যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে ভারত, চীন, কাতার ও ইরাকের জাহাজ চলাচলে বিশেষ ছাড় দিয়েছে ইরান। দেশটির এক জ্যেষ্ঠ আইনপ্রণেতা জানিয়েছেন, এই চার দেশের জাহাজগুলো ইরানের আরোপ করা বিধিনিষেধ ছাড়াই প্রণালি দিয়ে চলাচল করতে পারবে।
মঙ্গলবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি কমিটির উপপ্রধান আমির হায়াত মুকাদ্দাম দেশটির সংবাদমাধ্যম আইএসএনএকে এ তথ্য জানান।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, এই ছাড়ের পেছনে শুধু বন্ধুত্ব নয়, রয়েছে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ।
কেন এই চার দেশকে ছাড় দিচ্ছে ইরান?
ইরানি আইনপ্রণেতার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত থেকে ওষুধ পাবে ইরান। অন্যদিকে চীনের কাছ থেকে রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়ার আশা করছে তেহরান। কাতার আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে।
এ ছাড়া ভারত ও চীনের জাহাজ থেকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারের জন্য ট্রানজিট ফি বা পারাপার মাশুল নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইরানের। তবে কাতারের জাহাজকে বিনা মাশুলে চলাচলের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ইরাকি জাহাজের ক্ষেত্রে কোনো মাশুল নেওয়া হবে কি না, তা স্পষ্ট করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে একদিকে ইরান অর্থ আয় করতে চায়, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধনীতিকে দুর্বল করার চেষ্টা করছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই চার দেশের জন্য?
বিশ্বের জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তেল ও গ্যাস পরিবহনের বড় অংশই এই পথ দিয়ে হয়।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ২৩ হাজার ব্যারেল উপসাগরীয় অপরিশোধিত তেল পরিবহন হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪২ শতাংশ গেছে চীনে এবং ১৩ শতাংশ ভারতে।
ফলে হরমুজ প্রণালিতে বাধা সৃষ্টি হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে এশিয়ার জ্বালানিনির্ভর দেশগুলো।
ভারতের জন্য উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি ওষুধ উৎপাদনে ভারতের সক্ষমতা ইরানের জন্যও বড় সুবিধা।
অন্যদিকে কাতার তার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানির জন্য এই নৌপথের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। ইরাকের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রেও হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অনেক।
এখানেই তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ইরানের উপকূলীয় এলাকা ও বন্দর থেকে আসা-যাওয়া করা সব দেশের জাহাজের ওপর তাদের নৌ অবরোধ কার্যকর থাকবে। তবে ইরানের বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়—এমন জাহাজ এই অবরোধের আওতায় পড়বে না।
খাদ্য ও ওষুধের মতো জরুরি মানবিক পণ্য বহনকারী জাহাজও তল্লাশির পর চলাচলের অনুমতি পেতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি ভারত ও চীনের জাহাজকে নিজস্ব বন্দর থেকে পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও ছাড় দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র তা মেনে নেয়, তাহলে পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
তবে জাহাজের জাতীয়তা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। জাহাজের পতাকা, মালিকানা নাকি পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয়—কোন বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের কৌশল
বিশ্লেষকদের ধারণা, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে চাইছে।
হরমুজ প্রণালির অবরোধ তুলে নেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর শান্তি আলোচনায় ইরানের অন্যতম দাবি।
কাতারের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছে। ইরান প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার বিষয়ে সাতটি শর্ত দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তেলের বাজারে কতটা প্রভাব পড়বে?
বিশ্লেষকদের মতে, আপাতত এই সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় কোনো পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা কম।
কারণ, সংঘাত আবার তীব্র হলে কোন দেশের জাহাজ চলাচল করছে, তা আলাদা করে বিবেচনা করার সুযোগ নাও থাকতে পারে।
এ ছাড়া বিশেষ ছাড় পাওয়ার পরও জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত নয়। গত ৩০ অক্টোবর কাতারের এলএনজি পরিবহনকারী জাহাজ ‘আল মায়েদা’ উপসাগরে অজ্ঞাত বস্তু দিয়ে আঘাতের শিকার হয়।
আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা ও যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ওই অঞ্চলে ১২০টির বেশি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভারত, চীন, কাতার ও ইরাককে হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের বিশেষ ছাড় দিয়ে ইরান একদিকে নিজের অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটাতে চাইছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও কূটনৈতিক চাপ মোকাবিলার কৌশল নিয়েছে। তবে এই ছাড় কতটা কার্যকর হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ
