্কের ওপর পাকিস্তান-ফ্যাক্টর ক্রমেই প্রভাবশালী হয়ে ওঠে।
কাশ্মীর প্রশ্ন এই দূরত্বকে আরও স্পষ্ট করে। ভারত কাশ্মীরকে নিজের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ের অংশ হিসেবে দেখে। তুরস্ক বরং কাশ্মীর নিয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং বিভিন্ন সময়ে পাকিস্তানের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
এখানেই ঐতিহাসিক যোগাযোগের সঙ্গে নতুন ভূরাজনীতির সংঘাত শুরু হয়।

শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান (ডানে) ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ব্রিকস সম্মেলনে দলীয় ছবি তোলার আগে।
এরদোয়ানের তুরস্ক ও নতুন সম্ভাবনা
এরদোয়ানের নেতৃত্বে তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও সক্রিয় ও বহুমুখী প্রবণতা দেখা যায়। ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেও আঙ্কারা মধ্যপ্রাচ্য, ককেশাস, মধ্য এশিয়া, আফ্রিকা এবং এশিয়ার বিভিন্ন দেশে নিজের প্রভাব বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। ভারতও সেই বৃহত্তর কৌশলের বাইরে নয়।
দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক সব সময় মসৃণ না হলেও বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বেড়েছে। ভারতীয় দূতাবাসের তথ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ রাজনৈতিক দূরত্ব থাকলেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক পুরোপুরি থেমে যায়নি।
২০১৯ সাল সম্পর্কের বড় মোড়
২০১৯ সালে ভারত সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদের কার্যকারিতা বাতিল করে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করার পর ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের টানাপোড়েন আরও প্রকাশ্য হয়ে ওঠে। এরদোয়ান ভারতের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন এবং কাশ্মীর নিয়ে পাকিস্তানের অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানান।
দিল্লি এতে অসন্তুষ্ট হয়। ভারতের দৃষ্টিতে কাশ্মীর প্রশ্নে তুরস্কের অবস্থান ছিল ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এবং দ্বিপক্ষীয় বিরোধকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নেওয়ার চেষ্টা। তবে সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। কূটনীতির দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
পাকিস্তান: সম্পর্কের কেন্দ্রে থাকা তৃতীয় দেশ
ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের একটি অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো এখানে প্রায় সব সময় একটি তৃতীয় দেশ উপস্থিত থাকে। সেটি পাকিস্তান।
তুরস্ক ও পাকিস্তানের রাজনৈতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা। সামরিক সরঞ্জাম, যুদ্ধজাহাজ, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং ড্রোনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা ভারতের নজরে এসেছে।
২০২৫ সালের জুলাইয়ে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়াশার গুলের পাকিস্তানে গিয়ে প্রতিরক্ষা শিল্প, বিমান প্রযুক্তি ও ড্রোনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন।
তুরস্কের জন্য পাকিস্তান শুধু একটি ঘনিষ্ঠ মুসলিম দেশ নয়। দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও পাকিস্তান একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। অন্যদিকে ভারতের কাছে তুরস্ক–পাকিস্তান প্রতিরক্ষা সহযোগিতা সরাসরি নিরাপত্তার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আঙ্কারা ইসলামাবাদের যত কাছে যায়, দিল্লির সঙ্গে তার সম্পর্কের ওপর তত চাপ তৈরি হয়।
পুরোনো বিরোধ নতুন মাত্রা পেল
২০২৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসের ভারত–পাকিস্তান সংঘাত এই সম্পর্কের টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করে। ওই বছরের ২২ এপ্রিল কাশ্মীরে হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা দ্রুত বাড়ে। ৭ মে ভারত পাকিস্তানের ভেতরে সামরিক অভিযান চালায়। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র, বিমান ও ড্রোন ব্যবহার করে সংঘর্ষ হয়।
ড্রোনের প্রশ্নটি শুধু সামরিক প্রযুক্তির বিষয় নয়, ভারত–তুরস্ক সম্পর্কের বৃহত্তর কৌশলগত টানাপোড়েনের প্রতীক হয়ে ওঠে।

সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকে করমর্দন করছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।
ভারতের জন্য তুরস্কের গুরুত্ব শুধু পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্কের কারণে নয়। তুরস্ক এমন একটি ভূগোলে অবস্থিত, যেখানে কৃষ্ণসাগর, ককেশাস, মধ্যপ্রাচ্য, বলকান ও ইউরোপ একে অপরের সঙ্গে যুক্ত।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
