আমাদের ব্যক্তিগত এই তথ্যগুলো ঠিক কীভাবে ফোন থেকে পাচার হয়ে যায়, তার পেছনের যান্ত্রিক প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সুকৌশলী ও সূক্ষ্ম। ধরুন, আপনি ফোনে আবহাওয়া দেখার একটি সাধারণ অ্যাপ, টর্চলাইট কিংবা কোনো গেম ব্যবহার করছেন। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ মনে হলেও এই অ্যাপগুলোর ভেতরে লুকিয়ে থাকে ‘সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট কিট’ নামের বিশেষ একধরনের কোড। এই কোডগুলোর মূল কাজই হলো ব্যাকগ্রাউন্ডে আপনার প্রতি মুহূর্তের ভৌগোলিক অবস্থান বা জিপিএস স্থানাঙ্ক সংগ্রহ করা। এরপর আপনি যখনই কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করেন, মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের মধ্যে আপনাকে কোন বিজ্ঞাপনটি দেখানো হবে, তা নির্ধারণ করতে একটি ডিজিটাল নিলাম বসে; যাকে বলা হয় ‘রিয়েল-টাইম বিডিং’। আপনি স্ক্রিনে চোখ রাখার আগেই এই নিলামের আড়ালে আপনার ফোনের আইডেন্টিটি ও লোকেশন-সংক্রান্ত তথ্য শত শত বিজ্ঞাপন কোম্পানির কাছে পৌঁছে যায় এবং চোখের পলকে সম্পন্ন হয় তথ্যের কেনাবেচা।
এখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসেÑকোটি কোটি মানুষের এই বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত তথ্য আসলে কারা কিনছে এবং কেনইবা কিনছে? ডিজিটাল দুনিয়ায় এদের বলা হয় ‘ডেটা ব্রোকার’, যাদের মূল ব্যবসাই হলো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও বিক্রি করা। তারা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডিভাইসের লোকেশন ডেটা কিনে বিশাল এক ডেটাবেস তৈরি করে এবং তা বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান বা এজেন্সির কাছে বিক্রি করে। বর্তমানে এই ডেটা ব্রোকার শিল্পের আকার শতকোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে; যে কারণে এই তথ্য বা ডেটাকে এখন বলা হচ্ছে ‘নতুন যুগের তেল’। অনেক সময় কোম্পানিগুলো দাবি করে যে ডেটাবেস থেকে ব্যবহারকারীর নাম মুছে ফেলা হয়, কিন্তু সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা গাণিতিক যুক্তিতে প্রমাণ করেছেন যে, মাত্র তিন-চারটি লোকেশন পয়েন্টই একজন মানুষকে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করার জন্য যথেষ্ট। কারণ, অধিকাংশ মানুষ প্রতিদিন প্রায় একই রুট ও একই কর্মস্থল ব্যবহার করেন। ফলে নাম গোপন থাকলেও দৈনন্দিন চলাচলের পথ ট্র্যাক করে যেকোনো ব্যক্তিকে অতি সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব।
ব্যক্তিগত তথ্যের এই অবাধ বাণিজ্য শুধু সাধারণ গোপনীয়তা লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও এক বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তথ্যের এই অপব্যবহার ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকির সৃষ্টি করতে পারে। এ কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ট্রেড কমিশন এরই মধ্যে একাধিক ডেটা ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে এবং তাদের ওপর নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পাশাপাশি এই ডিজিটাল ঝুঁকি এড়াতে ব্যবহারকারী হিসেবে আমাদের নিজেদেরও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ঢালাওভাবে সব অ্যাপকে লোকেশন অ্যাক্সেস না দিয়ে শুধু ‘হোয়াইল ইউজিং দ্য অ্যাপ’ অপশনটি বেছে নেওয়া একটি বুদ্ধিমান সিদ্ধান্ত। এছাড়া ফোন থেকে অপ্রয়োজনীয় ফ্রি অ্যাপগুলো মুছে ফেলা এবং ফোনের প্রাইভেসি সেটিংসে গিয়ে ‘বিজ্ঞাপন ট্র্যাকিং সীমিত করুন’ অপশনটি চালু করার মাধ্যমে আমরা তথ্য পাচারের পথ অনেকটাই সংকুচিত করে আনতে পারি।
প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগে স্মার্টফোন ব্যবহারের সুবিধাগুলো আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না; তবে এর বিনিময়ে নিজের সত্তাকে পণ্যে পরিণত হতে দেওয়াও কোনো যুক্তিসংগত কাজ নয়। ডিজিটাল দুনিয়ায় এখন সবচেয়ে দামি পণ্য আপনার হাতের স্মার্টফোনটি নয়, বরং আপনি নিজে এবং আপনার রেখে যাওয়া প্রতিটি ডিজিটাল পদচিহ্ন। অনলাইনে আপনার রেখে যাওয়া তথ্যই মূলত বিশাল করপোরেট কোম্পানিগুলোর ব্যবসার সবচেয়ে বড় পুঁজি। তাই পরেরবার যখন কোনো সাধারণ অ্যাপ আপনার লোকেশন পারমিশন চাইবে, তখন নিজেকে অন্তত একবার প্রশ্ন করুন—সত্যিই কি অ্যাপটির আপনার অবস্থান জানার কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন আছে? আপনার সামান্য সচেতনতাই পারে ব্যক্তিগত জীবনের মহামূল্যবান গোপনীয়তা রক্ষা করতে। কারণ, এই অদৃশ্য ডিজিটাল নজরদারির পৃথিবীতে আপনার তথ্যের সবচেয়ে বড় সুরক্ষক দিনশেষে আপনি নিজেই।

মন্তব্য করুন