ভারতের ভোটার তালিকায় বাংলাদেশে প্রধান শিক্ষকের নাম!

প্রতিবেদন:

·

, , ,

শিক্ষা ডেস্ক:

খুলনার পাইকগাছার খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতীয় নাগরিকত্ব ও ভোটার তালিকায় নাম থাকার অভিযোগ নিয়ে তদন্ত হলেও এখনো তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও জেলা প্রশাসনের দপ্তরের প্রতিবেদনে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় তার নাম থাকার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) তাকে শোকজ করে লিখিত জবাবও পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভারতীয় নাগরিকত্ব থাকার পাশাপাশি দীপক চন্দ্র সরকার বাংলাদেশে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন।

বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের কাছে অভিযোগ ও একাধিক তদন্ত হয়েছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তিনি নিজ প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গত ২৯ জুন দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ‘পশ্চিমবঙ্গের ভোটার হয়েও খুলনায় স্কুলের প্রধান শিক্ষক’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ে নড়েচড়ে বসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। নথিপত্র ও তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া নবারুণ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের নাম পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকায় রয়েছে। সেখানে তাকে উত্তর বর্ধমানের শক্তিগড় থানার ২ নম্বর বরশুল গ্রামের ১ নম্বর মনমোহন দে রোডের পশ্চিমাংশের বাসিন্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে তিনি পাইকগাছার লস্কর ইউনিয়নের খড়িয়া ঢেমশাখালী গ্রামের ভোটার। তার বাবা নগেন্দ্র নাথ সরকার ও মা সুমিত্রা রানী সরকার। অভিযোগকারীদের দাবি, দীপক চন্দ্র সরকারের স্ত্রী, মেয়ে, ভাই ও ভাবিসহ পরিবারের কয়েকজন সদস্যও ভারতের স্থায়ী বাসিন্দা ও ভোটার। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে দীপক চন্দ্র সরকার বলেন, তিনি বাংলাদেশের নাগরিক এবং নিজে ভারতে ভোটার হননি। প্রাপ্ত অভিযোগের পর পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশে উপজেলা রিসোর্স অফিসার মো. ঈমান উদ্দিন ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ২৬ সেপ্টেম্বর একটি তদন্ত প্রতিবেদন দেন।

এরপর ইউএনওর নির্দেশে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহজাহান আলীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জানুয়ারি আরেকটি প্রতিবেদন জমা দেয়। একই বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম ছায়েদুর রহমান বিষয়টি নিয়ে আরও একটি তদন্ত করেন। চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠানো প্রতিবেদনে ইউএনও ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী উল্লেখ করেন, ভোটার তালিকা থেকে দীপক চন্দ্র সরকারের ভারতের পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব থাকার তথ্য পাওয়া যায়। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হয়। এ কারণে বিদেশি নাগরিকের এমপিওভুক্ত পদে থাকার বিষয়টি প্রশ্নসাপেক্ষ ও বিতর্কিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এরপর খুলনার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) কানিজ ফাতেমা লিজা গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর ও স্পর্শকাতর উল্লেখ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবেদন পাঠান। প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ে নিয়োগে অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুলাই বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী ও আয়া পদে তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী পদে প্রধান শিক্ষকের ভাইপো ভবেশ সরকার এবং আয়া পদে তার আপন শালিকা লাবনী সরকার নিয়োগ পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিরাপত্তাকর্মী পদে তৎকালীন বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির অভিভাবক সদস্য রবীন ঢালীর ভাগ্নে পলাশ কুমার মণ্ডলকে নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগের বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রতিবাদ করেন। ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ঝাড়ু মিছিল, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন ও স্মারকলিপি দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ সময় নিয়োগপত্র না দিয়ে পরে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ১ সেপ্টেম্বর ওই তিনজনকে বিদ্যালয়ে হাজির করা হয়। এসব নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও করেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। তবে প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

বিদ্যালয়ের ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রণোদনা অনুদানের পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষক, সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থী এবং প্রতিবন্ধী বা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দের ২ লাখ ২৫ হাজার টাকা যথাযথভাবে ব্যয় করা হয়েছে। তবে অবশিষ্ট অর্থের ব্যয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ বিল-ভাউচার পাওয়া যায়নি বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়। স্থানীয় বাসিন্দা প্রকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তার ভাষ্য, প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (বেসরকারি মাধ্যমিক-১) মো. জাকির হোসেন বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকারকে ১০ কার্যদিবসের সময় দিয়ে শোকজ করা হয়েছিল। তিনি প্রথম নোটিশের জবাব দেননি। পরে দ্বিতীয় দফায় নোটিশ দেওয়া হলে তিনি লিখিত জবাব দিয়েছেন। দীপক চন্দ্র সরকারের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে জানতে চাইলে মো. জাকির হোসেন বলেন, সংশ্লিষ্ট সব প্রতিবেদন মহাপরিচালকের দপ্তরে উপস্থাপন করা হবে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে মহাপরিচালক উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবেন।

দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ভারতীয় ভোটার হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক দীপক চন্দ্র সরকার বলেন, আমি এ দেশের নাগরিক। আমি নিজে ভারতে ভোটার হইনি। কেউ আমাকে ফাঁসানোর জন্য ভারতের ভোটার তালিকায় আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। বিদ্যালয়ের অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ এবং নিয়োগে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তার দাবি, এসব অভিযোগ সত্য নয়।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ