মরুর ফল সাম্মাম চাষে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন কামরুজ্জামানের

প্রতিবেদন:

·

,

একসময় যে জমি পড়ে থাকত, সেই জমিতেই এখন ঝুলছে সারি সারি বিদেশি ফল। সবুজ-হলুদ রঙের ফলগুলো দেখতে অনেকটা তরমুজের মতো। তবে নাম সাম্মাম পরিচিত ‘রক মেলন’ নামেও। গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বর্গা নেওয়া জমিতে এ ফলের চাষ করে নতুন সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখছেন কৃষি উদ্যোক্তা মো. কামরুজ্জামান খান।

উপজেলার সূর্যনারায়ণপুর গ্রামের বাসিন্দা কামরুজ্জামান তরগাঁও ইউনিয়নের উত্তর খামার এলাকায় জমি নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে সাম্মাম চাষ করেছেন। মালচিং ফিল্ম ব্যবহার করে গাছের পরিচর্যা করছেন তিনি। এরই মধ্যে বাগান থেকে প্রথম দফায় প্রায় ৫০ হাজার টাকার ফল বিক্রি করেছেন। তার প্রত্যাশা, সব ফল বিক্রি হলে মোট বিক্রি ৬-৭ লাখ টাকা ছাড়াতে পারে।

তবে এ প্রত্যাশার বিপরীতে এখন পর্যন্ত তার বিনিয়োগও কম নয়। কৃষকের হিসাবে, জমি, চারা, শ্রমিক, সার, সেচ, মালচিং ও পরিচর্যাসহ এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে।

সম্প্রতি তরগাঁওয়ের উত্তর খামার এলাকায় কামরুজ্জামানের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, জমির ওপর মালচিং ফিল্ম বিছানো। তার ওপর নির্দিষ্ট দূরত্বে লাগানো হয়েছে সাম্মামের চারা। লতাগুলো মাচায় উঠছে। কোনো গাছে ছোট ফল, আবার কোনো গাছে পরিপক্ব হওয়ার পথে বড় আকারের ফল ঝুলছে।

বাগানে শ্রমিকদের ব্যস্ততাও চোখে পড়ার মতো। কেউ আগাছা পরিষ্কার করছেন, কেউ গাছে পানি দিচ্ছেন, আবার কেউ ফল ও লতার পরিচর্যা করছেন।

কৃষক কামরুজ্জামান খান বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রায় চার লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রথম দফায় ৫০ হাজার টাকার মতো সাম্মাম বিক্রি করেছি। ফল পুরোপুরি বিক্রি হলে ছয় থেকে সাত লাখ টাকা বিক্রির আশা করছি।’

তিনি জানান, বাগানের উৎপাদিত ফল স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি ঢাকার আড়তে পাঠানো হচ্ছে। বর্তমানে পাইকারের কাছে প্রতি কেজি প্রায় ৮০-১০০ টাকা দরে সাম্মাম বিক্রি করছেন।

কামরুজ্জামান খান কাপাসিয়া কলেজ থেকে ডিগ্রি পাস করেছেন। চাকরি বা প্রচলিত পেশার বাইরে কৃষিকে আয়ের উৎস হিসেবে বেছে নিয়েছেন তিনি। তার দাবি, এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিজের পরিবারের পাঁচ সদস্যের সংসার চালানোর পাশাপাশি কয়েকজন শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে।কামরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষি অফিসের পরামর্শ নিয়ে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষ করছি। এখন পর্যন্ত লোকসান হয় নি। সামনে আরও বড় পরিসরে বিদেশি ফলের বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে।’

তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী জানুয়ারি থেকে বিদেশি ফলের আবাদ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি অফিসের অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ সৈয়দ শাকিল আহম্মেদ বলেন, ‘রক মেলন বা সাম্মাম চাষে সাধারণত ৭৫-৯০ দিন সময় লাগে। সঠিক পরিচর্যা ও বাজারদর পাওয়া গেলে প্রতি বিঘায় ২-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে। উৎপাদন খরচ হতে পারে প্রায় ৩০ হাজার টাকা, তবে বাস্তবে জমির ধরণ, শ্রম, উপকরণ ও ব্যবস্থাপনার ওপর খরচ কমবেশি হতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘সাম্মামে বেটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন সি, পটাশিয়াম, ফলিক অ্যাসিড, ক্যালসিয়াম ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। তবে এ ফসলের ক্ষেত্রে নিয়মিত পরিচর্যা, পানি ব্যবস্থাপনা ও রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ জরুরি।’

কৃষি কর্মকর্তা জানান, কাপাসিয়ার তরগাঁও, টোক, বারিষাব ও সনমানিয়া এলাকার পুরাতন ব্রহ্মপুত্র ও শীতলক্ষ্যা নদীর অববাহিকার দোআশ মাটি সাম্মাম চাষের জন্য উপযোগী হতে পারে।

সাম্মাম চাষে ফলন পাওয়ার পাশাপাশি কৃষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে বাজার। বর্তমানে কামরুজ্জামান তার উৎপাদিত ফল ঢাকার আড়তে পাঠাচ্ছেন। সেখানে প্রতি কেজি ৮০-১০০ টাকা পাওয়া গেলেও মৌসুমের শেষ পর্যন্ত একই দাম থাকবে কি না, তা নিশ্চিত নয়।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন কোনো ফলের বাণিজ্যিক চাষে উৎপাদন সফল হওয়ার পর বাজারজাত করণই বড় চ্যালেঞ্জ। ফল দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকায় সংগ্রহের পর দ্রুত পরিবহন ও বিক্রির ব্যবস্থা করতে হয়। একই সময়ে বাজারে সরবরাহ বেড়ে গেলে দাম কমার সম্ভাবনাও থাকে।

ফলে কামরুজ্জামানের বাগানে উৎপাদিত সাম্মামের প্রকৃত আর্থিক সাফল্য নির্ভর করবে শেষ পর্যন্ত কত কেজি ফল উৎপাদন হলো, কত দামে বিক্রি হলো এবং মোট ব্যয়ের পর হাতে কত টাকা থাকল তার ওপর।

নতুন এ ফলের বাগান দেখতে আশপাশের কৃষকেরাও আসছেন। কেউ জানতে চাইছেন চারা কোথা থেকে পাওয়া যায়, কেউ জানতে চাইছেন এক বিঘায় কত খরচ হয়। আবার অনেকে জানতে চাইছেন, কত দিনে ফল আসে এবং বাজারে কী দামে বিক্রি করা যায়।

কামরুজ্জামানের উদ্যোগ তাই শুধু একটি বাগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্থানীয় কৃষকদের মধ্যেও প্রচলিত ফসলের বাইরে নতুন ও উচ্চমূল্যের ফল চাষের বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হচ্ছে।

কৃষি বিভাগের পরামর্শ, বাজার বিশ্লেষণ এবং উৎপাদন খরচের হিসাব করে সাম্মাম চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কাপাসিয়ায় এ ফলের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তবে এক মৌসুমের ফলন ও বিক্রির হিসাব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য নির্ধারণের সুযোগ নেই।

বাগানে এখনো পরিপক্ব হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে অনেক ফল। সেগুলো বাজারে যাওয়ার পরই পরিষ্কার হবে। কাপাসিয়ার মাটিতে নতুন এ বিদেশি ফল কৃষকের জন্য শুধু নতুনত্ব, নাকি সত্যিই নতুন আয়ের পথ।