শোবার ঘরের বাতি নিভলেও জানালা দিয়ে ঢোকে সড়কের আলো, পাশে জ্বলে ফোনের পর্দা। আধুনিক জীবনে রাত আর পুরোপুরি অন্ধকার থাকে না।গবেষকরা বলছেন, বিশেষ করে নীল আলোর মাত্রা বেশি থাকা শীতল সাদা এলইডি রাতে দীর্ঘ সময় ব্যবহার করলে শরীরের স্বাভাবিক হরমোনছন্দে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক পর্যালোচনায় ফরাসি গবেষক ইভান তুইতু ও সেবাস্তিয়াঁ পয়েন্ট এলইডির নীল আলোকে সম্ভাব্য ‘এন্ডোক্রাইন ডিসরাপ্টর’ বা হরমোনব্যবস্থায় বিঘ্ন সৃষ্টিকারী হিসেবে বিবেচনার কথা বলেছেন। তাঁদের বিশ্লেষণে যা উঠে এসেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়েছে—এলইডির নীল আলোর কারণে মেলাটোনিন নিঃসরণ কমে যাওয়া। মেলাটোনিন ঘুম আনতে সাহায্য করে, এবং আমাদের দেহঘড়ির সময়ও ঠিক রাখে।চোখের রেটিনায় থাকা বিশেষ সংবেদনশীল কোষের মাধ্যমে মস্তিষ্কের ‘মাস্টার ক্লক’-এ সংকেত পাঠায় আলো। দিনের বেলা এই সংকেত প্রয়োজনীয়। কিন্তু রাতে উজ্জ্বল নীলসমৃদ্ধ আলো মস্তিষ্ককে দিনের ভুল বার্তা দেয়। ফলে মেলাটোনিনের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়, ঘুমের সময় পিছিয়ে যায় এবং কর্টিসল, ইনসুলিন ও গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণের দৈনিক ছন্দও বদলে দিতে পারে।সব এলইডি আলো অবশ্য এক রকম নয়। সাধারণত শীতল সাদা বাতিতে নীল আলোর অংশ উষ্ণ সাদা বাতির চেয়ে বেশি। আলো কতটা উজ্জ্বল, চোখের কত কাছে, কতক্ষণ এবং দিনের কোন সময়ে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর নির্ভর করে এর প্রভাব। দিনে নীল আলো জৈব ঘড়ির সঠিক তাল বজায় রাখতে সাহায্য করে। উদ্বেগটা রাতের অনুপযুক্ত আলো নিয়ে।
নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর রাতের কৃত্রিম আলোর প্রভাব নিয়ে ২০২৬ সালের আরেকটি পর্যালোচনায় অনিয়মিত বা দীর্ঘ মাসিক চক্র এবং হরমোনের পরিবর্তনের সম্ভাব্য যোগসূত্র পাওয়া গেছে। মস্তিষ্ক, পিটুইটারি গ্রন্থি ও ডিম্বাশয়ের পারস্পরিক সংকেতেও জৈব ঘড়ির গোলযোগে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এ বিষয়ে মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রমাণ কুব একটা পায়নি গবেষকরা। অন্য প্রাণীর ওপর গবেষণা ও পর্যবেক্ষণমূলক তথ্যই বেশি। রাতে কাজ, কম ঘুম, মানসিক চাপ ও খাদ্যাভ্যাসের মতো বিষয়ও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে। এলইডি বাতি ব্যবহার করলেই যে বন্ধ্যত্ব, পিসিওএস বা অন্য হরমোনজনিত রোগ হবে—এমন ধারণাও পুরোপুরি ঠিক নয়।
ঝুঁকি কমাতে সন্ধ্যার পর ঘরের আলো প্রয়োজনের চেয়ে উজ্জ্বল রাখবেন না। কম উজ্জ্বল ও উষ্ণ রঙের আলো ব্যবহার করুন। ঘুমের এক ঘণ্টা আগে ফোন-কম্পিউটারের ব্যবহার ও স্ক্রিনের উজ্জ্বলতা কমিয়ে নিতে পারে। শোবার ঘর যতটা সম্ভব অন্ধকার রাখা জরুরি। সকালে কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোর সান্নিধ্যে থাকলে জৈব ঘড়ি ঠিক রাখতে তা সহায়তা করে। নারীদের ঋতৃস্রাবে অনিয়ম, দীর্ঘদিনের অনিদ্রা বা অন্য হরমোনজনিত উপসর্গ থাকলে তখন শুধু আলোকে দায়ী না করে বরং চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
