মানবসভ্যতার জন্মলগ্ন থেকেই প্রতিটি প্রযুক্তিগত বিপ্লব মানুষের জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে। চাকা থেকে ইন্টারনেট আর এখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই, প্রতিটি নতুন প্রযুক্তি আমাদের যেমন উন্নতির নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, তদ্রূপ অপব্যবহারের নতুন ঝুঁকিও তৈরি করেছে। একবিংশ শতাব্দীতে প্রযুক্তি শুধু আমাদের কাজের ধরন পাল্টাচ্ছে না, বরং আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস, আবেগ ও আচরণকেও প্রভাবিত করছে।
একসময় মানুষের বিবেক ও আচরণ গড়ে উঠত মূলত পরিবার, সমাজ, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও চারপাশের পরিবেশের প্রভাবে। এখন সেই প্রভাবের একটি বড় অংশ চলে এসেছে অ্যালগরিদমের হাতে। একজন মানুষ যে খবরটি পড়ছেন, যে ভিডিওটি দেখছেন কিংবা যে রাজনৈতিক বক্তব্যটি তার মনে গেঁথে যাচ্ছে, সেগুলো সবসময় তার নিজের আগ্রহের ফল নয়। এর পেছনে থাকতে পারে দূরের কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, কোনো অ্যালগরিদম কিংবা পরিকল্পিত ও সংগঠিত প্রচারণার অংশ।
বর্তমান পৃথিবীতে তথ্য একটি বিশাল কৌশলগত সম্পদ। খনিজ সম্পদের পাশাপাশি মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য, অভ্যাস, ভয়, বিশ্বাস ও রাজনৈতিক আদর্শও এখন মহামূল্যবান সম্পদে পরিণত হয়েছে। যারা মানুষের কাছে কোন তথ্য পৌঁছাবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে, তারাই মানুষের বিবেক, চিন্তা ও সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করার সুযোগ পাচ্ছে।
আমরা প্রতিদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য পোস্ট, ছবি, ভিডিও, সংবাদ ও মন্তব্য দেখি। এর কিছু সত্য, কিছু সম্পূর্ণ মিথ্যা, আবার কিছু সত্যের সঙ্গে মিথ্যা মিশিয়ে তৈরি করা। অনেক সময় পুরোনো কোনো ছবি নতুন ঘটনার নামে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, সম্পাদিত ভিডিওকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয় কিংবা কোনো ব্যক্তির নামে ভুয়া বক্তব্য তৈরি করা হয়।
আমরা হয়তো মনে করি, একটি পোস্ট বা ভিডিও দেখে আমাদের কীইবা হবে? কিন্তু মনোবিজ্ঞানের ইলিউশন অব ট্রুথ ইফেক্ট (Illusion of Truth Effect) অনুসারে কোনো তথ্য বারবার চোখের সামনে এলে মানুষ তার সত্যতা যাচাই না করেও একসময় সেটিকে সত্য বলে মনে করতে শুরু করে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তিন হাজারের বেশি পুলিশ নিহত হওয়ার মিথ্যা দাবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, যা একদল মানুষ বিশ্বাসও করেছে। সমস্যা হলো, আমরা অনেক সময় বিশ্বাস করার আগে যাচাই করি না; বরং নিজের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে গেলে তথ্যটি দ্রুত শেয়ার করি।
এখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কয়েক সেকেন্ডেই এআই এমন লেখা, ছবি, ভিডিও ও কণ্ঠস্বর তৈরি করতে পারে, যা আসল না নকল বোঝা কঠিন। উদ্বেগের বিষয়, এআইয়ের সক্ষমতা এত দ্রুত বাড়ছে যে প্রভাবশালী এআই কোম্পানিগুলো নিজেরাই এখন নিয়ন্ত্রণের জন্য আবেদন করছে।
অনেকে এআইকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ মনে করেন। কিন্তু কোনো এআইই শূন্য থেকে তৈরি হয়নি। এর প্রশিক্ষণ-তথ্য, অ্যালগরিদম, নিরাপত্তা নীতি, আইনগত সীমাবদ্ধতা এবং নির্মাতাদের সিদ্ধান্ত এর উত্তরের ওপর প্রভাব ফেলে। যেমন ডিপসিককে ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন স্কয়ারের ঘটনা কিংবা আমেরিকার এআইগুলোকে গাজায় মানবাধিকার লঙ্ঘন বা গণহত্যার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে অনেক ক্ষেত্রে এআইগুলো উত্তর সীমিত করে বা এড়িয়ে যায়। তাই এআইকে চূড়ান্ত সত্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার না করে তাকে শুধু তথ্যের সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা উচিত, নইলে মানবসভ্যতার বিপর্যয় ঘটবে।
অন্যদিকে, এআই নিজেই এখন অপতথ্য তৈরির শক্তিশালী হাতিয়ার। এর সাম্প্রতিক বাংলাদেশি উদাহরণ দিয়েছে আমেরিকান এআই প্রতিষ্ঠান এন্থ্রোপিকের থ্রেট ইন্টেলিজেন্স রিপোর্ট। গাইবান্ধার এক ব্যক্তি ২৯টি ক্লড অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে শত শত গুজবের শিরোনাম, বয়ান ও ছবি তৈরি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়াতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, সহজলভ্য এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে এখন একজন ব্যক্তিও বড় আকারের রাজনৈতিক অপতথ্য প্রচার চালাতে পারেন।
এ সমস্যা শুধু বাংলাদেশের নয়, উন্নত বিশ্ব থেকে অনুন্নত দেশ সর্বত্রই প্রকট। ২০১৮ সালের ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি থেকে জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যক্তিগত তথ্য কীভাবে রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হতে পারে। মানুষের পছন্দ, আচরণ ও রাজনৈতিক প্রবণতা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর জন্য আলাদা বার্তা তৈরি করা হয়েছিল, ফলে রাজনৈতিক প্রচারণা হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনস্তাত্ত্বিক প্রচারণা।
আবার মিয়ানমারে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ঘৃণামূলক বক্তব্য, গুজব ও অপতথ্য রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জনমত উসকে দিতে ভূমিকা রেখেছিল। ভারতেও মুসলিমদের নিয়ে গুজব ও অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এমনকি বাংলাদেশকে নিয়েও নিয়মিত অপতথ্য প্রচার করা হচ্ছে। তাছাড়া এখন প্রায় প্রতিটি দেশের নির্বাচনেই ভুয়া অ্যাকাউন্ট, অনলাইন বিজ্ঞাপন ও সংগঠিত প্রচারণার মাধ্যমে সামাজিক বিভাজন আরো তীব্র হচ্ছে।
যুদ্ধ এখন শুধু ট্যাংক, যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের মন ও বিবেকও যুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। গাজা যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারে ইসরাইল ইনফ্লুয়েন্সারদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। তাই ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ার বা কগনিটিভ ওয়ারফেয়ারে তথ্য, অ্যালগরিদম, এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।এখানে
লক্ষ্য সবসময় মানুষকে একটি নির্দিষ্ট মত গ্রহণ করানো নয়। কখনো লক্ষ্য হতে পারে মানুষকে এতটাই বিভ্রান্ত ও বিভক্ত করা, যাতে সে কোনো প্রতিষ্ঠান বা অন্য মানুষকেই বিশ্বাস না করে। এ ক্ষেত্রে ধর্ম, বিশেষ করে ইসলামকে টার্গেট করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গোপসাগর ও এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ছে। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন শক্তির অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও বাংলাদেশ ক্রমেই যুক্ত হচ্ছে।
একই সঙ্গে রাজনৈতিক মেরূকরণ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমনির্ভর তথ্যগ্রহণ এবং দুর্বল তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি আমাদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কোনো রাষ্ট্র, রাষ্ট্র-সমর্থিত গোষ্ঠী কিংবা অন্য কোনো স্বার্থান্বেষী পক্ষ বাংলাদেশের জনমতকে যে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে, এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে অনেকেই একমত হবেন। এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি গুজবের পেছনে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা রয়েছে। তবে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও তথ্য যাচাইয়ে দুর্বল সমাজ তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকে। আর প্রযুক্তি তাদের এসব প্রচেষ্টাকে আরো দ্রুত ও সস্তা করে দিচ্ছে।
গুজব ও অপতথ্যের বিস্তার আজ একধরনের সামাজিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে। অন্য দেশের পুরোনো ছবি বা ভিডিও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনা বলে ছড়ানো হচ্ছে, তৈরি হচ্ছে ভুয়া ফটোকার্ড, আবার সম্পাদিত ভিডিও ও প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন বক্তব্যও সত্য হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, ইদানীং প্রথম সারির অনেক গণমাধ্যমও মিসলিডিং ফটোকার্ড, ব্যক্তিটার্গেট করে অপতথ্য ছাড়াচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এসব তথ্য যাচাই ছাড়াই মুহূর্তেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এর শিকার শুধু সাধারণ মানুষ নন; বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও টকশোতে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরাও কখনো তথ্য যাচাই না করে ভুল তথ্য শেয়ার বা প্রচার করেন, যা বিভ্রান্তি আরো বাড়ায়।
উদাহরণ হিসেবে, দ্য ডিসেন্টের একটি ফ্যাক্টচেকে বলা হয়, জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে রক্তাক্ত এক তরুণীর ছবি ব্যবহার করে একটি ভুয়া দাবি ছড়ানো হয়েছিল। পরে ঢাকার দুটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই অধ্যাপক সেই ফটোকার্ড শেয়ার করেন, যা ফ্যাক্টচেকে ভুল প্রমাণিত হয়। এটি খুবই উদ্বেগজনক। কারণ যারা শিক্ষার্থী ও সমাজকে চিন্তার দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথা, তারাই যদি তথ্য যাচাইয়ের ন্যূনতম দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করা কঠিন।
রাজনৈতিক মতের কারণে যখন মানুষ সত্য যাচাই না করে কোনো তথ্য বিশ্বাস করতে শুরু করে, তখন একজন শিক্ষিত মানুষও অজান্তেই অপতথ্য ছড়িয়ে দিতে পারেন। মত বা আদর্শ যা-ই হোক, সত্য যাচাই ও সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা সবারই থাকা উচিত।
এখন বাংলাদেশের প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, বরং এর অপব্যবহার মোকাবিলায় শক্তিশালী ডিজিটাল রেজিলিয়েন্স গড়ে তোলা জরুরি। শিক্ষায় ডিজিটাল সাক্ষরতার পাশাপাশি তথ্য যাচাই, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা বোঝা, এআইয়ের উত্তর যাচাই ও ডিপফেক শনাক্ত করার দক্ষতা শেখাতে হবে। রাষ্ট্রকে সময়োপযোগী নীতিমালা করতে হবে, তবে তা যেন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য হুমকি না হয়। গণমাধ্যমকেও দ্রুততার চেয়ে তথ্যের নির্ভুলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। অপতথ্য, চরিত্রহনন, কৃত্রিম ভিডিও বা মানুষের ভয় ও ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে জনমত প্রভাবিত করা সাময়িক লাভ আনতে পারে, কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি করবে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার। তবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব আমাদের প্রত্যেকের। কোনো তথ্য দেখেই বিশ্বাস বা শেয়ার না করে উৎস যাচাই করা, প্রশ্ন করা এবং সত্যতা নিশ্চিত করা এখন শুধু সচেতনতার বিষয় নয়, একজন দায়িত্বশীল নাগরিকের দায়িত্বও বটে।
ভবিষ্যতের লড়াই তাই শুধু সীমান্তে নয়, মানুষের মনেও। শেষ পর্যন্ত প্রযুক্তি নয়, আমাদের সচেতনতা, যাচাই করার অভ্যাস ও বিবেকই ঠিক করবে আগামী দিনের বাংলাদেশ কেমন হবে।
লেখক : ম্যানেজার (রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট), সিসমার্ক লিমিটেড
