প্রশিক্ষণ নিতে এবার পাকিস্তান যাচ্ছেন সরকারের ৩৫ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা

প্রতিবেদন:

·

, ,

উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণ নিতে এবার পাকিস্তান যাচ্ছেন সরকারের ৩৫ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। এর মধ্যে অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার পাঁচজন এবং যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার ৩০ জন আছেন। পাকিস্তানের লাহোরে ন্যাশনাল স্কুল অব পাবলিক পলিসিতে ১৪ দিনের এই প্রশিক্ষণ শুরু হবে ৯ নভেম্বর। শেষ হবে ২২ নভেম্বর।

উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের বিষয়ে গত বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে সরকারি আদেশ (জিও) জারি করা হয়েছে।

এর আগে গত মে মাসে প্রথমবারের মতো প্রশিক্ষণ নিতে পাকিস্তান সফর করেন বাংলাদেশের ১২ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। পাকিস্তানের লাহোরে অবস্থিত সিভিল সার্ভিস একাডেমিতে (সিএসএ) তাঁরা প্রশিক্ষণ নেন। ৪ মে শুরু হওয়া ওই প্রশিক্ষণ শেষ হয় ২১ মে।

সফরে অংশ নেওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন ছিলেন অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার, বাকি ১১ জন ছিলেন যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার।

দ্বিতীয় দফায় উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য এবার লাহোর যাচ্ছেন ৩৫ কর্মকর্তা। তাঁদের মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চারজন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দুজন করে কর্মকর্তা রয়েছেন। বাকিরা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের।
৮ নভেম্বর তাঁদের ঢাকা ছাড়ার কথা রয়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চিঠি পাওয়ার পর বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রশিক্ষণের জন্য কর্মকর্তাদের নাম নির্বাচন করা হয়।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা সরকারি আদেশে বলা হয়েছে, কর্মকর্তাদের যাতায়াত, থাকা-খাওয়া ও প্রশিক্ষণের যাবতীয় ব্যয় বহন করবে পাকিস্তান সরকার। এ সফরে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আর্থিক সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রশিক্ষণ শেষে দেশে ফেরার পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।

তালিকার এক নম্বরে থাকা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোস্তফা জামান বলেন, পাকিস্তান সরকারের আমন্ত্রণে ১৪ দিনের এই প্রশিক্ষণে দেশটির প্রশাসন ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড কীভাবে পরিচালিত হয়, তা শেখানো হবে। এ ছাড়া সুশাসন, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও সরকারি নীতিকৌশল সম্পর্কেও প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন ধরে ভারতের মুসৌরি ছিল বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। ভারতের উত্তরাখন্ড প্রদেশের মুসৌরিতে অবস্থিত লাল বাহাদুর শাস্ত্রী রাষ্ট্রীয় প্রশাসন একাডেমিতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ নিতে যেতেন বাংলাদেশের মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১৪ সালে দিল্লিভিত্তিক ন্যাশনাল সেন্টার ফর গুড গভর্ন্যান্সের (এনসিজিজি) সঙ্গে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা স্মারক সইয়ের মধ্য দিয়ে এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি দুই দেশের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় চুক্তি হয়। তৃতীয় দফায় ২০২৪ সালের ৩০ এপ্রিল ঢাকায় দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি হয়। সর্বশেষ চুক্তিটির মেয়াদ ছিল এক বছর। ২০৩০ সাল পর্যন্ত চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছিল।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সূত্র বলছে, ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকা-দিল্লি কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। এর পর থেকে বাংলাদেশি সরকারি কর্মকর্তাদের ভারতে প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়নি। রাজনৈতিক পালাবদল, কূটনৈতিক টানাপোড়েন, চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া ও ভিসা জটিলতার কারণে প্রশিক্ষণ কার্যক্রমটি বন্ধ রয়েছে। এর পরিবর্তে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তানে পাঠানো হচ্ছে।

কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশিক্ষণের জন্য ভারত ও পাকিস্তান—দুই দেশেই যাওয়া প্রয়োজন। তাঁদের মতে, বিদেশে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ে, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয় এবং নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রশিক্ষণের জন্য পাকিস্তান সরকার বিভিন্ন সময়ে চিঠি দিয়ে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে সেই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব এবং বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি পাকিস্তান সফরে গেলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। তখন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হলে তাতে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হয়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর পাকিস্তান সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমন্ত্রণপত্র পাঠায়। মূলত সেই আমন্ত্রণের ভিত্তিতেই কর্মকর্তাদের পাকিস্তানে পাঠানো হচ্ছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, প্রশিক্ষণের বিষয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। চুক্তি করার আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে বোঝাপড়া ও পারস্পরিক জানাশোনার সুযোগ তৈরির জন্যই আপাতত কর্মকর্তাদের পাঠানো হচ্ছে। এরপর দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হবে। সরকারি সূত্রগুলোর ভাষ্য, প্রশাসনিক সক্ষমতা উন্নয়ন কর্মসূচির অংশ হিসেবেই সরকারি কর্মকর্তারা পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন।

জনপ্রশাসন বিশ্লেষকেরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতায় পাকিস্তানে সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে পাঠানোর উদ্যোগের একটি কূটনৈতিক বার্তাও রয়েছে। তাঁদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্য কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর নির্ভর না করে একাধিক দেশে পাঠানো উচিত।

Read this report in English · ইংরেজি সংস্করণ