সার সংকটে কৃষকের কাহিল অবস্থা, উৎপাদন ব্যাহত

প্রতিবেদন:

·

কয়েকদিন ধরে চলা সার সংকট এখনো কাটেনি। মাঠপর্যায়ে চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না কৃষক। এতে কাহিল অবস্থা তাদের, কৃষি উৎপাদনে পদে পদে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। চলমান এ সার সংকটের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে চলতি বছরের আমন উৎপাদনে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কম হলে সরকারের আমদানিনির্ভরতা বাড়বে।

এদিকে সার সংকট পরিস্থিতি উত্তরণে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) তদারকি জোরদারের নিদের্শনা দিয়ে গত শনিবার কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে বার্তা দেওয়া হয়েছে। এদিন উচ্চপর্যায়ের আরেকটি তদারকি কমিটিও গঠন করেছে মন্ত্রণালয়।সূত্র জানায়, ইউরিয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নন ইউরিয়ার (টিএসপি ও ডিএপি) তীব্র সংকট চলছে। রোপা আমন ও বীজতলার মাটির উর্বরতা বৃদ্ধির জন্য ইউরিয়ার সঙ্গে ওই দুটি সারের যেকোনো একটি মিশিয়ে কৃষিজমিতে ব্যবহার করেন কৃষক। তাদের যুক্তি—এর ফলে ফসলের উৎপাদন বাড়ে। এ কারণে টিএসপি ও ডিএপির জন্য লাইনে দাঁড়াচ্ছেন তারা। কিন্তু বাড়তি দামেও মিলছে না ওই দুটি সার। ফলে ফসল উৎপাদনে এর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন খোদ কৃষকই।

কুড়িগ্রামের আদিতমারীর কৃষক রোকনুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, টিএসপি ও ডিএপি সার লাইনে দাঁড়িয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। ডিলার বলছেন, তাদের সরবরাহ করা হচ্ছে না। অথচ ইউরিয়া সারের প্রতি বস্তা ১,৩৫০ টাকা (প্রতি কেজি ২৭ টাকা), টিএসপি সার ১,৩৫০ টাকা (প্রতি কেজি ২৭ টাকা) এবং ডিএপি সার ১,০৫০ টাকা (প্রতি কেজি ২১ টাকা)। কিন্তু কিনতে গেলে বলা হচ্ছে সার নেই। বস্তাপ্রতি ৫০০-৭০০ টাকা বেশি দিলেও চাহিদার চেয়ে কম দেওয়া হচ্ছে। রোপা আমনে বীজতলার জন্য ইউরিয়ার বাইরে অন্য কোনো সারের চাহিদা থাকে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে কুড়িগ্রামের কৃষক আলম অভিযোগ করে আমার দেশকে বলেন, সার দিতে পারছে না বলেই ওই অজুহাত দাঁড় করানো হচ্ছে। ইউরিয়ার সঙ্গে নন ইউরিয়া মিশিয়ে জমিতে দেওয়া হলে মাটির উর্বরতা বাড়ে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে ফসল বেশি উৎপাদন হয়। টিএসপি ও ডিএপির সংকট থাকায় ইউরিয়ার সঙ্গে পটাশ জাতীয় দ্রব্য মিশিয়ে জমিতে ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছি।

মেসার্স আজমেরী ট্রেডাসের মালিক (সার ডিলার) আজমীর আলম পলাশ আমার দেশকে বলেন, সরকার থেকে মাসের প্রথমদিকে সার সরবরাহ করা হয়। এটা ১৫ দিন পর্যন্ত কৃষকের চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া যায়। এরপর থেকে সারের সংকট তৈরি হয়। এখন কিছুটা ক্রাইসিস রয়েছে। বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ নাকচ করে তিনি বলেন, অনেকেই আমাদের পরিচিত। এ সম্পর্কের কারণে দৈনিক কিছু কিছু সার কেনেন। দেখা যায়, এখান থেকে সরকারি মূল্যে সার কিনে বাইরে বেশি দামে বিক্রি করেন। এর দায় আমাদের না।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোপা আমন ও এর বীজতলার জন্য ইউরিয়ার প্রয়োজন হয়। এর পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে, কিন্তু এ সময়ে টিএসপি ও ডিএপির দরকার নেই। কিন্তু কৃষকরা ওই দুটির জন্য চাহিদা দিচ্ছেন। এতে মাঠপর্যায়ে সার সংকট নিয়ে হইচই পড়েছে। এ হযবরল অবস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, এজন্য দায়ী ডিলাররা।

বতর্মান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার সার ডিলার নিয়োগে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। এর আলোকে ডিলার নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়ায় পুরোনো ডিলাররা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্থিতিশীল করছে। এর সঙ্গে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক দলীয় প্রার্থীরাও যোগ দেওয়ায় সংকট প্রকট হয়েছে।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ সিরাজুল ইসলাম বলেন, রবি মৌসুমে টিএসপি ও ডিএপির চাহিদা থাকে। এ সময়ে ইউরিয়ার চাহিদাও থাকে। সারের মজুত পর্যাপ্ত রয়েছে, কিন্তু কিছু ডিলার সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাজার অস্তিতিশীল করে তুলেছে। এতে ভীত হয়ে কৃষক আগাম টিএসপি ও ডিএপি কিনতে ভিড় করছেন। ফলে নন ইউরিয়া সারের সরবরাহের চেয়ে চাহিদা বেশি আসায় তাদের প্রত্যাশিত সার পাচ্ছেন না কৃষক।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ