সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে নতুন করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিরা। একই সঙ্গে দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত খামিস মুশাইতের কিং খালিদ বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার কথাও জানিয়েছে গোষ্ঠীটি। তবে হামলার সাফল্য নিয়ে হুথিদের দাবির স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া তথ্য এখানে নেই।
এদিকে, সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে ছোড়া হুথিদের একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশেই প্রতিহত ও ধ্বংস করা হয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এ তথ্য জানান।
অন্যদিকে, সৌদি কর্তৃপক্ষ সাম্প্রতিক হামলাগুলো নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। কেন দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আগেভাগে হামলার সতর্কবার্তা দিতে পারেনি, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক সৌদি কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এ তথ্য জানিয়েছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন এক হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা দেশটির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সাত মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের মধ্যে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান এবং এর জেরে আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
কারা এই হুথি?
হুথিরা ইয়েমেনের একটি সামরিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলন। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। লোহিত সাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহেও প্রভাব ফেলেছে গোষ্ঠীটি।
১৯৯০-এর দশকে উত্তর ইয়েমেনে জায়েদি শিয়া সম্প্রদায়ের পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবে হুথিদের উত্থান ঘটে। একসময় এই সম্প্রদায় ইয়েমেন শাসন করলেও পরবর্তী সময়ে তাদের ঐতিহাসিক আবাসভূমি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক হয়ে যায়।
প্রথম দিকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে একাধিক গেরিলা যুদ্ধে জড়ায় হুথিরা। প্রতিবেশী সুন্নি-অধ্যুষিত সৌদি আরবের সঙ্গেও তাদের সীমান্ত সংঘর্ষ হয়।
২০১১ সালে আরব বসন্তের গণবিক্ষোভের মধ্যে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর উত্তর ইয়েমেনে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করে হুথিরা। উপসাগরীয় দেশগুলোর সমর্থনে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়াও তারা প্রত্যাখ্যান করে।
এ সময় ইরানের সমর্থন নিয়ে গোষ্ঠীটির নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি তাদের যোদ্ধাদের একটি বড় সশস্ত্র বাহিনীতে রূপান্তর করেন।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার দক্ষিণাঞ্চলের এডেনে সরে যেতে বাধ্য হয়।
হুথিদের নিজেদের সংগঠনের নাম ‘আনসার আল্লাহ’, যার অর্থ ‘আল্লাহর সাহায্যকারী’। তবে প্রতিষ্ঠাতা নেতা হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকেই গোষ্ঠীটি ‘হুথি আন্দোলন’ নামে পরিচিতি পায়।
সৌদি আরবের সঙ্গে সংঘাত কেন?
ইয়েমেনে ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং সীমান্তবর্তী এলাকায় অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল সৌদি আরব। এ কারণে ২০১৫ সালের শুরুতে হুথিদের হটিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার পুনর্বহাল এবং রাজনৈতিক রূপান্তর প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক অভিযান শুরু করে।
কিন্তু সেই অভিযান ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধকে আরও দীর্ঘায়িত করে। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ জোটের সদস্যদেশগুলোর বিমান হামলা এবং বিভিন্ন পক্ষের সংঘর্ষে দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক সংকট তৈরি হয়।
ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে কোনো পক্ষই চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। হুথিরা উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, যেখানে দেশটির অধিকাংশ মানুষ বসবাস করেন।
এ সময় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহারে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ায় গোষ্ঠীটি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল স্থাপনা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করেও হামলা চালায় তারা।
দীর্ঘ সংঘাতের পর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালে ইয়েমেনের যুদ্ধরত পক্ষগুলোর মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবারও উত্তেজনা বেড়েছে।
লোহিত সাগরে হামলা, বিশ্ববাণিজ্যে চাপ
২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরাইলের গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থনের কথা জানিয়ে লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে হুথিরা। একই সঙ্গে ইসরাইল লক্ষ্য করেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় তারা।
পরবর্তী সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে হুথিদের হামলা আবারও বাড়ে। ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটালে সৌদি আরবকে লোহিত সাগরের বন্দর এবং বাব আল-মানদেব প্রণালির মাধ্যমে তেল রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়।
এতে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও সমুদ্রপথের নিরাপত্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ এবং মোখা বন্দর শহর দখল করে। বাব আল-মানদেব প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ানো এবং ইরানকে সহায়তা করার লক্ষ্যেই তারা এ পদক্ষেপ নেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের আশপাশের নৌপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথে চলাচল ব্যাহত হলে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে পণ্য পরিবহণকারী জাহাজগুলোকে আফ্রিকা ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়। এতে পরিবহণ ব্যয় ও সময় বাড়ে এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হয়।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সৌদি আরবের গুরুত্ব
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল উৎপাদক ও রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। দেশটির জ্বালানি খাত অর্থনীতির প্রধান ভিত্তিগুলোর একটি।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্বে মোট তেল উৎপাদনের প্রায় ১১ শতাংশ সৌদি আরব থেকে আসে। দেশটির কাছে বিশ্বের প্রমাণিত তেল মজুতের আনুমানিক ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ রয়েছে। সৌদি আরবের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় অর্ধেক এবং রপ্তানি আয়ের প্রায় ৭০ শতাংশ আসে তেল ও গ্যাস খাত থেকে।
ফলে দেশটির তেল স্থাপনা, বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের হামলা হলে তার প্রভাব শুধু সৌদি অর্থনীতিতে নয়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও পড়তে পারে।
ইয়েমেনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করে হুথিরা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় দেশটির প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন।
২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে হুথিদের সশস্ত্র সদস্যসংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার থেকে দুই লাখ বলে অনুমান করা হয়েছিল। তাদের অস্ত্রভান্ডারে ট্যাংক, সাঁজোয়া ও অন্যান্য সামরিক যান, ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ইয়েমেনের বাইরেও দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছাতে সক্ষম। ইসরাইলে পর্যন্ত হামলা চালানোর সক্ষমতা দেখিয়েছে গোষ্ঠীটি। সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করার ঘটনাও তাদের সামরিক সক্ষমতার পরিচয় দেয়।
এ ছাড়া ইয়েমেনের ভৌগোলিক অবস্থান হুথিদের জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করেছে। বাব আল-মানদেব প্রণালির কাছাকাছি অবস্থানের কারণে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে চাপ সৃষ্টি করার সুযোগ রয়েছে তাদের।
ইরানের সঙ্গে হুথিদের সম্পর্ক কতটা ঘনিষ্ঠ?
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ নামে পরিচিত আঞ্চলিক বলয়ের অংশ হিসেবে হুথিদের সমর্থন করে। এই বলয়ের অন্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের কয়েকটি শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী।
তবে হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কের ধরন হিজবুল্লাহ বা ইরাকের ওই গোষ্ঠীগুলোর সম্পর্কের মতো পুরোপুরি এক নয়। হুথিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে নিজেদের চূড়ান্ত ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে স্বীকার করে না। তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক কর্মকাণ্ডে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করে এবং এ কাজে হিজবুল্লাহও ভূমিকা রাখে। তবে হুথিরা নিজেদের ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন গোষ্ঠী হিসেবে বর্ণনা করার বিরোধিতা করে। তাদের দাবি, তারা নিজেরাই অস্ত্র তৈরি করে।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
