আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে মধ্যবর্তী নির্বাচন। এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বদলে যেতে পারে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য। প্রেসিডেন্ট নির্বাচন না হলেও কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে থাকবে, তা নির্ধারিত হবে ভোটে।
আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয় অনুমোদন এবং প্রশাসনের কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে কংগ্রেসের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এবারের নির্বাচন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও বড় পরীক্ষা।
নিজের চার বছরের মেয়াদের মাঝপথে এসে জনসমর্থনের কী অবস্থা, নির্বাচনে তারও একটি ইঙ্গিত মিলবে। অন্যদিকে, ভারতের সঙ্গে কী এই মধ্যবর্তী নির্বাচন?
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর পরপর প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তবে কংগ্রেসের নির্বাচন হয় প্রতি দুই বছর অন্তর। প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় বলে একে মধ্যবর্তী নির্বাচন বা ‘মিডটার্ম ইলেকশন’ বলা হয়।
এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে ভোট হবে। কংগ্রেসের দুই কক্ষের পাশাপাশি কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে গভর্নরসহ বিভিন্ন পদেও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ নির্ধারিত হবে না। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী ডনাল্ড ট্রাম্প তার মেয়াদের শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকবেন। তবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে তার আইন প্রণয়ন ও নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস কেন গুরুত্বপূর্ণ?
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসকে অনেকটা দেশটির আইনসভা হিসেবে বিবেচনা করা যায়। তবে এর কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি বাংলাদেশের সংসদসহ অন্যান্য দেশের আইনসভার চেয়ে আলাদা।
কংগ্রেসের দুটি কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট।
প্রতিনিধি পরিষদ: এ কক্ষে ভোটাধিকারপ্রাপ্ত সদস্য ৪৩৫ জন। অঙ্গরাজ্যগুলোর জনসংখ্যার ভিত্তিতে আসন বণ্টন করা হয়। সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। ফলে প্রতি দুই বছর অন্তর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে নির্বাচন হয়।
সিনেট: এ কক্ষে সদস্য ১০০ জন। প্রতিটি অঙ্গরাজ্য থেকে দুজন করে সিনেটর নির্বাচিত হন। তাদের মেয়াদ ছয় বছর। তবে সব আসনে একসঙ্গে নির্বাচন হয় না; প্রতি দুই বছর অন্তর সাধারণত প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।
আইন প্রণয়ন ও সরকারি নীতির অগ্রগতিতে দুই কক্ষেরই ভূমিকা রয়েছে। তাই প্রতিনিধি পরিষদে জয় পেলেই সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায় না, আবার সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও প্রতিনিধি পরিষদে তা নিশ্চিত হয় না।
কংগ্রেস হারালে চাপে পড়বেন ট্রাম্প?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল নির্ধারণ করবে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের বাকি সময়ে ট্রাম্প কংগ্রেসে কতটা সমর্থন পাবেন। রিপাবলিকানরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারলে ট্রাম্পের আইন প্রণয়ন ও নীতিগত কর্মসূচি এগিয়ে নেয়া তুলনামূলক সহজ হতে পারে। তবে নিজ দলের ভেতর মতবিরোধ থাকলে সেখানেও বাধা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ নিতে পারলে প্রশাসনের আইন প্রণয়নের উদ্যোগ বাধাগ্রস্ত করার সুযোগ পাবে। প্রতিনিধি পরিষদের বিভিন্ন কমিটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে গেলে সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনের কর্মকাণ্ড তদন্ত এবং পর্যালোচনার ক্ষমতাও বাড়বে।
অভিশংসন প্রক্রিয়াতেও কংগ্রেসের দুই কক্ষের ভূমিকা আলাদা। প্রতিনিধি পরিষদে অভিশংসনের অভিযোগ আনার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এরপর সিনেটে বিচার হয় এবং সেখানে দোষী সাব্যস্ত করে পদ থেকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে বিরোধীরা নির্বাচনে জয়ী হলেই যে অভিশংসন বা অপসারণ ঘটবে, এমন নয়।
কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিভক্ত হলে সরকারি ব্যয়, করনীতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতা করাও কঠিন হতে পারে।
কমছে ট্রাম্পের জনসমর্থন?
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ট্রাম্পের জনসমর্থন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। জনমত জরিপ সংকলনকারী ওয়েবসাইট সিলভার বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতে তার অনুমোদনের হার ছিল ৫০ শতাংশের কিছু বেশি। কিন্তু অক্টোবরের শুরুতে তা কমে প্রায় ৩৭ শতাংশে নেমে আসে। একই সময়ে ৬১ শতাংশ উত্তরদাতা তার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এই পরিসংখ্যান নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করে না।
তবে ভোটারদের মনোভাব বোঝার ক্ষেত্রে জনমত জরিপ গুরুত্বপূর্ণ একটি সূচক। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে যাবে।
কোন বিষয়গুলো প্রভাব ফেলবে ভোটে?
এ নির্বাচন কেবল ট্রাম্প ও তার বিরোধীদের মধ্যে জনপ্রিয়তার লড়াই নয়। ভোটাররা নিজ নিজ এলাকার প্রার্থীদের পাশাপাশি অনেক জায়গায় অঙ্গরাজ্য ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পদেও প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন।
জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা, অভিবাসন, শিক্ষা এবং অর্থনীতির গতিপথ ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কেউ ট্রাম্পের নীতির প্রতি সমর্থন জানাতে রিপাবলিকান প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। আবার কেউ প্রশাসনের ক্ষমতার ওপর ভারসাম্য ও নজরদারি নিশ্চিত করতে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন দিতে পারেন।
প্রার্থীদের অতীত কর্মকাণ্ড, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং নিজ নিজ এলাকার স্বার্থসংশ্লিষ্ট অবস্থানও ভোটের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। অঙ্গরাজ্য ও ভোটারগোষ্ঠীভেদে এসব ইস্যুর গুরুত্ব আলাদা হতে পারে। পুরো যুক্তরাষ্ট্রে একই প্রার্থী তালিকা বা অভিন্ন ব্যালট থাকে না; ভোটার কোথায় বসবাস করেন, তার ওপর নির্বাচনের ধরন নির্ভর করে।
কখন জানা যাবে ফল?
ভোটগ্রহণ হবে ৩ নভেম্বর। তবে ভোটের রাতেই সব আসনের ফল জানা যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। কোনো কোনো আসনে দ্রুত ফল নির্ধারিত হলেও ব্যবধান কম থাকলে গণনা শেষ করতে বেশি সময় লাগতে পারে। ডাকযোগে আসা ভোট গণনা, ফল যাচাই, পুনর্গণনা কিংবা আইনি চ্যালেঞ্জের কারণে চূড়ান্ত ফল ঘোষণায় বিলম্ব হতে পারে।
প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের পৃথক আসনগুলোর ফল যোগ করেই নির্ধারিত হবে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ কোন দলের হাতে যাচ্ছে। এক কক্ষে কোনো দল আসন বাড়ালেও অন্য কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নাও করতে পারে।
তাই এবারের নির্বাচনে শুধু জাতীয় পর্যায়ের মোট ভোটের হিসাব নয়, প্রতিটি আসনের ফলও গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হবে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মেয়াদের বাকি সময় কংগ্রেসে কতটা রাজনৈতিক সমর্থন পাবেন এবং তার নীতিগত কর্মসূচি বাস্তবায়নের পথ কতটা সহজ বা কঠিন হবে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
