অ্যান কারসন
‘৮ অক্টোবর সকালে রান্নাঘরে বসে হাতে এক কাপ চা আর ক্র্যাকার নিয়ে লন্ডন রিভিউ অব বুকস পড়ছিলাম। খেয়াল করলাম, মেঝেটা একটু ঝাড়ু দেওয়া দরকার। তাই চা রেখে চট করে উঠে দাঁড়ালাম। ঠিক সেই মুহূর্তে ফোন আসে। মেঝে আর ঝাড়ু দেওয়া হলো না। একের পর এক ফোন আসছিল, আর আমি কেটে দিচ্ছিলাম। ফোন বাজলে সাধারণত আমি ফোন বন্ধ করে দিই। পরে ফোনটি রিসিভ করেন আমার স্বামী রবার্ট কারি। তিনি আমাকে দিয়ে ফিরতি ফোন করান। পুরো ব্যাপারটা একটু পাগলামি মনে হচ্ছে।’ এভাবেই নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন এবারের নোবেলজয়ী অ্যান কারসন।
২০২৬ সালের সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কানাডার কবি ও প্রাবন্ধিক অ্যান কারসন। সাহসী ও উদ্ভাবনী সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ বৃহস্পতিবার সুইডিশ একাডেমি এ পুরস্কারজয়ীর নাম ঘোষণা করে।
নোবেল পুরস্কার ঘোষণার পরপরই এক সাক্ষাৎকারে কারসন জানান, নোবেল কমিটি থেকে যখন ফোন আসে, তখন তিনি লেখালেখি করছিলেন না; বরং মেঝে ঝাড়ু দেওয়ার কথা ভাবছিলেন। কী অদ্ভুত বিষয়, তাই না! কানাডার রেইকিয়াভিকে সমুদ্রের ধারের বাড়িতে ঘটে এসব কাণ্ড।
৭৬ বছর বয়সি অ্যান তৃতীয় কানাডীয় সাহিত্যিক, যিনি নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন। এর আগে ১৯৭৬ সালে সল বেলো এবং ২০১৩ সালে অ্যালিস মুনরো সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন।
অ্যান কারসনের কাছে জানতে চাওয়া হয়, এই নোবেল পুরস্কার তার কাছে কী অর্থ বহন করে। উত্তরে তিনি বলেন, পুরস্কারের অর্থ কীভাবে ব্যয় করবেন, সে বিষয়ে পরিকল্পনা শুরু করে দিয়েছেন। তার এক বন্ধুর একটি বাড়ি প্রয়োজন। আর তিনি সবসময় ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’কে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়ে থাকেন। এবারও সে ধরনের কিছু করবেন বলে ভেবেছেন।
পাশাপাশি উদীয়মান লেখকদের জন্য কিছু পরামর্শও দেন এই নোবেলজয়ী। এ ছাড়া তার সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে আগ্রহী পাঠকদের উদ্দেশে একটি পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ‘মাঝখানটা খুঁজে বের করো আর সেখান থেকেই শুরু করো।’
কানাডার টরন্টোতে ১৯৫০ সালের ২১ জুন জন্মগ্রহণ করেন অ্যান। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্য ও পৌরাণিক কাহিনির ওপর ভিত্তি করেই তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন। ১৯৮৬ সালে তার প্রথম বই এরোস দ্য বিটারসুইট প্রকাশিত হয়। তবে তার সবচেয়ে পরিচিত সাহিত্যকর্ম অটোবায়োগ্রাফি অব রেড। ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত এ উপন্যাস প্রাচীন গ্রিক কবি স্টেসিকোরাসের সাহিত্যকর্ম থেকে অনুপ্রাণিত। ২০০১ সালে অ্যান তার দ্য বিউটি অব দ্য হাজব্যান্ড কাব্যগ্রন্থের জন্য প্রথম নারী হিসেবে টি এস এলিয়ট পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি গুগেনহাইম ও ম্যাকআর্থার ফেলোশিপেও ভূষিত হন।
নাভি পিল্লাই
এ বছর আরো একজন নারী পেয়েছেন নোবেল পুরস্কার। আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠা ও বিশ্বশান্তিতে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার খ্যাতিমান মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই।
পুরস্কার পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের কাছে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন নাভি পিল্লাই। তিনি জানান, প্রথমে তার মনে হয়েছিল, এটি হয়তো রসিকতা। একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে তিনি বিষয়টি যাচাই করতে চেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, গাজা বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর তার সাহসের প্রশংসা করা হয়েছে। কিন্তু সত্য বলার জন্য সাহসের প্রয়োজন কেন হবে, সেটিই তার বিস্ময়ের বিষয়।
শান্তিতে নোবেল পাওয়া নিয়ে কিছুটা রসিকতাও করেন পিল্লাই। তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি হাততালি দেন, তাহলে আমি এ পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’ তার এ মন্তব্যকে ২০২৫ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী মারিয়া কোরিনা মাচাদোর ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। কারণ, গত বছর শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর মাচাদো জানিয়েছিলেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে নোবেল পুরস্কার ভাগ করে নিতে চান। পরে এ বছরের জানুয়ারিতে হোয়াইট হাউসে গিয়ে নিজের নোবেল পুরস্কার ট্রাম্পের হাতে তুলে দেন।
বর্ণবৈষম্যের কঠিন সময়ে আইন পেশায় যুক্ত হয়ে বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়াই করেন পিল্লাই। তিনি বর্ণবাদবিরোধী নেতা ও দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলার আইনজীবী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। পরে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী বিচারপতি হন। পিল্লাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রধান ছিলেন নাভি পিল্লাই। ওই কমিশন গত বছর গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে উল্লেখ করে।
বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের আমলে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং ২০০৯ সালের বিডিআর বিদ্রোহের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন নাভি পিল্লাই।
২০১৩ সালের ৬ নভেম্বর জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে দেওয়া এক বিবৃতিতে পিল্লাই বলেন, ১৯৭১ সালের নৃশংসতার দায়মুক্তি মোকাবিলা এবং ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
