নদীতে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে পাহাড়ে বর্ষবরণ উৎসব শুরু

Hill peoples begin new year festival with river flower offerings

প্রতিবেদন:

·

, ,

নদীতে কলাপতা করে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে রোববার থেকে তিন দিনব্যাপী পাহাড়ের প্রধান সামাজিক উৎসব বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু সাংক্রাইন, সাংক্রান, পাতা-এর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে।

আজ ভোরের দিকে শিশু থেকে নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিধান করে গঙ্গা মা-এর উদ্দেশ্য উৎসব মুখর পরিবেশে পানিতে ফুল নিবেদন করেছেন।

তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের ১৩ ভাষাভাষির ১৫টি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পাহাড়ি জাতিসত্তাদের বসবাস। এসব জাতি গোষ্ঠীদের ঐতিহ্যবাহী প্রধান সামাজিক উৎসব হচ্ছে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, পাতা। তবে এ উৎসবকে বিভিন্ন সম্প্রদায় নানান নামে অভিহিত করলেও এর নিবেদন কিন্তু একই। তাই এ উৎসবটি আদিবাসী পাহাড়িদের শুধু আনন্দের নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সম্প্রদায়ের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ঐক্য ও মৈত্রী বন্ধনের প্রতীকও বটে। আজ ‘ফুল বিজু’র দিন ভোরে কলাপতায় ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করেছে পাহাড়ের বসবাসরত জনগোষ্ঠীরা।

সকালে বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু সাংক্রাইন, সাংক্রান, পাতার উদযাপন কমিটির উদ্যোগে রাঙামাটিতে কেন্দ্রীয়ভাবে সকালে রাজ বন বিহার পুর্বঘাটে পানিতে ফুল নিবেদন করা হয়।

এসময় উপস্থিত ছিলেন উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা, সদস্য সচিব ইন্টুমনি তালুকদার প্রমুখ। এছাড়া পৃথক পৃথকভাবে রাঙামাটি শহরে কোরানী পাহাড়, আসামবস্তি, গর্জনতলীসহ উপজেলার বিভিন্ন স্থানে উৎসব মুখর পরিবেশে পানিতে ফুল নিবেদন করেছেন পাহাড়ি সম্প্রদায়ের লোকজন। শহরের কোরানী পাহাড় এলাকায় ভোর থেকে শত শত নারী-পুরুষ ঐতিহ্যবাহী নিজস্ব পোশাকে কলাপাতায় করে কাপ্তাই হ্রদের পানিতে ফুল নিবেদন করেছেন।

শহরে কোরানী পাহাড়স্থ কাপ্তাই হ্রদে ফুল নিবেদনে আসা রিপা চাকমা, নন্দিতা চাকমা, রকি চাকমা জানান, উৎসবের প্রথম দিনে ‘ফুল বিজুতে’ পুরাতন বছরের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, গ্লানি, বেদনা, ভয়, অন্তরায় উপদ্রবকে মুছে ফেলে দিয়ে নতুন বছর যাতে সুখ-শান্তি, অনাবিল শান্তি বয়ে আনে সেই উদ্দেশ্য নিয়ে কলাপাতার মাধ্যমে পানিতে গঙ্গা মা এর উদ্দেশ্য ফুল নিবেদন করতে এসেছেন।

তারা আরও জানান, এ উৎসবটি পাহাড়ি সম্প্রদায়ের এ সংস্কৃতির অংশের একটি ধাপ। ‘ফুল বিজু’র দিন বিশেষ করে যুবক-যুবতীদের মেলা বসে থাকে। এ দিনে আনন্দ উপভোগ করে থাকেন। এছাড়া বিশেষ করে বিগত বছরে অনেক ঝামেলা হয়েছে। তাই ভগবান বুদ্ধের কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে নতুন বছর যাতে শান্তিতে কেটে যায়। এছাড়া ফুল বিজুর দিনে ফুল দিয়ে বাড়ি ঘর সাজানো হয়। তরুণ-তরুণীরা পাড়ায় পাড়ায় বৃদ্ধদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্নান করায়। সন্ধ্যায় বৌদ্ধ মন্দির, নদীর ঘাটে, বাড়ীতে প্রদীপ প্রজ্জ্বালন করে থাকে। কাল সোমবার উৎসবের দ্বিতীয় দিন মূল বিজু। এ দিনে বাড়িতে বাড়িতে চলে খাওয়া-দাওয়ার পর্ব ও আনন্দ-পূর্তি। ৩০ থেকে ৪০ প্রকারের তরকারি দিয়ে রান্না করা হয় ঐতিহ্যবাহী পাজন। পরদিন রয়েছে গজ্যাপজ্যা বিজু। এ দিনে বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনটিকে অর্থাৎ পহেলা বৈশাখকে চাকমারা গজ্যাপজ্যা বিজু, ত্রিপুরা-বিসিকাতাল, মারমা-সাংগ্রাই আপ্যাইনং বলে অভিহিত করে থাকেন। এদিনে পাহাড়িরা সারাদিন ঘরে বসে বিশ্রাম নিয়ে থাকে এবং বৌদ্ধ মন্দিরে গিয়ে প্রার্থনা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের বাড়িতে ডেকে নিয়ে এসে যত্নসহকারে ভাত খাওয়ানোসহ আর্শীবাদ নিয়ে থাকেন।

বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু সাংক্রাইন, সাংক্রান, পাতা উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ইন্টু মনি তালুকদার বলেন, প্রতি বছরের ন্যায় এবারও তিন পার্বত্য জেলায় বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু-বিষু-বিহু সাংক্রাইন, সাংক্রান, পাতা-এর উৎসব খুব সুন্দরভাবে উদযাপন করছি। এবার নতুন বছরের প্রত্যাশা হচ্ছে সকল গ্লানি মুছে ফেলে, অতীত সব কিছু ভুলে গিয়ে আমরা নতুনভাবে অগ্রসর হবো। পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল সম্প্রদায়কে নিয়ে সামনের দিনগুলোতে এগিয়ে যাবো এবং আমরা যাতে একিভূত হয়ে বিজুর দিনগুলো উপভোগ করতে পারি সে আহ্বান জানান।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ