হিমাগার গেটে সংরক্ষিত আলু বিক্রি করে ঋণসহ ভাড়ার টাকা পরিশোধ হচ্ছে না। সে কারণে সংরক্ষিত আলু নিতে আসছেন না চাষি ও ব্যবসায়ীরা। আলু সংরক্ষণের পর থেকে বাজারে দর পতন অব্যাহত আছে। ফলে হিমাগারগুলোতে মৌসুমের শুরু থেকে চাষি ও ব্যবসায়ীদের আনাগোনা কম ছিল। যার ফলে এখনও হিমাগারগুলোতে সংরক্ষণের প্রায় অর্ধেক পরিমাণ আলু রয়ে গেছে।
সংরক্ষিত আলু নিতে হিমাগার মালিকরা বেশ কয়েকবার নোটিশ পাঠানোর পরও চাষি ও ব্যবসায়ীদের সাড়া পাচ্ছেন না। মৌসুম শেষ, বাজারে নতুন আলু আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সংরক্ষিত আলু বের করতে ১৫ নভেম্বর সময় বেঁধে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তির পাশাপাশি এলাকায় মাইকিং করছে কর্তৃপক্ষ। হিমাগারের মেশিন বন্ধ করা হবে, নির্ধারিত সময়ে আলু নিতে না এলে পরবর্তী সময় ওই আলুর দায় কর্তৃপক্ষ নেবে না বলেও গণবিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে আলু বিক্রির টাকায় হিমাগার থেকে নেওয়া ঋণ ও ভাড়া পরিশোধ না হওয়ায় হিমাগারে আসছেন না চাষি ও ব্যবসায়ীরা। গত দুই মাস ধরে নোটিশ করেও তাদের হিমাগারমুখী করতে পারেননি কর্তৃপক্ষ।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জয়পুরহাটের ২২টি হিমাগারে এবার দুই লাখ ৩৭ হাজার ২১২ টন আলু সংরক্ষণ ছিল। দাম কম হওয়ায় সংরক্ষণের প্রায় অর্ধেক আলু আজও হিমাগারেই রয়েছে। আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ আলু বাজারে বের করতে হলে সরবরাহের পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। এতে করে আলুর দাম আরও কমার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে, নতুন আলু বাজারে আসার সময় হয়েছে। নতুন আলু পুরোদমে বাজারে আসার আগেই পুরোনো আলুর বিক্রি নিয়ে শঙ্কায় চাষি ও ব্যবসায়ীরা।
চাষি ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত পাঁচ বছরের তুলনায় এবার বিভিন্ন জাতের আলু বছর শেষে প্রতি বস্তা (৬০ কেজি) ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এতে চাষিদের হিমাগারের ভাড়াসহ ঋণের টাকা পরিশোধ সম্ভব হবে না। সব মিলিয়ে সংরক্ষণের আলু নিয়ে বড় বিপদে পড়েছেন চাষি, ব্যবসায়ী ও হিমাগার মালিকরা।
জানা গেছে, ধারণক্ষমতা অনুযায়ী জেলার ২২টি হিমাগারেই এবার আলু সংরক্ষণ ছিল পরিপূর্ণ। মৌসুমে আলুর দাম কম বলে চাষি-ব্যবসায়ীরা হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। জেলায় খাবার আলুর প্রয়োজন ছিল ৪০ হাজার টন। সিংহভাগ আলু বিভিন্ন জেলায় বিক্রি হয়। মৌসুমের শুরু থেকে দাম কম হওয়ায় হিমাগারে সংরক্ষণের অর্ধেক আলু এখনও মজুত আছে। এর মধ্যে বাজারে নতুন আলুর আমদানি শুরু হতে চলেছে। হিমাগার গেটে পুরোনো আলু ৭ থেকে ৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
চাষিরা জানান, মৌসুমে এক কেজি আলুর উৎপাদন খরচ পড়েছে ১৯ থেকে ২০ টাকা। হিমাগারে সংরক্ষণ করতে গিয়ে ভাড়া বাবদ ৬.৭৫ টাকা এবং লেবার, সুতলি, পরিবহন ও লোড-আনলোড মিলে আরও ২ টাকা। সব মিলে প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছে ২৮ টাকা। বর্তমানে দাম মিলছে কেজিতে ৭ থেকে ৮ টাকা। আলু সংরক্ষণ করে লাভ তো নয়ই, মূলধনও হারিয়ে গেছে। আলু নিতে হলে হিমাগার থেকে নেওয়া ঋণসহ ভাড়ার টাকা দিতে হবে। সে কারণেই আলু নিতে হিমাগারে আসছেন না কেউ।
কালাই পৌরশহরের দোকানদারপাড়া মহল্লার আলু চাষি জয়েন মিয়া বলেন, মৌসুমে দাম কম হওয়ায় ৫০ বস্তা আলু হিমাগারে রেখেছি। আলু হিমাগারে না রেখে যদি বিক্রি করতাম, তাও কয়েক টাকা পেতাম। এখন আলু বিক্রি করলে বাড়ি থেকে আরও বস্তাপ্রতি ৪৫০ টাকা করে যোগ দিয়ে হিমাগারের ভাড়াসহ ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হবে। তিনি আরও বলেন, আলুর ওপর ১৫ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছি, সেই টাকা শোধ করব কীভাবে, সেই চিন্তায় আছি। আলু নিতে বারবার হিমাগার থেকে মোবাইলে কল করছে। বলে দিয়েছি, আলু এবার নেব না। তার পরও তারা কল করেই যাচ্ছে।
পুনট হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন বাগইল গ্রামের কৃষক মোকলেছুর রহমান। গতকাল শুক্রবার আলু বিক্রি করতে এসে হিমাগারের ভাড়ার কথা ভেবে তিনি আলু বিক্রি না করে ফিরে যাচ্ছিলেন। এ সময় তিনি বলেন, তখন আলু বিক্রি করলে আজ হিমাগারের ভাড়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো না। শুধু যে তিনিই বিপদে পড়েছেন তা নয়, জয়পুরহাটের অসংখ্য আলুচাষি ও ব্যবসায়ী এবার একই সংকটে পড়েছেন।
আঁওড়া গ্রামের কৃষক আবুল হোসেন বলেন, কয়েক দিন ধরে আলু ওঠানোর জন্য হিমাগারের পক্ষ থেকে মাইকিং করছে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আলু না ওঠালে তারা আর আলুর দায় নেবে না। আবার দাম কম হলে ভাড়ার টাকাও নেবে। কী করব ভেবে পাচ্ছি না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আগে বিক্রি করলে যেটুকু দাম পাওয়া যেত, নতুন আলু আসাতেই পুরোনো আলু আর কেউ নিচ্ছেই না।
পুনট বাজারের ব্যবসায়ী মিঠু ফকির বলেন, ১৭ হাজার বস্তা আলু কয়েকটি হিমাগারে রেখেছিলাম। কম দামেই প্রায় ৯ হাজার বস্তা আলু বিক্রি করেছি। ইতোমধ্যে প্রায় এক কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। আবার যদি এই ৮ হাজার বস্তার ভাড়া দিতে হয়, তাহলে বর্তমান দামে আলু বিক্রি করে কত টাকা যে লোকসান হবে, তার হিসাব নেই। সে কারণে হিমাগারে যাতায়াত ছেড়ে দিয়েছি। তিনি বলেন, ‘এভাবেই গত তিন বছর ধরে লোকসান গুনছি। কোমর-মাঝা ভেঙে গেছে। ঋণের বোঝাও বেড়ে গেছে। সিসি ঋণ এবার নবায়নই করতে পারিনি। ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে গেছে।’
পুনট কোল্ডস্টোরেজের সহকারী ব্যবস্থাপক এনামুল হক বলেন, গড়ে এখনও সংরক্ষণের ৪৩ শতাংশ আলু মজুত আছে। গত এক সপ্তাহে মাত্র ২ শতাংশ আলু বিক্রি হয়েছে। নতুন আলু বাজারে আসার সময়ও হয়েছে। মালিকদের নির্দেশে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে আলু নিতে মাইকিং করা হচ্ছে।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, আলু সংরক্ষণের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর বিষয়ে অনুরোধ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট হিমাগারগুলোতে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক আল মামুন মিয়া বলেন, ‘বিষয়টি শুনেছি। কেন ১৫ নভেম্বর উল্লেখ করে হিমাগার কর্তৃপক্ষ মাইকিং করছে, তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
