দিল্লির মেহরৌলি এলাকায় মেট্রো স্টেশনের কাছে ফুটপাথে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল বছর দশেকের একটি মেয়ে। গত ২২ জুন ভোরবেলায় এক ট্যাক্সিচালক তাকে তুলে নিয়ে যায়। পরে তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়েটির লাশ গুরুগ্রাম-ফরিদাবাদ সীমান্তের কাছে ফেলে দেওয়া হয়। অভিযুক্তকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এই ঘটনা আরো একবার ভারতের রাজধানী দিল্লিতে গৃহহীন নাবালিকা ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।
রুজি-রুটির খোঁজে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ দিল্লিতে আসেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গে স্থায়ী বা অস্থায়ী বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে সক্ষম হন। তবে অনেকের পক্ষে মাথার ওপর ছাদ জোটানো সম্ভব হয় না। তারা একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাস্তার ধারে বা ফুটপাথের মতো জায়গায় দিন কাটান। মাথার ওপর ছাদ ছাড়াই দিল্লিতে এইভাবে ঠিক কত সংখ্যক মানুষ বাস করছেন, সে সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।
তবে গৃহহীন ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শহরি অধিকার মঞ্চ’-এর অনুমান, ২০২৪ সালে দিল্লিতে প্রায় তিন লাখ মানুষ গৃহহীন ছিলেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশ নারী। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা আরো বাড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। রাস্তায় যাদের ঘর, তারা প্রতিটা রাতই নতুন ভয়কে সঙ্গী করে শুতে যান। কখনো বিরূপ আবহাওয়া তাদের ঘুম কেড়ে নেয়। কখনো দ্রুত গতিতে ধেয়ে আসা যানবাহনের শিকার হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তবে মাথার উপরে ছাদহীনদের যে ভয়টা সবচেয়ে বেশি তাড়া করে ফেরে, তা হলো শ্লীলতাহানি এবং ধর্ষণের ঘটনা। এই ভয় এতটাই তীব্র যে অনেকে রাতগুলোয় অর্ধেক ঘুম আর অর্ধেক জেগে পুরো জীবন কাটিয়ে দেন।
মেহরৌলির ওই ঘটনার পর দিল্লির বিভিন্ন জায়গা ঘুরে রাস্তায় বসবাসকারী শিশু-কিশোরী ও নারীদের অবস্থার খোঁজ নেওয়া হয়েছে।
‘ঘর থাকলে স্ত্রীকে খোলা জায়গায় রাখতাম?’
ঘটনাস্থল সংলগ্ন লাডো সরাইয়ের ফুটপাতে যেতেই চোখে পড়ে সারি সারি মানুষ। এদের মধ্যে কয়েকজন নারী বেলুন বিক্রি করছিলেন, কেউ ফুল সাজাচ্ছিলেন, কেউ বা মূর্তি তৈরি করছিলেন। কেউ আবার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গে কাজে ব্যস্ত। ফুটপাথের ওপরেই রাখা তোশক। কোথাও লোহার তৈরি বেড়ার ওপর কাপড় শুকাচ্ছে। ছোট ছোট কৌটোয় রাখা খাবার-দাবার। তীব্র দাবদাহ থেকে রেহাই পেতে কেউ আবার সঙ্গে স্ট্যান্ড ফ্যান রেখেছেন।
এই ফুটপাথেই বেলুন বিক্রি করছিলেন পূজা নামে এক নারী। তিনি বলেন, ‘যতই রোদ হোক, বৃষ্টি হোক, দিন কোনোমতে কেটে যায়। আসল সমস্যা শুরু হয় রাতে। আশপাশ দিয়ে বহু লোক যায়। কেউ অশ্লীল কথা বলে, কেউ কাছে এসে বসে পড়ে। মাঝে মধ্যে অনেকে কাছাকাছি এসে শুয়ে পড়ে। মানা করলে আমাদের ধমক দিয়ে বলে—তুমি কি এই ফুটপাথ কিনে নিয়েছ?’
কাছেই বসে ছিলেন পূজার স্বামী রোশন। তিনি বলেন, ‘শ্লীলতাহানির বিষয় নিয়ে আর কী বলব! খালি কোনোমতে বেঁচে আছি। ঘর থাকলে কি আর আমার স্ত্রীকে এভাবে খোলা জায়গায় রাখতাম?’ রাতে কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন জানতে চাইলে রোশন বলেন, ‘কী করব? দিনের বেলায় অসম্পূর্ণ ঘুম পূরণ করি। কিন্তু রাত তো রাতই। চোখ লেগে যায়, আর তারপর ঠিক সেই একই ঘটনা ঘটে।’
রাজস্থানের ভিলওয়াড়ার বাসিন্দা এই দম্পতি প্রায় চার বছর আগে দিল্লি এসেছিলেন। পূজা বলেন, ‘আমারও এক মেয়ে আছে। তাকে আমি সঙ্গে এনেছিলাম। কিন্তু এখানে এই সমস্ত দেখার পর ওকে ওর দিদিমার কাছে রেখে আসতে হয়েছে। সেখানে অন্তত মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই তো আছে।’
বছর বারোর কিশোরী আভ্যা (নাম পরিবর্তন করা হয়েছে) একসময় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকতে গিয়েছিল। সে মৃদুস্বরে বলে, ‘হলেই বা কী করব। মেয়েদের জাত, এ সব তো হবেই। যতটা সম্ভব সাবধানে থাকি। পালা করে ঘুমাই আমরা। একজন তিন ঘণ্টা ঘুমায়, অন্যজন পরের তিন ঘণ্টা। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রাত কোনোমতে কেটে যায়।’
১২ বছরের আভ্যা থেকে শুরু করে ৫০ বছর বয়সি কৌশল—সবারই একই গল্প। তারা ঝলমলে রাজধানীর সেই অংশ, যা আড়ালে থাকলে তবেই দিল্লিকে দিল্লির মতো দেখায়।
প্রায় চার দশক ধরে গৃহহীন ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সমাজকর্মী ড. রাজেশ কুমার বলেন, ‘গৃহহীনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন নারীরা। এক্ষেত্রে বাচ্চা মেয়েরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়। ঘুমের মধ্যেই তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধ ঘটে। মাঝে মাঝে তাদের বিক্রিও করে দেওয়া হয়। মেহরৌলির ঘটনাটা বিচ্ছিন্ন নয়। এমনটা ঘটতেই থাকে, শুধুমাত্র অভিযোগ দায়ের করা হয় না। বাবা-মায়েরা জানেন না যে কিছু ঘটলে কীভাবে পুলিশের কাছে যেতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘যদি কোনো শিশু রাস্তায় একা থাকে, তবে তাকে অবিলম্বে শেল্টারে নিয়ে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। দিল্লিতে গৃহহীনদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্র কম। বিদ্যমান আশ্রয় কেন্দ্রগুলোর ক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।’
দিল্লি আরবান শেল্টার ইমপ্রুভমেন্ট বোর্ডের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে দিল্লিতে প্রায় ২০০টি স্থায়ী শেল্টার আছে। এর মধ্যে ১৫৫টি পুরুষদের জন্য, ২০টি পরিবারের জন্য এবং মাত্র ১৭টি আশ্রয়কেন্দ্র নারীদের জন্য সংরক্ষিত।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
