ইউরোপের প্রতিরক্ষায় ভরসা তুরস্ক

প্রতিবেদন:

·

ইউরোপের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় তুরস্কের গুরুত্ব দ্রুত বেড়ে চলেছে। সামরিক সক্ষমতা, প্রতিরক্ষা শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং কূটনৈতিক তৎপরতার কারণে দেশটি এখন ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। ন্যাটোর সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলন আয়োজক দেশ হিসেবে তুরস্ক এই পরিবর্তিত বাস্তবতাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনীর অধিকারী তুরস্ক গত এক দশকে নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে দেশটি নিজস্ব সামরিক চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ পূরণ করতে সক্ষম। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারেও দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটছে তুরস্কের অস্ত্র রপ্তানির। গত বছর দেশটির প্রতিরক্ষা রপ্তানি ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার ট্যাংক ধ্বংসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা তুরস্কের তৈরি বাইরাকতার টিবি-২ ড্রোন দেশটির প্রতিরক্ষা শিল্পের সবচেয়ে পরিচিত প্রতীক হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন, পোল্যান্ড, রোমানিয়া ও ক্রোয়েশিয়াসহ একাধিক দেশ ইতোমধ্যে এই ড্রোন সংগ্রহ করেছে।

শুধু ড্রোন নয়, তুরস্ক পোল্যান্ডে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও রাডার ব্যবস্থা, পর্তুগালের জন্য নৌবাহিনীর লজিস্টিক জাহাজ, স্পেনের জন্য উন্নত জেট প্রশিক্ষণ বিমান, ইরাকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইন্দোনেশিয়ায় যুদ্ধবিমান সরবরাহ করছে। এছাড়া স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (সিপ্রি) অনুযায়ী, পোল্যান্ড, এস্তোনিয়া, হাঙ্গেরি, আলবেনিয়া, কসোভো ও বসনিয়া-হার্জেগোভিনাও তুরস্ক থেকে অস্ত্র আমদানি করেছে।

তুরস্কের তৈরি বাইরাকতার টিবি-২ ড্রোন

ন্যাটোর বৃহৎ প্রতিরক্ষা প্রকল্পেও তুরস্কের প্রতিষ্ঠান রকেটসান ও আসেলসানের মতো কোম্পানিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা সক্ষমতা এবং আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উন্নয়নে কাজ করবে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও তুরস্কের সক্রিয়তা বেড়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের শুরুতে শান্তি আলোচনা আয়োজন, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতনের পর নতুন প্রশাসনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংযোগ স্থাপন এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংকটে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে দেশটি নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে তুরস্কের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী সালিহ আইহান বলেন, তুরস্ক আর শুধু নিজের সীমান্ত রক্ষাকারী দেশ নয়; এটি এখন বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী একটি রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।

ন্যাটো সম্মেলনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

সম্মেলনে যুক্তরাজ্য ও তুরস্ক নতুন প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা চুক্তির ঘোষণা দিয়েছে। চুক্তির আওতায় গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়সহ দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার নিরাপত্তা হুমকি এবং ন্যাটো সদস্যদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর চাপের কারণে ইউরোপ এখন তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে আগ্রহী। ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান, কৃষ্ণসাগর, পূর্ব ভূমধ্যসাগর, মধ্যপ্রাচ্য ও ককেশাস অঞ্চলের সংযোগ এবং বসফরাস ও দারদানেলস প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ তুরস্ককে অনন্য কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।

একসময় পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে দূরত্ব তৈরি হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তুরস্ককে ইউরোপীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এই অবস্থান নতুন ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।

আমেরিকান ইঞ্জিন ও তুরস্কের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ‘কান’ যুদ্ধবিমান।

যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি ইঞ্জিনের ওপর এখনও তুরস্কের নিজস্ব কান (কেএএএন) যুদ্ধবিমান প্রকল্প নির্ভরশীল। একই সঙ্গে ইউরোপের সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক জোরদার হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অসন্তোষের আশঙ্কাও রয়েছে। অন্যদিকে, ইসরাইল তুরস্ককে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সরবরাহের সম্ভাবনার বিরোধিতা করছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে দাবি করেছেন, এমন সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্পমেয়াদে ইউরোপের নিরাপত্তা কৌশলে তুরস্ক অপরিহার্য অংশীদার হয়ে উঠেছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে মধ্যপ্রাচ্য ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতির জটিলতা তুরস্ককে ঘিরে নতুন চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করতে পারে।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ