মানুষ পৃথিবীতে জ্ঞান, সম্পদ, পদমর্যাদা ও সাফল্যের পেছনে নিরন্তর ছুটে চলে। সমাজও অনেক সময় ধনী, প্রভাবশালী বা উচ্চশিক্ষিত ব্যক্তিকেই সবচেয়ে বুদ্ধিমান বলে মনে করে। কিন্তু ইসলাম মানুষের বুদ্ধিমত্তার একটি ভিন্ন ও গভীর মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। যে ব্যক্তি মৃত্যুর অনিবার্য বাস্তবতাকে স্মরণ রাখে, নিজের আমলের হিসাব নেয় এবং আখিরাতের সফলতার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে— রাসুলুল্লাহ (সা.) তার কাছেই প্রকৃত প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার স্বীকৃতি দিয়েছেন।প্রকৃত বুদ্ধিমানের পরিচয়
হজরত আবদুল্লাহ ইবন ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন— ‘মুমিনদের মধ্যে সর্বোত্তম কে?’ তিনি বললেন, ‘যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।’ এরপর জিজ্ঞাসা করা হলো— ‘সবচেয়ে বুদ্ধিমান কে?’ তিনি বললেন—
أَكْثَرُهُمْ لِلْمَوْتِ ذِكْرًا، وَأَحْسَنُهُمْ لِمَا بَعْدَهُ اسْتِعْدَادًا، أُولَئِكَ الْأَكْيَاسُ
‘যারা মৃত্যুকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে এবং মৃত্যুর পরবর্তী জীবনের জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি গ্রহণ করে, তারাই প্রকৃত বুদ্ধিমান।’ (ইবন মাজাহ ৪২৫৯)
কুরআনের শিক্ষা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ ۖ ثُمَّ إِلَيْنَا تُرْجَعُونَ
‘প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে। অতঃপর তোমাদেরকে আমার কাছেই ফিরিয়ে আনা হবে।’ (সুরা আল-আনকাবূত: আয়াত ৫৭)
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ ۖ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۚ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন লক্ষ্য করে দেখে যে, সে আগামী দিনের জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে। আর আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয়ই তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা আল-হাশর: আয়াত ১৮)মৃত্যুস্মরণ কেন জরুরি?
মৃত্যুর স্মরণ মানুষের অন্তরকে নরম করে, অহংকার দূর করে, গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে এবং নেক আমলের প্রতি আগ্রহী করে তোলে। যে ব্যক্তি জানে তার প্রতিটি কাজের হিসাব একদিন আল্লাহর সামনে দিতে হবে, সে অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখে এবং ইবাদত, সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবসেবায় যত্নবান হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—
أَكْثِرُوا ذِكْرَ هَاذِمِ اللَّذَّاتِ
‘তোমরা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিনষ্টকারী (মৃত্যু)-এর স্মরণ অধিক পরিমাণে কর।’ (তিরমিজি ২৩০৭, নাসাঈ ১৮২৪)
পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আখিরাত চিরস্থায়ী। তাই প্রকৃত বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি, যিনি সাময়িক দুনিয়ার মোহে বিভোর না হয়ে চিরস্থায়ী জীবনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেন।
ইসলামের দৃষ্টিতে প্রকৃত বুদ্ধিমত্তা কেবল জাগতিক জ্ঞান বা সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য জীবনকে পরিচালিত করাই প্রকৃত প্রজ্ঞা। মৃত্যুর কথা স্মরণ করা হতাশার বিষয় নয়, বরং এটি মানুষকে সৎপথে অবিচল রাখে, গুনাহ থেকে দূরে রাখে এবং আখিরাতমুখী জীবন গঠনে উদ্বুদ্ধ করে। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের আমলের হিসাব গ্রহণ করি, আল্লাহর কাছে তাওবা করি এবং সেই দিনের জন্য প্রস্তুতি নিই, যেদিন ধন-সম্পদ বা সন্তান-সন্ততি নয়—শুধু ঈমান ও নেক আমলই আমাদের উপকারে আসবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত বুদ্ধিমান বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমিন।
এ এম
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
