ওবামা, আল-সাইয়েদ ও মামদানি: ডেমোক্র্যাটিক পার্টির রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ

প্রতিবেদন:

·

, ,

যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে আলোচনায় এখন তিনটি নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হচ্ছে—বারাক ওবামা, আবদুল আল-সাইয়েদ ও জোহরান মামদানি। তিনজনের রাজনৈতিক জীবনের সময়কাল, অভিজ্ঞতা ও অবস্থান এক নয়। তবে তাদের ঘিরে যে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে কিছু অভিন্ন প্রবণতা লক্ষ করা যায়।

বিশেষ করে প্রচলিত রাজনৈতিক ক্ষমতাকাঠামোর বাইরে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক উদ্বেগ, নতুন নেতৃত্বের উত্থান, বহুসাংস্কৃতিক সমাজের প্রতিনিধিত্ব এবং তৃণমূলভিত্তিক রাজনৈতিক সংগঠনের বিষয়গুলো সামনে এসেছে।

২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সিনেট আসনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেন ডেমোক্রেটিক প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও সিবিএস নিউজ ৪ নভেম্বর তার বিজয়ের খবর নিশ্চিত করে।

এর মধ্য দিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম হিসেবে সিনেটে নির্বাচিত হন। মিশিগানের এই নির্বাচন শুধু একটি সিনেট আসনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না; ডেমোক্রেটিক পার্টির ভেতরে প্রগতিশীল রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্বাচনী কৌশল নিয়েও এটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।

৪২ বছর বয়সী আবদুল আল-সাইয়েদ মিশিগানে মিসরীয় অভিবাসী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যে ডক্টরেট অর্জন করেছেন এবং ছিলেন রোডস স্কলার। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়াশোনা করেছেন।

রাজনীতিতে আসার আগে তিনি ডেট্রয়েটের স্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে তার রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে জনস্বাস্থ্য, চিকিৎসা ও সামাজিক নীতির সম্পর্ক রয়েছে।

২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক বাছাইপর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি আলোচনায় আসেন। সে নির্বাচনে গ্রেচেন হুইটমারের কাছে পরাজিত হলেও তার প্রচারণা প্রগতিশীল রাজনীতির একটি পরিচিত মুখ তৈরি করে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, সবার জন্য নিরাপদ পানি, শিক্ষাঋণমুক্ত উচ্চশিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং রাজনীতিতে করপোরেট প্রভাব কমানোর প্রতিশ্রুতি ছিল তার কর্মসূচির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ২০২৬ সালের সিনেট নির্বাচনে সেই রাজনৈতিক দর্শন আরও বিস্তৃত পরিসরে সামনে আসে।

তার নির্বাচনী প্রচারণার প্রধান স্লোগান ও অগ্রাধিকার ছিল ‘রাজনীতি থেকে অর্থের প্রভাব দূর করা, মানুষের পকেটে অর্থ রাখা এবং সবার জন্য মেডিকেয়ার’। মেডিকেয়ার ফর অলের মাধ্যমে সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা, চিকিৎসার ব্যয় ও ঋণের চাপ কমানো, ধনকুবেরদের সম্পদের ওপর কর আরোপ এবং করপোরেট অর্থের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করার কথা বলেছেন তিনি।

একই সঙ্গে ইসরাইলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা দেওয়া ও অস্ত্র বিক্রির বিরোধিতা করেছেন। তার বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের অর্থ বিদেশি সামরিক খাতে ব্যয় না করে দেশের মানুষের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ব্যবহার করা উচিত।

এই অবস্থান তাকে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশের সঙ্গে মতপার্থক্যের মুখোমুখি করেছে। ইসরাইল বিষয়ক তার বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা করেছেন কিছু ইহুদি নেতা ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ। বিশেষ করে তার প্রচারণাকে সমর্থনকারী একটি বহিরাগত রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটির বিজ্ঞাপন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়।

বিজ্ঞাপনটিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক দুরবস্থার সঙ্গে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি সামরিক কর্মকাণ্ডে মার্কিন অর্থায়নের সম্পর্ক টানা হয়েছিল। সমালোচকেরা বিজ্ঞাপনের ভাষায় ইহুদিবিদ্বেষী প্রচারণার ঐতিহাসিক ইঙ্গিত দেখতে পান। আল-সাইয়েদের প্রচারণা অবশ্য বিজ্ঞাপনটি থেকে নিজেদের দূরত্ব স্পষ্ট করে এবং জানায়, সেটি তাদের তৈরি নয়। তিনি ইসরাইলি সরকারের নীতির সমালোচনাকে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ থেকে পৃথক করে দেখার কথা বলেছেন।

নির্বাচনী প্রচারণায় তার ধর্মীয় পরিচয়ও রাজনৈতিক আক্রমণের বিষয় হয়ে ওঠে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের পক্ষ থেকে তার দেশপ্রেম ও রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। উগ্রপন্থি গোষ্ঠীর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও সামনে আনা হয়, যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপিত হয়নি।

অন্যদিকে, ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাথমিক নির্বাচনে তার প্রতিদ্বন্দ্বী হেইলি স্টিভেন্স শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে সমর্থন করেন। ফলে নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে দলীয় ঐক্য ও আদর্শিক বিরোধের প্রশ্নও আলোচনায় আসে। এতসব বিতর্কের মধ্যেও আল-সাইয়েদের বিজয় প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থকদের কাছে নতুন তাৎপর্য বহন করে।

এখানেই জোহরান মামদানির প্রসঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি আবদুল আল-সাইয়েদের বিজয়কে অভিনন্দন জানান। তার বক্তব্যে উঠে আসে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবার নাগাল এবং রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানোর বিষয়।

তিনি বলেন, আল-সাইয়েদের প্রচারণার মূল কথাগুলো শুধু মিশিগানের মানুষের জন্য নয়, নিউইয়র্কের মানুষের জন্যও প্রাসঙ্গিক। কর্মজীবী মানুষের স্বার্থকে রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনার যে প্রচেষ্টা, সেটিকে তিনি বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখেন।

মামদানি অবশ্য আল-সাইয়েদকে নিজের রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখতে চাননি। বরং দুজনের নিজস্ব রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও কাজের ক্ষেত্রের স্বাতন্ত্র্যের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে তাদের রাজনৈতিক ভাষ্য ও প্রচারণায় কিছু মিল রয়েছে।

উভয়েই জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, সাধারণ মানুষের আয় এবং করপোরেট প্রভাবের প্রশ্নকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে এনেছেন। নিউইয়র্কের স্থানীয় নির্বাচনে মামদানি যে অর্থনৈতিক ইস্যুগুলোকে সামনে এনেছিলেন, মিশিগানের নির্বাচনে আল-সাইয়েদের প্রচারণাতেও সেগুলোর প্রতিফলন দেখা গেছে।

এবার আলোচনায় আসা যাক বারাক ওবামার প্রসঙ্গে। আল-সাইয়েদের রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে ওবামার নামের তুলনা নতুন নয়। ২০১৮ সালে মিশিগানের গভর্নর নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় থেকেই তার বক্তৃতার ধরন, ব্যক্তিগত জীবনকাহিনি, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং তৃণমূলভিত্তিক রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে ওবামার প্রসঙ্গ এসেছে।

দুজনের মধ্যে অভিবাসী পরিবারের অভিজ্ঞতা, উচ্চশিক্ষা, সামাজিক বৈচিত্র্যের প্রতিনিধিত্ব এবং প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে সমর্থক সংগঠিত করার ক্ষেত্রে কিছু তুলনাযোগ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

তবে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও ঐতিহাসিক ভূমিকা এক করে দেখা যাবে না। বারাক ওবামা যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে দেশটির প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হন। তার প্রচারণায় ‘হোপ’ ও ‘চেঞ্জ’ বা আশা ও পরিবর্তনের ধারণা, তৃণমূল সংগঠন এবং বৃহত্তর জাতীয় ঐক্যের ভাষ্য বিশেষ ভূমিকা রেখেছিল।

আল-সাইয়েদের রাজনৈতিক ভাষ্য তুলনামূলকভাবে বেশি স্পষ্টভাবে প্রগতিশীল অর্থনীতি, সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, করপোরেট অর্থের নিয়ন্ত্রণ এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন নীতির সমালোচনার ওপর কেন্দ্রীভূত। ফলে ওবামার সঙ্গে তুলনা তার সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রভাব বোঝার একটি উপায় হতে পারে, কিন্তু সেটি কোনো অভিন্ন রাজনৈতিক প্রকল্পের প্রমাণ নয়।

তিনজনের রাজনৈতিক অবস্থান ও দায়িত্বের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। ওবামা একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট, মামদানি নিউইয়র্কের মেয়র এবং এল-সায়েদ সিনেটর-নির্বাচিত। তাদের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, দায়িত্বের পরিধি এবং ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্র আলাদা। তাই একই রাজনৈতিক আলোচনায় তাদের নাম উচ্চারিত হওয়া মানেই তারা একই ধরনের নেতৃত্ব বা একই রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

তবে তাদের ঘিরে একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে এসেছে: ডেমোক্রেটিক পার্টির ভবিষ্যৎ রাজনীতি কি প্রচলিত নেতৃত্বের বাইরে নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আরও গুরুত্ব দেবে? বিশেষ করে তরুণ ভোটার, অভিবাসী পরিবারের সন্তান, মুসলিম ও আরব-আমেরিকান জনগোষ্ঠী, কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক এবং শ্রমজীবী মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা কীভাবে দলটির নীতি ও নেতৃত্বকে প্রভাবিত করবে?

মিশিগানের নির্বাচন এ প্রশ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ধর্মীয় পরিচয়, অভিবাসী পটভূমি কিংবা জাতিগত বৈচিত্র্য এখনো বিতর্কের বিষয় হলেও এসব পরিচয়ের মানুষ যে জাতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বে আসতে পারেন, এল-সায়েদের বিজয় তা দেখিয়েছে।

একই সঙ্গে নির্বাচনে তার সাফল্য প্রমাণ করে না যে ডেমোক্রেটিক পার্টির সব ভোটার তার রাজনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে একমত। বরং এটি দেখায়, একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে স্বাস্থ্যসেবা, জীবনযাত্রার ব্যয়, রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং পররাষ্ট্রনীতির মতো ইস্যু নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আল-সাইয়েদের সামনে এখন নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনে জয়ী হওয়া আর কংগ্রেসে নিজের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এক বিষয় নয়। স্বাস্থ্যসেবা সংস্কার, করপোরেট অর্থের রাজনৈতিক প্রভাব সীমিত করা কিংবা ইসরাইল-ফিলিস্তিন প্রশ্নে মার্কিন নীতির পরিবর্তনের জন্য তাকে শুধু নিজের দলের ভেতরেই নয়, কংগ্রেসের বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও কাজ করতে হবে।

বারাক ওবামা, জোহরান মামদানি ও আবদুল আল-সাইয়েদ—তিনটি নাম তাই শুধু তিনজন রাজনীতিকের পরিচয় নয়; এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক সমাজ, নেতৃত্বের নতুন আকাঙ্ক্ষা এবং ডেমোক্রেটিক পার্টির আদর্শিক বিতর্কের তিনটি পৃথক অধ্যায়।

তাদের মধ্যে মিল যেমন আছে, তেমনি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অমিল। ভবিষ্যতে এই ধারার রাজনীতি কতটা প্রভাব বিস্তার করবে, তা নির্ভর করবে নির্বাচনী সাফল্যের পাশাপাশি নীতি বাস্তবায়ন, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনার ওপর।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ